নকশাল আন্দোলন শুরুর আগে পর্যন্ত জেলখানায় কোন ভালো লোক তো আসেনি, যারা আসত সবই ছিল চোর ডাকাত খুনি। তারা নিজেরা অন্যায়কারী, ফলে মানসিক দিক থেকে দুর্বল। জেল কর্তৃপক্ষের কোন অপকর্মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার মত সাহস তাদের হতো না। যে কারণে সুপার-জেলার-ওয়ার্ডার সবাই যে যার সাধ্যমত জেলখানাকে লুঠ করে নিতে পারত। একে তো জেল কর্তৃপক্ষ আর কন্ট্রাকটারদের যোগ সাজশে যে সব মাল জেলখানায় সাপ্লাই আসত তা ছিল সবই নিকৃষ্ট মানের। আবার সেই মাল যেমন চাল ডাল তেল মশলা নির্দিষ্ট পরিমাণের চেয়ে ঢের কম কয়েদিদের জন্য খরচ করে, বেচে যাওয়া সেই সব মাল পাচার করে দেওয়া হতো ব্যাগে ব্যাগে।
আমার মনে আছে একবার প্রায় মাস দেড়েক ধরে দুবেলাই মটর ডাল দেওয়া হচ্ছিল আমাদের। এক হাতা সেই ডালে সরু চালের জলে ভেজা মুড়ির মত ভাসতে দেখা যেত সাদা সাদা পোকা। একটা দুটো নয়, এক হাতা ডালে কমপক্ষে কুড়ি পঁচিশটা। সাধারণ কয়েদির সাহস ছিলো না। এই নিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছিল নকশাল বন্দিরা। ডাল সহ ভাতের থালা দেখিয়ে তারা জেল সুপারের কাছে জিজ্ঞাসা করেছিল, এই ডাল মানুষ খায়? মানুষ কোথায় জেলে, সব তত কয়েদি! সে কথা বলেনি সুপার। শুধু মুচকে হেসে বলেছিল, যদিনা খেতে চাও খেও না। ফেলে দাও। যা গোডাউনে আছে তাই দেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ জানিয়ে কোন লাভ নেই।
ডালটা ফেলে তো দেওয়াই যায়, কিন্তু তাহলে পেটটা ভরবে কী করে? ভাত তো মাত্র ছাপান্ন গ্রাম চালের। যাদের বাড়ির অবস্থা ভালো বাইরের খাবার পায়, তাদের অসুবিধা হয় না। যাদের সে অবস্থা নেই পোকা বেছে ফেলে ওই ডালই খেয়ে নেয়। ডালে পোকা, সকালে যে টিফিন দেওয়া হয় মটর ছোলা সেদ্ধ, তাতে পোকা, ভাতে ধুলো কঁকর এ সব অখাদ্য ফেলে দিতে হলে বন্দী আর বাঁচবে না।
খাদ্য দ্রব্য নিয়ে যেমন, তেমন ওষুধ পত্র নিয়েও নকশাল ছেলেরা প্রতিবাদ জানাতে সে নিয়ে কর্তৃপক্ষের সাথে বিরোধ তো লেগেই ছিল তার উপর ছিল তাদের রাজনৈতিক মতবাদ যা অবিনীত অবাধ্য ও সাহসী। তারা কোন ব্যাপারেই জেল কর্তৃপক্ষকে কোন সহযোগিতা করতে না। ফলে তারা এদের উপর ভয়ানক ক্রুদ্ধ ছিল। যখন তখন ছল ছুতোয় নকশালদের উপর হামলা করে দিত। যে সব খবর বাইরের জগতের লোক জানত না।
এই জেলের একটা ওয়ার্ডে জেল কর্তৃপক্ষের কিছু অনুগত গুন্ডা বদমাশকে রাখা হয়েছিল। নিজস্ব উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য জেলার এদের বিশেষ সুখ সুবিধার ব্যবস্থা করে রেখেছিল। নকশালদের মধ্যে যে সব ছেলে জেলকর্তৃপক্ষের বিষ নজরে এসে যেত তাকে ওয়ার্ড বদলি করে ঢুকিয়ে দেওয়া হতো এই নম্বরে। আর সন্ধ্যে ছটার গুনতির পর যখন ওয়ার্ড “লকআপ”করা হয়ে যেত, ওই গুন্ডারা এক যোগে ঝাঁপিয়ে পড়ত নকশাল বন্দিটির উপর। এ সব খবর বাইরে বের হবার কোন উপায় ছিল না। যদিবা বের হয় কর্তৃপক্ষ একে দুদল কয়েদির মারামারি বলে ব্যাপারটা হালকা করে দিত।
এটা সেই জরুরি অবস্থার কাল। তখন যেন সরকার আর সরকারের পোষ্য জেল সেপাই গুন্ডা বদমাশ সবাই মিলে একদল নিরস্ত্র অসহায় নকশাল বন্দিদের ধ্বংস করে ফেলার সর্বাত্মক সন্ত্রাস ষড়যন্ত্র শুরু করে দিয়েছিল। যদি ছুতোনাতা পেত যেমন ভাবে নিরীহ হরিণ ছানার উপর শেয়ালের পাল ঝাঁপিয়ে পড়ে সেই ভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ত। যদি ছুতো না পায় ছুতো তৈরি করে নিত।
কবি নবারুণ ভট্টাচার্য লিখেছেন–এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ নয়।…কিন্তু সত্যি এটাই যে সারা দেশটাই তখন মৃত্যু উপত্যকা, জল্লাদের উল্লাস মঞ্চ। যার সবচেয়ে নগ্ন নির্লজ্জ বিভৎস নৃত্যভূমি ছিল এই জেলখানাই। লোক চক্ষুর অন্তরালে দিনের পর দিন যে অত্যাচার শাসকদের প্রশ্রয়ে এখানে সংগঠিত হয়েছিল তা যে কোন সভ্যদেশ বা জাতির পক্ষে চরম লজ্জা-ঘৃণা-নিন্দার।
নকশালরা সব শিক্ষিত ছেলে। জেলারের ডেপুটি জেলারের ভয় ছিল যদি তাদের হাতে পেন কাগজ পৌঁছে যায়, সব বিস্তারিত লিখে যদি বাইরে পাচার করে দেয় মহা হাঙ্গামা হয়ে যাবে। তাই আমার প্রতি এই কঠোর নির্দেশ। তবে তারা আমার কাছে কোনদিন কাগজ পেন চায়নি। চাইলে দিতাম কী দিতাম না সে আমি জানি না।
পেন কাগজ হাতে পেয়ে আমার উদ্যমের নদীতে এবার পূর্ণ জোয়ার এসে গেল। প্রথমে বড় তারপর মেজ তারপর ছোট–আরও ছোট অক্ষর লেখায় হাত রপ্ত হয়ে উঠল। ওয়ার্ডের পড়ুয়া ছেলেটার কাছে অনেক বই আছে তার কাছ থেকে একখানা বই চেয়ে নিয়ে বানান করে করে বেশ খানিকটা পড়েও ফেলতে পারলাম। শুধু বুঝতে অসুবিধা হচ্ছিল যুক্তাক্ষর আর তার মানে। অন্বয়, এই শব্দের অর্থ যে অনুবৃত্তি অর্থাৎ বাক্যের মধ্যে কর্তা কর্ম ক্রিয়া প্রভৃতির পরস্পর সম্বন্ধ সে আমি তখন বুঝে নিতে অপারগ।
একটি শব্দ দেখিয়ে মাস্টার মশাইয়ের কাছে জানতে চাই–এটা কী? তিনি পড়ে বলেন কুম্ভীলক। এর মানে? চোর। তবে কোন সাধারণ চোর নয়, বিদ্বান চোর। যে অন্য কোন লেখকের লেখা তার ভাব ভাষা নিজের বলে চালিয়ে দেয়। তাকে বলে কুম্ভীলক বৃত্তি। ওই বই থেকে দেখে দেখে হুবহু দু তিন পাতা লিখে ফেলে দিই। অক্ষর তেমন সুন্দর হয় না। আঁকাবাঁকা অক্ষরের সে লেখার উপরে লিখে দেই আমার না। এটা আর কারও নয়–আমারই।
