বলে যেতে থাকেন উনি–একজন বিপ্লবী, সে যদি বিপ্লবী না হতে পারত, তাহলে অবশ্যই ডাকাত হতো। তার ক্রোধ তাকে কিছুতে স্থির থাকতে দিত না। একজন কবি যদি কবি না হতে পারত হয় পাগল হয়ে পথে পথে ঘুরত আর না হয় মদ খেয়ে শুয়ে থাকত কোন শুড়িখানায়। একজন সৈনিক যদি সৈনিক না হতে পারত, একটা গুন্ডা খুনি হোত। কবির যন্ত্রণা সৃষ্টিশীলতার পথ না পেয়ে তাকে যেমন বিক্ষিপ্ত বা সুরাসক্ত করে দেয়, সেপাই তার শক্তিমত্তার প্রয়োগের জন্য বেছে নিত আইন বিরুদ্ধ সমাজ বিরুদ্ধ পথ। আমার বেলায় সেটাই হয়ে গেছে। প্রচুর পড়াশোনা করেছিলাম যে কারণে আমার মনে একটা গর্ব-অহংকার জন্মে গিয়েছিল, আমি বিদ্বান, কোন সাধারণ নই। বাবার কিছু জমি জায়গা ছিল যে কারণে খাওয়া দাওয়ার কোন সমস্যা ছিল না। বিদ্যার্জনের পথে কোন বাধা ছিল না। কিন্তু এই বিদ্যা দিয়ে আমি কী করব তার কোন পরিকল্পনাও ছিল না।
এক সময় বাবা মারা গেলেন। তখন ভাইয়েরা আলাদা হয়ে গেল। ভাগ হয়ে গেল জমি জায়গা। আমার ভাগে যেটুকু পড়েছিল তাতে তখন আর সংসার চলে না। নিজের জমিতে নিজে খাটতে পারলে চলত। কিন্তু খাটতে পারি না। অভ্যাস নেই যে। এরপর একটা পথ ছিল কারও কাছে মাস মাইনের কাজ করা। করেছিলাম কিছু দিন। দেখলাম কতগুলো মুখের হুকুম আমাকে মানতে হয়, তাদের মুখতাপূর্ণ কথায় মাথা নাড়তে হয়। এতে আত্মগ্লানি আসত আমার। তাই পরের কাজ আর করা হল না। কিন্তু কাজ না করলে চলবে কী করে?
আমাদের শাস্ত্রে বলে, মন্ত্রশক্তিতে পাহাড় টলে যায়, পাথর গলে যায়। মন্ত্র আসলে কী? কতগুলো কথা বই তো আর কিছু নয়। দেখলাম, আমার ভান্ডারে সেই কথা প্রচুর পড়ে আছে। ব্যাস, পা পিছলে গেল আমার। কঠিন শ্রমে আয়ত্ত করা বিদ্যা নিয়ে নেমে গেলাম অবিদ্যার পথে।
সব মানুষই নিজেকে চালাক ভাবে। পরিশ্রমের চাইতে কৌশলে আজ আদায় করে নিতে চায়। অন্য তো অন্য–ভগবানের সাথেও ছলচাতুরি করে। রেকাবিতে দুটো বাতাসা সাজিয়ে দিয়ে বলে–আমাকে কোটিপতি করে দাও ঠাকুর। ভাবে ঠাকুর খুব বোকা, বাতাসায় ভুলে যাবে। কিন্তু সে জানে না, ঠাকুর নয়, ঠকছে সে নিজে। তার দেওয়া বাতাসা হয় পিঁপড়ে নয় পূজারির পেটে যাচ্ছে।
আমি সেই পূজারির ভূমিকা নিলাম। কী চাই, মদের দোকানের লাইসেন্স? উপর মহলে চেনাজানা আছে। আমি এনে দেব। হংকং ছাপ মারা সোনার বিস্কুট আছে সস্তায় বেঁচব। জমানো টাকা আছে? আমাকে দাও–ডবল করে দেব। আমি এক সর্বশক্তিমান। মন্ত্রশক্তি আছে আমার। মানুষ বিশ্বাস করে, আমি পারি। আর আমি তাদের মনের আনন্দে শিকার করি।
কথা শেষ করে চোখ বুজলেন তিনি। আমি তখনও জেগে আছি। একজন বিখ্যাত দার্শনিক বলেছেন–জেলখানা হচ্ছে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়। আকাশ ছোঁয়া উঁচু দুর্ভেদ্য দেওয়ালের এপারেই নাকি আলিবাবার গুপ্তগুহার মতো সসাগরা জ্ঞান স্তূপাকার। এই রত্নভাণ্ডার একমাত্র সে-ই লুঠ করে নিয়ে যেতে সক্ষম–যার থাকবে রত্নাকর অভীপ্সা।
আমি ঠিক জানি না, আমার ভাগ্য আমাকে এই কঠিন দেওয়ালের এপারে নিয়ে আসার পিছনের গভীর গোপন উদ্দেশ্যটা কী! কী সে করাতে চাইছে আমাকে দিয়ে। কোন পথে এরপর ধাবিত হবে আমার অর্থহীন জীবন।
একদিন সকালে–সবদিনের মতো মাস্টার মশাই উঠে বসেছিলেন তার সারা ওয়ার্ডের মধ্যে প্রিয় এবং পছন্দের সেই জানালার উপর। চোখ মেলে রেখেছিলেন অল্প কিছু দূরের–গোপালনগরের দিক থেকে এসে চিড়িয়াখানার ওদিকে চলে যাওয়া বড় রাস্তাটার উপর। এই পথে এ সময়ে প্রচুর লোকজন গাড়ি চলাচল করছে।
জেলখানায় একদল লোক থাকে যাদের বাইরে কোন লোক নেই। অথবা থাকলেও এত গরিব যে গাড়ি ভাড়া যোগাড় করে মানুষটাকে দেখতে আসা, একটু চিড়ে গুড় দুটো বিড়ি কিনে দেওয়া সে সব পারে না। এখন ওই লোকটা কি করে? যা খাবার পায় পেট তো ভরে না। বিড়ির নেশার জন্য মন আনচান করে। জেল কর্তৃপক্ষ এই সব বন্দীর মধ্যে থেকে কিছু লোককে জেলের ভিতরে নানান কাজে লাগায়। যার জন্য ডবল খাবার আর কটা বিড়ি পায়। বিচারাধীন এ সব বন্দির জেলখানার নাম ফালতু। আমিও একদিন চলে গেলাম ফালতুর কাজে।
এই জেলের সেলে চারজন নকশাল বন্দি থাকে। যার একজন আমার পূর্ব পরিচিত। সেলের সামনের রাস্তা ধরে পায়খানায় যাবার সময়ে তাকে দেখি। কিন্তু কথা বলতে পারি না। সাধারণ বন্দিদের সেলের বন্দির সাথে কথা বলা বারণ। বারণ না মানলে সেল ডিউটির সেপাই ছুটে এসে পিঠে ডান্ডা মারবে।
আমি এক সাধারণ বন্দি। নকশালদের সাথে আমার কোন যোগাযোগ আছে পুলিশের কাছে তার কোন সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নেই। আমিও তা বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরতে পারিনি। রেড বুক পড়িনি, সি.পি.আই.এম.এল. এই কথাটার সম্পূর্ণ মানে জানি না, দেশব্রতী চোখে দেখিনি, আমি কি করে নকশাল হব। তাই আমার কেস ক্রিমিন্যাল কেস। ১৪৮/১৪৯/৩০৭, ৩/৫ ধারা।
আজ যখন সেলের জন্য একজন ফালতু কাজের লোকের দরকার আমি রাজি হয়ে গেলাম। আমার কাজ ওই সব বন্দির কুঁজোয় পানীয় জল ভরে আনা। হাসপাতালে গিয়ে তাদের ওষুধ, মেডিকেল ডায়েড এসব নিয়ে আসা। সকালে আর বিকালে দুবার চৌকায় গিয়ে তাদের জন্য চা বানিয়ে আনা। এর জন্য ডবল ভাত তরকারি আর আটটা বিড়ি পাবো। তার চেয়ে বড় কথা বন্ধুর সঙ্গ পাবো।
