জানতে চাই, আপনার মাথা যে খারাপ হয়ে গিয়েছিল আপনি সেটা বুঝতে পারেন?
বিষণ্ণ হেসে বলে সে-যখন সেটা বুঝতে পারি তখন আমি সুস্থ। যখন বুঝতে পারি না, পাগল তো তখন।
আর একটা প্রশ্ন, যে প্রশ্নের উত্তরের মধ্যে লুকনো আছে সব প্রশ্নের সব উত্তর। এবার সেটাই করে বসি তাকে, কারণ ছাড়া তো কোন কার্য হয় না, তাহলে আপনার মাথা খারাপ হয়ে যাবার কারণ কী?
একটু থেমে বলে সে–একটা বই পড়ে।
–সেকি। চমকে উঠি আমি তার কথায়। জানি যে ধুতরোর বীজ খেলে মানুষ পাগল হয়। পরিমাণে বেশি হলে মানুষ মারাও যায়। কিন্তু একটা নিরীহ বইয়ে এত বিষ! সে কি করে হয়? জানতে চাই–কি বই?
বলে সে, শরৎচন্দ্রের চরিত্রহীন। ওই বইখানা পড়েই আমার মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল।
কথাটা যেমন বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, তেমনই ওই ছেলেটাকে অস্তৃতভাষণকারী বলে ভাবতেও কষ্ট হচ্ছিল। কেন সে মিথা বলবে। বলে তার কি লাভ! কিন্তু বই? এটা বা কী করে হয়? সেদিন ওয়ার্ডে ফিরে এসেই মাস্টার মশাইকে বলেছিলাম সব কথা। আমার কথার শেষে একটা বড় বিস্ময় সূচক চিহ্ন ছিল–এটা কেমন করে হয়!
তখন ধীরে ধীরে বলেন তিনি–হয়, এমনটা হওয়া কোন আশ্চর্য নয়। শরৎচন্দ্র তো খুব জীবননিষ্ঠ কথাশিল্পী। উনি ওনার এই উপন্যাসে যে সব চরিত্র বা ঘটনার সমাহার ঘটিয়েছেন, তার সাথে ওই ছেলেটার জীবনের গভীর কোন মিল আছে। আমাদের মস্তিষ্কের যেখান থেকে ভাবনা চিন্তাগুলোর জন্ম নেয় সেখানকার তন্তুকোষগুলো খুবই সূক্ষ্ম। ছেলেটার মনমস্তিষ্কে বইয়ের ঘটনা এমনভাবে আঘাত করেছে যে মস্তিষ্ক সেই আঘাত সামলে নিতে পারেনি। যে কারণে ছেলেটা উন্মাদ হয়ে উঠেছে।
একটু পরে আবার বলেন তিনি, যারা বই পড়ে, কমবেশি সবাই পাগল।নকশাল ছেলেদের দ্যাখ। ওরাও তো এক একটা আস্ত পাগল। সব পাগল হয়ে গেছে মাওসেতুংয়ের বই পড়ে পড়ে। বিশাল এই দেশ, দেশের সরকারের কী বিশাল ক্ষমতা। কত পুলিশ কত মিলিটারি আর কত অস্ত্রশস্ত্র। রেডবুক পড়ে ওরা কটা হাতবোমা নিয়ে সেই রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে দিয়েছে। বদ্ধ পাগল ছাড়া আর কেউ পারে?
এখন ওনার গলার স্বর বড় নরম। তবে এই সব পাগলদের প্রতিই কিন্তু মানুষ শ্রদ্ধায় মাথা নত করে। নিজের জন্য তো সব মানুষ বাঁচে, পরের জন্য কে বাঁচে? কে মরে? ওরা মরছে।
.
আমাদের এই ওয়ার্ডের ইনচার্জ লোকটা খুবই নিষ্ঠুর প্রকৃতির। কারণে অকারণে সে মানুষের উপর অত্যাচার করে আনন্দ পায়। এখনও তার বিচার পর্ব শুরু হয়নি। শোনা যাচ্ছে তার বিরুদ্ধে যা সাক্ষী সাবুদ, সাজা না হয়ে কোন রেহাই নেই। তিনশো দুই বাই চৌত্রিশ ধারায় চার্জ। সাজা হলে, হয় কঁসি নয় যাবজ্জীবন। আমাদের এক সহবন্দী দু বেলা তাকে অভিশাপ দেয়–শালা মরুক। ফাঁসিই হোক ওর। আমার কেন জানিনা মনে হয় কঁসি হয়ে গেলে অল্পকষ্টে রেহাই হয়ে গেল। এর চেয়ে কষ্টকর সারাজীবন জেলখানায় পড়ে পচা। সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা ধারণা আছে যে যাবজ্জীবন মানে বুঝি চৌদ্দ বছর। তা কিন্তু নয়। যাবজ্জীবন মানে যতক্ষণ দেহে প্রাণ থাকবে। তবে কেউ কেউ চৌদ্দ বছরে ছাড়া পেয়ে যেতে পারে। তার পিছনে অনেকগুলো শর্ত কাজ করে। যে সেই শর্ত পূরণ করতে না পারে–সে সারাজীবনই জেলে কাটায়।
একদিন মাস্টার মশাইয়ের কাছে জানতে চাই–আইচ্ছা, ফাঁসি হওন ভালো না, যাবজ্জীবন? আপনে কী কন?
উনি বলেন–একেবারে মরে যাবার চেয়ে, যত কষ্টই হোক বেঁচে থাকা ভালো। বলা তো যায় না, বেঁচে থাকলে কোনদিন তার কাছে এমন একটা সুযোগ হয়ত এসে যাবে, সে এমন একটা কিছু করে ফেলবে যে মানুষ তার সব দোষ ক্ষমা করে দেবে। জয় বলবে তার নামে।
উনি শোয়া ছিলেন উঠে বসলেন–একটা গল্প বলি শোন। গল্পটা বিদেশের। এক বার কী হয়েছে জানিস, একজন সম্ভ্রান্ত লোকের বাড়িতে কি এক অনুষ্ঠানে সমাজের সব মাথা মাথা লোকেরা একত্র হয়েছে। ডাক্তার উকিল বিচারপতি কবি সাহিত্যিক সব ছিল। তখন এক সময় এই নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়ে গেল, ফাঁসি-মানে মৃত্যুদন্ড ভালো না যাবজ্জীবন। তা যা হয়, একদল বলছে মৃত্যুদন্ড, আর একদল যাবজ্জীবন। যারা যাবজ্জীবনের পক্ষে তাদের বক্তব্য হল–মরে গেলে সব শেষ কিন্তু যদি বেঁচে থাকে, সে যদি যাবজ্জীবন জেলও হয়, ওই সময়টা কাজে লাগাবার সুযোগ পেলে সে তার জীবন সার্থক করে ফেলতে পারে। গৃহকর্তী বেশ ধনবান লোক তিনি ছিলেন ফাঁসির পক্ষে। তার যুক্তি যাবজ্জীবন ফাঁসির চেয়ে কষ্টকর। তিনি বলে ওঠেন যে, বলা খুব সহজ, কিন্তু যাবজ্জীবনমোটামুটি যা কুড়ি বছর–এতবছর জেলে কাটানো সহজ নয়। যারা যাবজ্জীবনের
পক্ষে বলছে তাদের মধ্যে এমন কেউ কী আছে যে কুড়ি বছর বন্দী থাকতে পারে? যদি কেউ পারে আমি তাকে কুড়ি লক্ষ ডলার দেব। আছে কেউ এমন?
একজন তোক উঠে দাঁড়ায়–আমি আপনার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলাম। আমি কাটাব বন্দীদশায় কুড়ি বছর। বলেন গৃহস্বামী–একটা ঘরে আপনাকে একা রাখা হবে। কারও সাথে কথা বলা চলবে না। আমার একজন কর্মচারী আপনাকে খাবার দাবার দিয়ে আসবে। সময় কাটাবার জন্য যা যা দরকার একটা চিরকুটে লিখে দেবেন। আমি তা সংগ্রহ করে পাঠাব। ঠিক আছে? যদি কুড়ি বছর পূর্ণ হবার আগে ঘর থেকে বের হয়ে যান কিছু পাবেন না।
