যারা ওখানে উপস্থিত ছিল। ব্যাপারটায় সবার বেশ মজা লাগছিল। তারা ভেবেছিল এটা দু দশদিনের একটা খেলা। একঘরে একা আর কদিন থাকতে পারবে। তো তারা রীতিমত শর্তনামা লিখে দুজনকে স্বাক্ষর করিয়ে নিল। আগামী কোন এক নির্দিষ্ট দিন থেকে শুরু হবে লোকটার বন্দীজীবন।
লোকটা বিবাহিত। স্ত্রী তার স্বামীকে নিরস্ত করবার চেষ্টায় বলে–এ কী করতে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত তোমাকে তো হেরেই যেতে হবে। কুড়ি বছর কোনভাবে বন্দি হয়ে থাকতে পারবেনা। মাঝখান থেকে কতগুলো দিন অকারণে নষ্ট হবে। কিন্তু লোকটা নিজের সিদ্ধান্তে অটল হয়ে রইল। স্ত্রীকে সে বোঝাল, দ্যাখো, আমি তো বলতে গেলে তেমন কিছু রোজগার করতে পারি না। সংসার তোমাকেই চালাতে হয়। এই অবস্থায় আমি যদি না থাকি তোমার খুব একটা অসুবিধা হবে না। আর আমি জীবনে তো তোমাকে কোন সুখ দিতেও পারিনি। কোনদিন তা পারব বলে মনে হয় না। তবে যদি আমি কুড়িটা বছর কাটিয়ে আসতে পারি বাকি জীবনটা সুখে কাটবে। তুমি আমাকে বাধা দিওনা।
যথারীতি নির্দিষ্ট দিনে তিনি গিয়ে প্রবেশ করলেন এক বাগান বাড়ির নির্জন কক্ষে। বাইরে থেকে লাগিয়ে দেওয়া হল বড় একটা তালা। দিন কাটতে লাগল তার একা সেই কক্ষে। প্রথমদিকে কিছুদিন সে খুব দামি মদ সুস্বাদু খাদ্য–যা সে আগে খেতে পায়নি, সে সব চিরকুটে লিখে আনাতে লাগল। দেখল, এসব ইন্দ্রিয়আসক্তি উগ্র করে। তাই বর্জন করে দিল সব, গ্রহণ করতে লাগল সাদামাটা সাত্ত্বিক আহার। আর চিত্ত চাঞ্চল্য স্ববশে রাখার জন্য চেয়ে পাঠাতে লাগল ধর্মপুস্তক। কিছুদিন পরে চাইল পৃথিবীর প্রধান প্রধান ভাষা শিক্ষার বই। যখন ভাষা রপ্ত হয়ে গেল তখন যে ভাষায় যত রকম দুমুল্য-দুষ্প্রাপ্য বই পাওয়া যায় সে সব চাইতে লাগল আর পড়ে যেতে লাগল। এখন আর সে অন্যকিছু চায় না–শুধু বই আর বই।
গৃহস্বামী বিশাল বিত্তবান লোক। এ সব চাহিদা পূরণ করা তার পক্ষে কঠিন কিছু নয়। তা ছাড়া সে ভেবেছিল, কিছুদিন পরে বন্দী হাঁপিয়ে উঠবে। শেষে পরাজয় স্বীকার করে নিয়ে মুক্তি ভিক্ষা চাইবে। কিন্তু বন্দী তার কিছুই করল না। সে মহানন্দে ডুবে গেল জ্ঞানসাগরের মধ্যে। এভাবেই দিন কেটে চলল। এক সময় মানুষ ভুলে গেল বন্দীর কথা। নির্জন সেই কক্ষে সে বেঁচে আছে না মারা গেছে কারও তা মনে রইল না। এক সময় ধীরে ধীরে ফুরিয়ে গেল মেয়াদের কাল। পূর্ণ হয়ে গেল শর্তের কুড়ি বছর। আর মাত্র একটা রাত, তারপর মুক্তি পাবে বন্দী। কাল তাকে দিতে হবে বাজিধরা কুড়িলক্ষ ডলার। তখন গৃহস্বামীর আর আগের মত অবস্থা নেই। বড় আর্থিক মন্দা চলছে। এখন তার পক্ষে অতটাকা দেওয়া এক কঠিন ব্যাপার। দেউলিয়া হয়ে যেতে হবে তার। সেই চিন্তায় তখন গৃহস্বামীর পাগল পাগল দশা।
মানুষ তো মানুষই হয়। তার মধ্যে একাধারে দেবতা ও শয়তানের বাস।কখন যে মানুষ কার দ্বারা সঞ্চালিত হবে, কেউ জানে না। গৃহকর্তা তখন কী ভাবে টাকা না দিয়ে পার পাওয়া যায় সেই চিন্তায় অস্থির। তখন ভাবে, বন্দী লোকটাকে রাতের অন্ধকারে খুন করে লাশ গুম করে দেব। এখন আর তার কথা কারও মনে নেই। যদি কেউ কোনদিন তার কথা জানতে চায়, বলে দিলেই হবে, সে বহুদিন আগেই পালিয়ে চলে গেছে।
এই ভেবে গৃহকর্তা গভীররাতে একটা ধারালো অস্ত্র নিয়ে পৌঁছে গেল বন্দী নিবাসে। চাবি ঘুরিয়ে বহুকালের জংধরা তালাটা খুললেন। নিঃশব্দ ঘরের ভিতর ঢুকে দেখলেন, টেবিলের এককোণে একটা মোমবাতি জ্বলছে। চেয়ারে বসে কিছু লিখতে লিখতে টেবিলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে বন্দী লোকটি। কুড়ি বছর আগে যেমন দেখেছিলেন এখনকার চেহারায় তার কোন মিল নেই। শীর্ণকায়, পক্ককেশ অকালেবৃদ্ধ হয়ে যাওয়া বিস্মৃত মানুষ।
গৃহস্বামী টেবিলের উপর থেকে সেই লেখা খাতাটা তুলে নিয়ে পড়তে লাগলেন এতে বন্দী মানুষটা কী লিখেছে, অবাক হলেন তিনি, এটা তারই উদ্দেশ্যে লেখা একটা চিঠি। বন্দী লিখেছে, প্রিয় বন্ধু, আমি জানি আজ তুমি আসবে ও আমাকে হত্যা করতে চাইবে। কারণ তোমার আর্থিক স্থিতি এখন ভালো নয়। এতগুলো ডলার দেওয়া বর্তমানে তোমার পক্ষে অসম্ভব! আমি তোমাকে পরামর্শ দেব, তবু আমাকে হত্যা কোরো না। এতে তোমার ধরা পড়ে যাবার একটা ক্ষীণ সম্ভাবনা আছে। তাতে সাজা এবং লোকনিন্দা দুটোই তোমার ভাগ্যে জুটবে। আমি তা চাই না। আমি তোমার প্রতি কৃতজ্ঞ। তোমার অনুগ্রহে আমি যে সব বহুমুল্য পুস্তক অধ্যায়ন করবার সুযোগ পেয়েছি নিজের চেষ্টায় কখনই পারতাম না। তাই তোমাকে বিব্রত না হতে হয়, সূর্যোদয়ের পূর্বে আমি বন্দীশালা থেকে বাইরে বের হয়ে যাব। দরজাটা খোলা রেখে দিও। আর সে তাই করেছিল। বিশ লক্ষ ডলারের মোহ দু পায়ে মাড়িয়ে চলে গিয়েছিল বন্দীশালার বাইরে।
গল্প শেষ করে আমার দিকে তাকালেন মাস্টার মশাই। এটা একটা গল্প। তবে এই গল্প থেকে আমরা এই শিক্ষা নিতে পারি যে বন্দিত্ব যতই কঠোর বা কষ্টকর হোক মনের জোর, শেখার আগ্রহ থাকলে তাকে হারিয়ে দিয়ে জয়ী হওয়া যায়।
রাত তখন গভীর। বিশ্ব চরাচর নিঝুম। কেউ কোথাও জেগে নেই। জেগে আছি আমরা দুজন। এক জ্ঞানবৃক্ষের নিচে এক রাখাল বালক। রাত একটু একটু করে ভোরের দিকে এগিয়ে চলেছে। তখন আমার মনে হচ্ছিল যেন বহুদূর কোন পাহাড়ের গুহায় বসে কোন ঋতবাক পুরুষ জগতবাসীর উদ্দেশ্যে শোনাচ্ছেন অভয় মন্ত্র–কোন অন্ধকারই ধ্রুব নয়। ধ্রুব হচ্ছে আলোকপতি অংশুমালী। তাকে আহবান জানাও অন্ধকার সরে যাবে।
