“এই পৃথিবীর যা কিছু মহান যা কিছু শ্ৰেষ্ঠ যা কিছু সুন্দর সব সব কিছুর স্রষ্টা আমি। সব আমারই। বেদের সুক্ত কুরআনের আয়াত আমারই রচনা। আমি নিজে হাতে লিখিনি–যে লিখেছে সে আমারই প্রতিনিধি। আমারই মনের ভাবকথা মূর্ত করেছে পুথিগ্রন্থের পাতায়। আমারই জন্যে।”
এর কিছুদিন পরে মাস্টার মশাই চলে গেলেন। যে বোধিবৃক্ষের নিভৃত ছায়ায় বসেতপশ্চর্যা করবার সৌভাগ্য হয়েছিল একরাতে ঝড়ে বৃক্ষটি উপরে গেল। বড় বিকল্পহীন বিপন্নতার মধ্যে পতিত হলাম আমি। আমার পাশেই শুয়ে ছিলেন। হঠাৎ মাঝরাতে বুকে অসহ্য ব্যথা। চিৎকার করে সেপাইকে ডাকলাম। তারা ওনাকে নিয়ে গেল বাইরের কোন হাসপাতালে সেখান থেকে উনি আর এলেন না।
উনি চলে গেলেন। কিন্তু জ্বালিয়ে রেখে গেলেন আমার মনের মধ্যে অনির্বাণ এক দাউদাউ আগুন। রেখে গেলেন আমাকে চির ঋণী করে!
এখন আমি অনুভব করতে পারছি আমার মনের মধ্যে ধীরে ধীরে মাথা তুলছে ভীষণ এক রাক্ষুসে খিদে। সে খিদে শেখবার আর জানবার অদম্য লালসা অভিলাষায় পূর্ণ। যে খিদেকে তৃপ্ত করতে চাই বই। বই কোথায় পাবো! মনে পড়ে, বই আছে সেলে। সেলের বন্দীরা গাদা গাদা বই পড়ে। এই বই দিয়ে যায়, ফিরিয়ে নিয়ে যায় তাদের বাড়ির লোকজন। ওদের কাছে যদি যাই বই পাবো। যে কঠিন শব্দের অর্থ বুঝতে অসুবিধা হবে ওরা বুঝিয়ে দেবে। তাই অনেকদিন পরে আবার ফালতু হয়ে পৌঁছে যাই সেলে।
ঠিক মনে পড়ছে না, কে যেন বলেছেন–যদি তুমি কোন কিছু একান্তভাবে কামনা করো, সমস্ত জগত তোমার জন্য সচেষ্ট হবে সেটি পৌঁছে দিতে। আমি বই চেয়েছিলাম বই পেয়ে গেলাম। গাদা গাদা বই। পড়তে শেখার পর আমি প্রথম যে বইখানা নিজের চেষ্টায় পড়ে শেষ করতে সমর্থ হই তার নাম নিশিকুটুম্ব। পরের বই লৌহকপাট। বইয়ের পাতায় চোখ রেখে পার হয়ে যেতে থাকে দিন রাত শীত গ্রীষ্ম বর্ষা। আমার চোখের সামনে খুলে যেতে থাকে একটার পর একটা অজানা অদেখা জগতের দরজা। আমি সেই দরজা পার হয়ে হাঁটতে থাকি।
জেলখানায় সেকেন্ড গুনতির আগে সেলে আসি। আমাদের ওয়ার্ড থেকে বের হয়ে দু দশ পা দক্ষিণ মুখো হেঁটে, বেঁকে যেতে হবে ডানদিকেবাঁদিকে পড়বে কেস টেবিল। তারপর আমদানি ওয়ার্ড তার পাশে সেল। যারা কাল জেলে নতুন এসেছে সব রাখা হয়েছে আমদানি ওয়ার্ডে। এটাই নিয়ম। আজ তাদের পাঠানো হবে ভাগ ভাগ করে বিভিন্ন ওয়ার্ডে। তার আগে, আমদানি থেকে বের করে সব নবাগত বন্দিকে কেস টেবিলে জোড়া জোড়া লাইন দিয়ে বসিয়ে রাখা হয়। আমি যেদিন জেলখানায় এসেছি, সেদিন থেকে রোজ সকালে পায়খানায় যাবার সময়ে একবার কেস টেবিলের এপারে দাঁড়িয়ে লোহার রেলিংয়ের ফঁক ফোকর থেকে উঁকি মেরে দেখে নিতাম ওইনবাগতের মধ্যে আমার কোন পরিচিত আছে কিনা! এটা আমার দিনকার একটা অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছিল।
পরিচিত মানুষ দু একজনের দেখা যে মেলে না এমন নয়। একদিন দেখি বিজয়গড়ের যুব কংগ্রেস কর্মী কানাই ঢাকুরিয়া লেকে কী এক গন্ডগোলে গুলি চালিয়ে কাকে যেন মেরে ফেলে জেলে এসেছে। তার খুটির জোর আছে, কয়েকদিন পরে জামিন করিয়ে বের হয়ে যায় জেল থেকে।
আজ যখন সেলে যাচ্ছি, এদিকে তাকাতেই চোখে পড়ল আর একটা চেনা মুখ, বসে আছে। কেসটেবিলের লাইনে। পরিমল না পরিতোষ তা জানি না, আমি ওকে জানি পরি বলে। ওই নামে সবাই ডাকে। পরি একজন দক্ষ পকেটমার। সে আমাকে যেমন চেনে, চেনে আমার পিতাতুল্য নরেশ ঠাকুরকেও।
পকেটমারি–এটি “জেলখাট্টু” ক্রিমিনালদের কাছে সবচেয়ে ছোট কেস। যদি কেউ উকিল দাঁড় করিয়ে জামিন নাও নিতে পারে, এমনি এমনি তিনমাস পরে কে খালাস হয়ে যাবে। আর উকিল দাঁড় করালে “একপেসি” অর্থাৎ চৌদ্দ দিন। তারপর মুক্ত।
বড় জমাদারকে বলে কয়ে পরিকে আমাদের ওয়ার্ডে নিয়ে এলাম। চৌদ্দদিন সে আমার সাথে রইল। তারপর এসে গেল তার কোর্টে যাবার দিন। বিল্টুদায় নেবার দিন। বললাম তাকে–বের হয়ে তুই একটু গিয়ে নরেশ ঠাকুরকে বলিস, আমি মারা যাইনি। জেলে আছি। জেলে যখন আছি। একদিন না একদিন নিশ্চয় ছাড়া পাবো। তখন অবশ্যই তার সাথে গিয়ে দেখা করব। আর যদি মন কেমন কেমন করে তবে যেন কোর্টের তারিখে কোর্টে এসে আমাকে দেখে যায়। পরি আমার এই উপকারটুকু করেছিল। সে নরেশ ঠাকুরের কাছে আমার বার্তা এবং কোর্টের তারিখটা পৌঁছে দিয়েছিল।
আমার কোর্টের তারিখ ছিল সাত-আটদিন পরে। আলিপুর কোর্টের যে লকআপে আমাদের রাখা হোত তার একটা দরজা একটা জানালা। আমি সবদিনই কোর্টে গিয়ে আগে ভাগে জানালাটা দখল করে নিতাম। রড ধরে ঝুলে বসে থাকতাম বাইরের দিকে তাকিয়ে। দেখতাম কে আসে, কে যায়। আজ দেখলাম খবর পেয়ে নরেশ ঠাকুর এসেছে। সাধারণতঃ সে খুবই ভীতু প্রকৃতির লোক। তবে কোন এককালে মামলা মকদ্দমা চালিয়েছিল। যে কারণে কোর্টকাছারি উকিল মুহুরি এসব ভীতি তার কম। জানালায় দাঁড়িয়ে সে আমার খবরাখবর নিল, চা পাউরুটি বিড়ি এসব পাঠাল। তারপর পাঠাল বুড়ো প্রায় আধমরা এক মুহুরিকে–বলল বেল অর্ডারটা তো করিয়ে রাখি। কত কী বেলবণ্ড দিতে হবে দেখি। যদি সাধ্যে কুলায় ছাড়িয়ে নেব। না কুলালে পড়ে থাকবি। আমি আর কী করব। যা তোর ভাগ্যে আছে তা হবে।
