এরপর জেলগেটের খাতায় কার কি লাগবে লেখানোর পালা। কেউ লেখাচ্ছে চিড়েগুড় বিড়ি সাবান। কেউ বিড়ি গামছা ছাতু। আমি বললাম-আমাকে এই টাকায় যতটা হয় কাগজ আর পেন দেওয়া হোক। খাতা লিখছিলেন ডেপুটি জেলার। পাঁচ ফুট উচ্চতা, মাথায় টাক চোখে চশমা, নাকে বড় বড় লোম, যাতে নস্যি মাখানো, তাকাবার সময় তাকায় চশমার উপর দিয়ে। বলে সে–কি চাই? আইজ্ঞা কলম আর কাগোচ। ও দিয়ে কী হবে? লেখাপড়া শিখমু। তার চোখে ঠোঁটে বিদ্রূপ ছলকায়, লেখপড়া শিখে কী বিদ্যাসাগর হবি নাকি! বিনয়ের সাথে বলি, আমি ছার “রাইটার” হইতে চাই।
জেলখানায় সাজা হয়ে গেলে তাকে হয় চৌকা নয় ডাল চাকি, নয় কম্বলঘর কোথাও না কোথাও “খাটনি” দিতে যেতে হয়। এসব খুব শ্রমের কাজ। যা সাধারণতঃ নিরক্ষর, বা অল্প শিক্ষিত কয়েদিরা করতে বাধ্য হয়। আর যারা লেখাপড়া জানে অফিসিয়াল কাজ পায়। এর মধ্যে সবচেয়ে সম্মানীয় পদের নাম রাইটার। পরিস্কার পোষাক পরে পকেটে পেন গুঁজে সারা জেল ঘুরে বেড়ায়। কে কোর্টে যাবে, কার ইন্টারভিউ তাদের নাম ডেকে বেড়ায়। আমার লোভ ওই পদের দিকে।
আমার জবাব শুনে ওহঃ করে একটা শব্দ ছেড়ে বলেন তিনি–আন্ডার ট্রায়াল প্রিজনারকে কাগজ কলম দেবার নিয়ম জেলকোডে নেই। অন্য কিছু বল। নরম গলায় বলি, কিন্তু আমাদের ওয়ার্ডে একটা ছেলে থাকে। ও তো সব পায়!
বলে ডেপুটি জেলার, ওর জন্য মেজিস্ট্রেটের স্পেশাল পারমিশান আছে। পারমিশান করিয়ে আন। তুইও পাবি।
মনটা বড় খারাপ হয়ে গেল আমার। মেজিস্ট্রেট আমার কথা শুনবে না। শুনবে কালো কোট পরা উকিলের কথা। আমার তো কোন উকিল নেই। তাছাড়া এখন তো আমার সাথে মেজিস্ট্রেটের দেখা হবার কোন পথও নেই। কোর্টে যাই, চৌদ্দদিন অন্তর। কোর্ট লকআপে সারাদিন কাটিয়ে সন্ধ্যায় ফিরে আসি। সে বড় কষ্ট। তাই মাঝে মাঝে শরীর খারাপ বলে কোর্টে যাওয়া থেকে রেহাই নিয়ে নিই। চোখে এখন জল এসে যায় আমার। ডেপুটি জেলারকে বলি, কাগজ কলম যদি না দিতে পারেন আমার আর কিছু চাই না।
যখন আমি ডেপুটি জেলারের অফিস থেকে বের হয়ে ওয়ার্ডের দিকে আসছি কেস টেবিলের সামনে দেখা হয়ে গেল ভুবন সেপাইয়ের সাথে। বার বার গামছায় চোখ মুছতে দেখে জিজ্ঞাসা করে সে–কী হয়েছে, কাঁদছিস কেন?তখন যাযা হয়েছে খুলে বলার পর সব শুনে বলে সে আমার সাথে আয় দেখি। তারপর ডেপুটি জেলারের সামনে গিয়ে বলে–স্যার এখন জেলখানার নাম বদলিয়ে সংশোধনাগার রাখা হয়েছে। একটা ছেলে নিজেকে সংশোধন করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে। লেখাপড়া শিখে মানুষ হতে চাইছে। সেই সুযোগটা আমরা যদি তাকে না দিই, খুব অন্যায় হবে। একবার ওর মনের ইচ্ছার কথাটা ভেবে দেখুন। ছেলেটা রক্ত দিয়ে কাগজ কলম কেনার চেষ্টা করেছে। এমন ছেলে তো আমাদের প্রশংসার পাত্র হবার যোগ্য। আমি অনুরোধ করছি, ওকে কাগজ কলম দিয়ে দিন স্যার।
অফিসারদের সাথে এমন জোরের সাথে কথা বলার ক্ষমতা অধঃস্তন কর্মচারীদের থাকে না। এই ক্ষমতা, সততা সাহস আর ন্যায়ের উপর দাঁড়িয়ে থাকলে তবেই আসে। ভুবন সেপাই কোন রকম কোন দুর্নীতি, কোন অনৈতিক কাজের সাথে যুক্ত নয়। যা কমবেশি সব সেপাই করে থাকে। তাছাড়া সে কারারক্ষী সমিতির একজন বিশিষ্ট কর্মকর্তা। সে যখন কারও সাপোর্টে দাঁড়িয়ে যায়, ঠেলে ফেলা কঠিন। বলে ডেপুটি জেলার জেলার বাবুর সাথে কথা বলে দেখি কি করা যায়। তখন আমার দিকে তাকিয়ে বলে ভুবন সেপাই–তুই যা। চিন্তা করিস না, পেন কাগজ পেয়ে যাবি।
দিন দুই তিন পরে পেয়ে গিয়েছিলাম পেন আর কাগজ। কুড়ি টাকায় ছয় দিস্তা কাগজ আর একটা কালির পেন পেয়েছিলাম। তবে সব আমাকে একবারে দেওয়া হয়নি। রাখা ছিল অফিসে। শর্ত ছিল রোজ আমাকে দু খানা তিনখানা করে কাগজ দেওয়া হবে। সেগুলোর লিখে জমা দেবার পর আবার দেওয়া হবে। যদি আমি এই কাগজ হারিয়ে ফেলি, নকশাল বন্দীদের দিয়ে দিই তাহলে সাজা পেতে হবে। আসলে জেলকর্তৃপক্ষের এই ভয়টাই ছিল যদি কেউ ওই কাগজে চিঠি ফিটি লিখে কোন পত্র পত্রিকার দপ্তরে পাঠিয়ে দেয়। জরুরি অবস্থায় জেলখানায় যে অমানুষিক বর্বরতা, যে অন্যায় অত্যাচার চলছে, তাহলে সব প্রকাশ হয়ে যাবে।
একজন বিখ্যাত মানুষ বলে গেছেন–রাজনীতি হচ্ছে দুষ্কৃতকারীদের শেষ স্মরণ স্থল।বর্তমান সময়ের রাজনেতা ও তার সঙ্গিসাথীদের দেখে মনে হতেই পারে যে উনি খুব একটা ভুল বলেননি। এমন কোন অপরাধ আছে যা এরা করে না? তবে ওই বিখ্যাত ব্যক্তি সম্ভবতঃ নকশাল পার্টির কর্মীদের (আমি যাদের দেখেছি) দেখার সুযোগ পাননি। তা যদি পেতেন, আমার ধারণায় ওই কথাটা বলার আগে দুবার ভাবতেন।
আমার ভাগ্য আমাকে অল্প কিছু সময়ের জন্যে ওই মানুষগুলোকে সেইসময় জেলের বাইরে এবং জেলের ভিতরে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ দিয়েছে। কী তাদের ছিল না? বিদ্যা ছিল, বিত্ত ছিল, প্রভাবশালী দাদা কাকা মামা ছিল। চাইলে এই সব সুযোগ কাজে লাগিয়ে অনেক উঁচুতে উঠে যেতে পারতো। ইহলৌকিক যাবতীয় সুখ ভোগ বিলাসে কাটাতে পারতো সারাটা জীবন। তারা সে সব না করে এই দেশটাকে ভালোবেসে–দেশের শ্রমিক কৃষক দরিদ্র মানুষের কষ্টে কাতর হয়ে এসে দাঁড়িয়েছিল এই বিপদ সংকুল পথে। কতো কষ্ট সয়েছে তারা কী ভীষণ সাহসে প্রাণ দিয়েছে একর পর এক। জেলখানার নির্মম দেওয়ালের পিছনে কী অবর্ণনীয় অত্যাচার চালিয়েছে শাসক শ্রেণির পোষা গুণ্ডারা তাদের উপর। সবকিছু শুধু এই কারণে যেন তাদের মনোবল চুরমার করে দিতে পারে। মন থেকে ভুলিয়ে দিতে পারে মানুষকে ভালোবাসার আর শ্রেণিহীন এক সমাজ গড়ার সব স্বপ্ন। ভুলিয়ে দিতে পারে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার প্রবণতা।
