একদিন বসে বসে মাটির গায়ে আঁচড় কাটছি। সেটা সকাল বেলার টিফিন খাবার পরে। অক্ষরের যক্ষপুরীতে এমন হারিয়ে গিয়েছি যে বাহ্যজ্ঞান লুপ্ত বলা চলে। এর মধ্যে কখন যে দুবার “চলো, ফাইল” বলা হয়ে গেছে, টেরই পাইনি। এরপর আর ওয়ার্ডের বাইরে থাকার নিয়ম নেই। ওয়ার্ডে ঢুকে “লকআপ”হবার নিয়ম। নিয়ম না মানলে আর কোন কথা নেই পিঠে ডান্ডা। নিয়ম ভঙ্গ আমার হয়েই গেছে। আর উঠোনে কেউ নেই। সবাই চলে গেছে লকআপ হতে। মাস্টার মশাইয়ের আজ শরীরটা ভালো নেই। নাস্তা নিয়েই ওয়ার্ডে গিয়ে শুয়ে পড়েছেন। উনি কাছে থাকলে আমাকে ডেকে তুলতেন। ছিলেন না বলেই জেলাকোডের শাস্তি যোগ্য একটা অপরাধ করে ফেলেছি। টের পেলাম আমার অপরাধের শাস্তি দেবার জন্য পিঠের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে যার মুখ খুব কম চলে–ডান্ডা চলে বেশি, সেই ভুবন সেপাই।
কীরে, কী করছিস রে? কি করছি তা আমার আর বলার দরকার পড়ে না। তার চোখেই পড়ে যায়, জেলখানার মাটিতে ফুটে থাকা আঁকা বাঁকা বর্ণমালা। যে রাগ কিছুক্ষণ আগে তার চোখ মুখ থেকে ঠিকরে বের হচ্ছিল তা এখন নিভে যায়। হাতের লাঠি তার হাতে থেকে যায়। শূন্যে উঠে আমার পিঠে আছড়ে পড়ে না। ধীর গলায় বলে সে, সময় শেষ। আবার বিকালে লিখিস। যা, লকআপ হ গিয়ে।
মানুষ চেনা সত্যিই কঠিন, কে যে কী কিছু বোঝবার উপায় নেই। যে ভুবন সেপাই সারা জেলে নির্দয় মারকুটে বলে খ্যাত, যে জেলকোডের নিয়ম বিরুদ্ধ কোন কাজ করে না, যদি কেউ তা করে, তাকে ছাড়ে না, সে আজ সম্পূর্ণ বেআইনি একটা ঘটনা ঘটিয়ে বসে। এক সপ্তাহ তার ডিউটি ছিল আমাদের ওয়ার্ডে। সাতদিন সে আমার মাটি খোঁড়া দেখছে। তারই ফলে এই ভূমিকায়। ডিউটিতে এসে সে আমাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে এক বাকসো চক পেনসিল হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে–তোর সাধনায় আমার অল্প একটা সহযোগ থাক। কেউ যেন না দেখে। লুকিয়ে রাখ। এভাবে বাইরের কোন জিনিস গোপনে জেলের মধ্যে নিয়ে আসা বেআইনি কাজ।
স্বরবর্ণ ব্যঞ্জনবর্ণ তো মাটি আর লাঠির কল্যাণে শেখা হয়ে গিয়েছিল। এবার চক দিয়ে সিমেন্টের মেঝের উপর শেখা শুরু হল আ কার ইকার। মাস্টার মশাইয়ের এখন জানালার উপর বসে মুক্ত বিশ্বাবলোকন ছুটে গেছে, সারাক্ষণ উনি আমাকে দেখছেন। আমাকে দেখাচ্ছেন। কেমন করে অক্ষরের পিছনে অক্ষর বসিয়ে একটা শব্দ হয়। কেমন করে শব্দের পরে শব্দ সাজিয়ে বাক্য হয়। কেমন করে বাক্যের সাথে বাক্য জুড়ে মনের ভাব সম্পূর্ণ প্রকাশ করা যায়। লেখ, অয় আকারে আ, ময় আকারে মা, রেফরয়ের র,–আমার, নয় আকারে না, আর ম নাম, আমার নাম–। লেখ, প আর থয় রশ্মিকার, পথি, আর ক পথিক।
-কিন্তু আমার নাম তো..
যে পথ চলে তারই নাম পথিক। তুই এখন চলেছিস। কোথায় চলেছিস বলতো? অন্ধকার থেকে আলোর দিকে। এক এক পা করে এগিয়ে চলেছিস সূর্যোদয়ের দেশের দিকে। খুব দ্রুত তোর উন্নতি হচ্ছে। লেখ লেখ লিখে যা, থামিস না। অদ্ভুত এক মোহে আমি মগ্ন হয়ে গেছি, অদ্ভুত এক তপশ্চর্যা। এক রাতে স্বপ্ন দেখলাম আমি, কে এক দিব্যকান্তি পুরুষ আমাকে বলছে জেলখানার মেঝেতে তুই অক্ষর নয়, জীবন লিখছিস। তোর অনাগত ভবিষ্যৎ লিখছিস। বর্ণময় শব্দে সজ্জিত গর্বিত জীবন। এগিয়ে চল। চরৈবেতি।
০৫. জেলখানার রক্তদান শিবির
সেদিন জেলখানার রক্তদান শিবির বসেছে। সে সময় মানুষের মধ্যে আজকের মত এত সচেতনতা ছিল না। যে পাড়ায় পাড়ায় ক্লাবে ক্লাবে রক্ত সংগ্রহের জন্য উদ্যোগ নিয়ে রক্তদান শিবির চালাবে। তখনকার সময়ে রক্ত যোগান দেবার সবচেয়ে বড় কেন্দ্র ছিল দেশের কারাগারগুলো। এখানে যদি সাজা প্রাপ্ত বন্দী একবার রক্ত দেয় তাহলে তার সাজা কুড়ি দিন কমে যায়। পরে আবার দিলে বাইশ দিন–এইভাবে প্রতিবারে দুদিন করে বেড়ে যায়। আর যারা বিচারাধীন বন্দী তারা রক্ত দিলে পায় নগদ কুড়ি টাকা। জানি না, এখন এই টাকার পরিমাণ কতটা বৃদ্ধি পেয়েছে।
যারা সাজা প্রাপ্ত বন্দী, তারা মাসে সামান্য কিছু মাইনে পায়। যা দিয়ে তারা তাদের তেল সাবান বিড়ি সিগারেট এবং অন্য যা প্রয়োজন কিনে নিতে পারে। কিন্তু যারা বিচারাধীন–যাদের জেলের বাইরে সহায়ক কেউ নেই তারা কী করবে? তারা রক্তদান করে পাওয়া টাকায় নিজের প্রয়োজন অনুসারে কিছু জিনিস কিনে নিতে পারে। জেল গেটের খাতায় নাম আর মাল লিখিয়ে দিলে কর্তৃপক্ষ সেগুলো আনিয়ে দেয়।
দিন দুয়েক আগে খবর পেয়েছিলাম–শিবির বসবে। তখনই মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে বসেছিলাম। আজ হিষ্ট্রি টিকিট হাতে নিয়ে রওনা দিলাম রক্ত দেবার জন্য হাসপাতালের দিকে। প্রায় ঘন্টা খানেক পরে আগের আট-দশ জনের রক্ত টেনে নেবার পরে আমার ডাক এল। জীবনে এই প্রথম। একটু ভয় ভয় তো করছিলই। চিৎ করে আমাকে শুইয়ে ফেলা হল হাসপাতালের বেডে। বা হাতের তালুতে দেওয়া হল একটা শক্ত রবারের টুকরো কষে ধরে থাকার জন্য। দাবনায় বাধা হল একটা রবার নল। এবার একটা মোটা সূঁচ ফুটিয়ে দেওয়া হল হাতের ফুলে ওঠা শিরায়। যে সুচের সাথে লাগানো নল লম্বা হয়ে পৌঁছে গেছে একটা বোতলের মধ্যে। এবার আমি নির্দেশ মত হাতের তালুর রবারটা চাপছি আর ছাড়ছি। ছাড়ছি আবার চাপছি। এতে বেগে রক্ত বের হয়। কিছুক্ষনের মধ্যে কলকল করে ভরে গেল বোতল–আমার লাল গরম রক্তে।
