একদিন হাসপাতাল থেকে দুধ আনতে গেছি। হাসপাতালের পাশে পাগলা গারদ, গিয়ে দাঁড়িয়েছি তার সামনে। এখানে দুরকম পাগল আছে। একদল যারা কোন অপরাধ করে জেলখানায় এসে শোকে দুঃখে অনুশোচনায় আতঙ্কে পাগল হয়ে গেছে, এবং তার কারণে সহবন্দীরা বিপন্ন হয়ে পড়েছে। আর একদল যারা কোন মানসিক কারণে উন্মাদ হয়ে কোন অন্যায় কাজ করে এখানে এসেছে। এই শেষদলের প্রতি জেল কিছু সদয়। সুস্থ হবার লক্ষণ দেখা গেলে এরা বেশ কিছুটা স্বাধীনতা পায়। গারদের বাইরে থাকতে পারে।
এই জেলের ঠিক মাঝখানে একটা বড় পুকুর আছে। যার পূর্ব প্রান্তে আমাদের ওয়ার্ড, পশ্চিমে হাসপাতাল। উত্তরে রন্ধনশালাদক্ষিণে সেল। সেলের বাদিকে পায়খানা ডানদিকে আমদানি ওয়ার্ড আর কেস টেবিল। কেস টেবিলকে ডানদিকে রেখে কিছুটা গেলে বাঁদিকে জেলখানার প্রধান ফটক। ঠিক তার উল্টো দিকে বড় মাঠ। আগে এই মাঠে বন্দীরা ফুটবল খেলতে পারত। একবার মাঠের পাশের দেওয়ালে মুই লাগিয়ে নকশাল বন্দীরা পালাবার ব্যর্থ প্রচেষ্টায় আট জন মারা যায়, যার অন্যতম পঞ্চাননতলার পরিতোষ ব্যানার্জী। তারপর থেকে খেলা বন্ধ আছে।
এখন আমার হাসপাতালের সামনের পুকুর ঘাটে চোখ গেলে দেখতে পাই সেখানে বসে কাপড়চোপড় কাঁচছে এক জন যুবক। খুব ফর্সা, বেশ লম্বা বছর পঁচিশ বয়সের সুদর্শনকান্তির যুবাকে দেখে মনে হল সুশিক্ষিত ও সচ্ছল পরিবারের সন্তান। কিন্তু এ এখানে কেন! প্রথমতঃ জেলখানার এই ক্রিমিনালদের ভিড়ে একে একদম মানাচ্ছে না। মুখ চোখ তার সে রকম নয়। তবু মেনে নেওয়া যেত, যদি সাত নাম্বার ওয়ার্ডে নকশালবন্দীদের সাথে থাকত। অথবা সেলের কোন কক্ষে। সেলে এই রকম বাংলা সিনেমার নায়কের মত একজন আছে। কিন্তু এ রয়েছে পাগলা গারদে। তার চেহারা আচার আচরণে কোন পাগলামোর চিহ্নমাত্র নেই। একেবারে সুস্থ। বিষয়টা জানবার জন্য আমি ভিতরে ভিতরে উগ্রীব হয়ে উঠি। এবং তার কাছে গিয়ে দাঁড়াই। কিন্তু বড় বিব্রত হই। কিভাবে তাকে জিজ্ঞাসা করি–এই যে ভাই তুমি কী পাগল? সেটা যে কখনই শোভন নয়। আমি পড়াশোনা জানি না সেটা ঠিক, তবে পড়াশোনা জানা লোকের সাথে তো মিশেছি। শিষ্টাচার বলে যে একটা কিছু আছে, সেটা তো জানি।
অনেক ভেবে শেষে বলি, এখানকার পরিবেশের সাথে আপনেরে মানায় না। আপনে জেলে ক্যান? কাপড় কাঁচা বন্ধ রেখে সে আমার দিকে ঘুরে তাকাল। বড় মায়াবী দুটো কালো চোখ। সে চোখের চাউনিতে লুকানো আছে একটা গভীর বেদনা। তারপর ক্লান্ত গলায় বলে আমার মা আমাকে ধরিয়ে দিয়েছে।
মা! মা ধরিয়ে দিয়েছে। আমি যেন হাজার ভোল্টেজের একটা বিদ্যুতের শক খেলাম। মা? মা ধরিয়ে দিয়েছে ছেলেকে। সারাদেশে জরুরি অবস্থা চলছে। জেলখানা এখন আর জেল নয়, যেন জল্লাদের উল্লাসভূমি। এই সময়ে একজন বন্দী আর একটা লাশের মধ্যে ব্যবধান মাত্র একটা ঘন্টার। যার নাম পাগলাঘন্টি। জেল গেটে ওই ঘন্টি বেজে ওঠার সাথে সাথে “পাঁচহাতিয়া” নিয়ে পাগলা ষাড়ের মতো ছুটে আসবে একদল কারারক্ষী। তারপর সজোরে সেই পাঁচ হাত লম্বা লাঠি চালাবে অসহায় বন্দীদের মাথা ঘাড় লক্ষ্য করে। মাথা ফেটে ঘিলু ছিটকে পড়বে। রক্তের ঢল নামবে। মানুষকে দলাদলা মাংসের তাল বানিয়ে নাচবে কসাই, ঘাতক খুনি বাহিনী।
এইভাবে, এই তো প্রায় সেদিন আট আটটা ছেলেকে পিটিয়ে মেরেছে এরা। এখন এক ভয়ানক দুঃসময়, অরাজক অন্ধকার সময়। পশ্চিমবঙ্গের বাহান্নটা জেলের কোনটায় কখন যে নকশালবন্দীদের শেষ করার জন্য সাইরেন ঘন্টি বেজে উঠবে তা কেউ জানে না। সে জানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের গোপন ফাইল। যখন পুলিশ গুলি চালাবে সেটা যে সঠিক টার্গেটে লাগবে, এমন কোন কথা নেই। যে কেউ মরতে পারে। এই সময়ে যদি কোন সন্তান জেলে থাকে তার মায়ের চোখ থেকে ঘুম উড়ে যাবে, দরদর করে নামবে দু গাল বেয়ে নোনা জলের ধারা। তখন সে যে কোন মুল্যে কামনা করে ছেলেটা আমার ঘরে ফিরে আসুক। আর এই যুবকের মা, নিজের সন্তানকে তুলে দিয়েছে কসাইদের হাতে। মরতে পাঠিয়েছে এই মৃত্যুপুরিতে। সে কী মা? মা, না রাক্ষসি? এক মুহূর্তে মনের মধ্যে হানা দেয় আমার এমন কিছু ভাবনা, যা মা, এই প্রিয় পবিত্র শব্দটার উপর সুবিচার করে না। ঘৃণা মিশ্রিত বিবমিষার উদ্রেক করে। কেন সেই মহিলা একে পাগল সাজিয়ে জেলে পাঠিয়ে দিয়েছে? নিঃসন্দেহে তার স্বভাব চরিত্র ভালো নয়। যার ছেলে এত রূপবান, তার মা রূপসী না হয়ে পারে না। নিশ্চয় তার রূপের আগুনে পুড়তে পঙ্গপাল আসে। সম্ভবতঃ ছেলে সেই পোড়াপুড়ির মাঝখানে একটা বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই সেই দুশ্চরিত্র মহিলা যোগসাজশ করে একে পাগল প্রতিপন্ন করে পাঠিয়ে দিয়েছে দূরে–বহুদুরে।
বেশ কিছু সময় আমি বাকরুদ্ধ হয়ে থাকি। শেষে বড় সংকোচ নিয়ে এক অভব্য প্রশ্ন করে ফেল-আপনার মা আপনাকে কেন জেলে পাঠাল আমার তো কিছুই মাথায় ঢুকছে না। আপনে কী করছেলেন?
বলে সে–আমি ঘরের কিছু দামি আসবাব ভেঙে চুরে ফেলেছিলাম।
–ক্যান। নিজের ঘরের জিনিস।
এতক্ষণে যুবক তার পাগলা গারদে থাকার আসল কারণ ব্যক্ত করে, আমার মাথাটা একটু খারাপ হয়ে গিয়েছিল।
আমি কোনদিন কোন নেতাকে নিজের মুখে স্বীকার করতে শুনিনি যে সে এক চোর, কোন ধর্মগুরুকে স্বীকার করতে শুনিনি—ঠগ জোচ্চোর। কোন মদখোরকে স্বীকার করাতে পারিনি–সে মাতাল। এরা বরং উল্টোটাই বলে। কিন্তু আজ এক পাগল নিজের মুখে বলছে–সে পাগল। এও আমি আগে কোনদিন শুনিনি।
