আজ আবার সকাল হয়েছে। আজকের সকাল অন্যদিনের মতো নয়। কালরাতে যে ঘনমেঘ আকাশ ঢেকে রেখেছিল তা এখন আর নেই। সকাল বেলার সুর্য উঠেছে পুবাকাশ লাল করে। জানালা দিয়ে সে আলো এসে পড়েছে আমাদের ওয়ার্ডে। দেওয়ালের ওপারে একটা বিশাল বৃক্ষ। যার ডালে ডালে নেচে বেড়াচ্ছে লাল ঠোঁট সবুজ পাখনা হলুদ লেজ এক ঝাঁক পাখি। মনটা এখন একেবারে হালকা নির্ভার। বুকের উপর যে দেওয়াল সর্বক্ষণ চেপে বসে থাকে সে নেমে গেছে। এখন যেন আমি উড়ে যেতে পারি মহাকাশের মহাউচ্চতায়। যেখান থেকে জেলখানার উঁচু দেওয়ালকে অবলীলায় অস্বীকার করা যায়। আমি যেন প্রজ্ঞার সেই পাঠ পেয়ে গেছি।
পাঁচটার গুনতির পর আজ আর আমি ‘ফালতু’ হয়ে যাই না। মুখ হাত ধুয়ে এসে মাস্টারমশাইয়ের পায়ের কাছে নত হয়ে বসে পড়ি। উনি অবাক হয়ে জানতে চান কী ব্যাপার রে? বলি, আমি লেখাপড়া শিখমু। আপনে আমারে শেখান। উনি নির্নিমেষে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন। যেন তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে আমার অন্তরের অন্তঃস্থল পর্যন্ত দেখে নেন। তারপর কোন কথা না বলে সোজা উঠে চলে যান। আবার ফিরে আসেন অল্প কিছু সময় পরে। ওনার হাতে একটা ছোট্ট কাঠি। সেটা আমার দিকে এগিয়ে দেন–নে ধর। এটা কী? এটা তোর কলম। আর এই উঠোন এটা তোর লেখার কাগজ। আর বই? নিজের বুকে হাত রাখেন তিনি–আমি তোর বই। আজ বৃহস্পতিবার–গুরুবার। খুব ভালোদিন। চল হাতেখড়িটা দিয়ে দিই।
মাস্টার মশাই সেইকাঠিখানা দিয়েশ্নটির উপুর মিষ্টির দোকানের নিমকির মত তিনকোনা একটা দাগ টেনে বললেন, কি ভাবে টানলাম আঁকটা দেখলি? পুব থেকে তেরছা করে উত্তরে, উত্তর থেকে পশ্চিমে তারপর সোজা আবার পুবে। এবার একটা বরশি মোচড়। এই হল ক। লেখ। এবার নিজে নিজে। দেখি পারিস কিনা। পারলাম। তবে অক্ষরটা ওনার মত সুন্দর হল না। শুরু হল আমার নিরক্ষরতার অন্ধকার মহাসমুদ্র পার হয়ে সাক্ষরতার উপকুলে পৌঁছাবার এক কঠিন সংগ্রাম। এ মহাসংগ্রাম নিজের সাথে নিজের। এ লড়াই জিততেই হবে। মাস্টার মশাই জারি করলেন তার অমোঘ আদেশ, ব্যঞ্জনবর্ণের চৌত্রিশটা অক্ষর। বেশি নয়, রোজ পাঁচটা করে লিখতে শিখতে হবে। যে পিছনে পড়ে যায় তাকে জোরে ছুটতে হয়। তুই কুড়ি বছর পিছনে পড়ে গেছিস। রোজ ষোলো আঠারো ঘন্টা শিখবি। বলে না, মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পতন। আজ থেকে তোর সেই পণ হোক।
মাস্টার মশাইয়ের কথা শুধুমাত্র কথার কথা নয়। মনের মধ্যে গেঁথে রেখে দেবার মত বাক্য বাণী জ্ঞান। মনে মনে প্রণাম করি ওনাকে। বরণ করে নিই যার স্থান ঠিক জন্মদাতা মাতা পিতার পরে সেই গুরুদেবের আসনে। এই তো সেই মহাগুরু, সেই মহান শিল্পকার–যার কুশলী হাতের স্পর্শে খড়কুটো মাটি প্রাণ পায়, প্রতিমা হয়। আমাদের ধর্ম বলেছে গুরু যদ্যপি করে বেশ্যালয় গমন, তথাপি জানিবে গুরু পতিত পাবন। হোক চিটিংবাজ ঠগ জালিয়াত প্রতারক। তবু উনি আমার গুরু, আমার প্রণম্য।
এখন আমার বাবার কথা মনে পড়ে। তিনি নিজে লেখাপড়া জানতেন না, তবু বিদ্বান মানুষদের প্রতি তার ছিল গভীর শ্রদ্ধা। অজস্র ছোট গল্প ছিল তার স্মৃতিতে। লোকশিক্ষার জন্য তৎক্ষণাৎ একটা গল্প বলে দিতে পারতেন। একদিন তিনি আমাকে বলেছিলেন মুখ কালিদাসের গল্প। কালিদাস মহামূর্খ, তাই তার বিদুষী স্ত্রী পদে পদে তাকে লাঞ্ছনা গঞ্জনা দেয়। তাই একদিন তিনি মনের দুঃখে জলে ডুবে আত্মহত্যা করবেন বলে চলে গেলেন দিঘির ঘাটে। সেখানে এসে দেখেন পুরনারীরা জলঘাটে জল ভরছে। তারা চলে না গেলে তো ডুবে মারা যাবে না, তাই বসে রইলেন এক গাছতলায়, কখন ঘাট খালি হবে সেই অপেক্ষায়। যখন ঘাট ফাঁকা হল কাছে এসে দেখলেন পুরনারীরা দিঘি থেকে জল তুলে এনে পাথর বাধানো ঘাটের সিঁড়ির যে জায়গায় রাখে, মাটির কলসির ঘষায় ঘষায় সেখানে একটা গর্ত হয়ে গেছে। তখনই তার গভীর জ্ঞানের উদয় হল–মাটির কলস, যা অতি ক্ষীণজীবী বস্তু যা অতি পলকা, তার অবিরাম ঘর্ষণে কঠিন পাথরও যদি ক্ষয়ে যেতে পারে, আমি মুখ কালিদাস নিরন্তর চেষ্টায় কেন পন্ডিত হতে পারব না। পারব, আমিও পারব। আমাকে পারতেই হবে। এই প্রতিজ্ঞা করে ফিরে এলেন তিনি। আর একদিন মহাকবি হলেন।
আমাদের ওয়ার্ডের বাইরে থাকার মেয়াদ সকালে দু ঘন্টা বিকালে দু ঘন্টা। এই চার ঘন্টা আমার নাগালে থাকে মাটি। যতক্ষণ মাটি পাই কাঠি দিয়ে মাটির গায়ে আখর ফোঁটাই, কখগঘ। যখন ওয়ার্ডের মধ্যে বন্ধ থাকি ভেজা আঙুল দিয়ে সিমেন্টের মেঝেতে অক্ষর আঁকি, ভাত খেতে খেতে ভাতের থালার ডালের দাগের মধ্যে এঠো তর্জনী দিয়ে লিখতে চেষ্টা করি বর্ণমালা। যখন হাতের কাছে কিছু থাকে না। মনে মনে লিখি, মনে মনে পড়ি। এখন আমি আমার চারদিকে অক্ষর ছাড়া আর কিছু দেখতে পাইনা। এক একটা মানুষের মুখ, তাদের হাঁটা হাসা হাত নাড়ানো সব আমার কাছে অক্ষরের মতো মনে হয়। যে লোকটা আমাদের ভাত দেয়, হাতের মুদ্রায় দন্তন্য লিখছে, যে ডাল দেয় যেভাবে ড্যাগ থেকে হাতা ঘুরিয়ে ডাল তুলে থালায় ঢালে, মনে হয় একটা বড় আকারের ত হয়ে যায়। ক-এর আকশিটা না থাকলে সেটা হয়ে যায়। ব-এর পেট থেকে একটা দাগ টেনে নিচে নামিয়ে আবার খানিকটা উপরে ঠেলে দিলে সেটা ঝ। ব-এর নিচে একটা পুটলি দিয়ে দিলে সেটা র। কয়ের আকশিটা উপরে ঘুরিয়ে দিলে ওমনি সেটা ধ। ক এর উপর দিকটা একটু ফাঁকা রাখলে সেটা ফ। ময়ের সামনের পুটলিটা না দিলে সেটা অন্তয্য, পুটলির জায়গাটা টেনে লম্বা করে দিলে দন্তস্য। পেটটা কেটে দিলে মূর্ধণ্য-ষ। ঢায়ের মাথায় একটা টিকি লাগিয়ে দিলে সেটা ট হয়ে যায়। সারাটা দিন ধরে আমি মনে মনে এই খেলা খেলি।
