তখন একদিন রাত্রিতে শুয়ে শুয়ে বলেন মাস্টার মশাই–জেলখানায় শুধু খাওয়া আর ঘুম ঘুম আর খাওয়া, এই করে করে কত যে মানুষের জীবন শেষ হয়ে গেল তার কোন হিসাব পাওয়া যাবে না। যদি সে একটু বুদ্ধি করে এই সময়টাকে কাজে লাগাতে পারত, জীবনের গতিপথটাই বদলে যেত। বলা যায় না, সে হয়ত অমরও হয়ে যেত।
–অমর? আমি অবাক হয়ে বলি।
–এটা একটা কথার কথা। জীব মাত্রেই মরণশীল। তবে এটাও ঠিক যে কোন কোন মানুষ। তার কাজের মধ্যে দিয়ে অমর হয়ে যায়। এবং এটা একমাত্র মানুষই পারে। আমার গুরুদেবের কী নাম জানিস?–সক্রেটিস। তারও শখ ছিল বুদ্ধিমানকে বোকা, পণ্ডিতকেমুখ বানানোর। পৃথিবীতে কেউ কোনদিন তার নাম ভুলবে না। তাহলে সে অমর হলো, কী, না?
কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর আমাকে জিজ্ঞাসা করেন তিনি–কীরে, ঘুমিয়ে পড়লি নাকি?
বলি আমি–ঘুম আসছে না।
উনি বলেন–হয়, এরকম হয়। এক আধ মাস ঘুম আসবে না। পরে দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে। মানুষ অভ্যাসের দাস। পুরানো অভ্যাস ভুলে নতুন অভ্যাস রপ্ত করতে একটু সময় নেবে। তবে হয়ে যাবে। আমারও প্রথম প্রথম কিছুদিন ও রকম হয়েছিল। আর এটা তো রপ্ত করে নিতেই হবে। পরিবেশের সাথে মানিয়ে না নিতে পারলে পাগলখানায় স্থান পাবে। এ ছাড়া অন্য কিছু উপায় নেই। তবে মানুষের বিশেষত্ব এটাই যে সে সব পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। পারে বলেই বেঁচে থাকে। মরুভূমিতে কী ভীষণ গরম, মেরু অঞ্চলেকী ভীষণ ঠান্ডা, মানুষ কোথায় নেই?
উনি কথা বলেন অদ্ভুত এক সম্মোহনী স্বরে। যা ধীরে ধীরে মনের উপর প্রভাব বিস্তার করে। মনের উপর আর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারি না, যেন অবশ হয়ে আসে। বুঝতে পারি এই স্বরক্ষেপণ, শব্দ জাদুতে মানুষকে ঘায়েল করে ফেলার ক্ষমতা আছে বলেই তারা শিকার হয়ে যায়।
একদিন আমি ওনাকে বলি–আপনে যে আমার লেহাপড়া শেখনের কথা কন, তয় এইখানে তা করতে হইলে যা যা লাগে হেই বই পত্তর, শেলেট পেনসিল কই পামু?
বলেন তিনি–ইচ্ছা থাকলে সব যোগাড় হয়ে যাবে। একটু সময় থেমে থেকে আবার বলেন তিনি–ভাব, খুব ভাল করে ভেবে সামনে আগাস! লোকে কিন্তু হাসবে, নানা রকম ঠাট্টা টিটকারি দেবে। যদি সে সব সয়ে ঘাড় গুঁজে নিজের কাজ করে যেতে পারিস, তাহলেই সফল হতে পারবি। আমাদের শাস্ত্রে কী বলে জানিস? যার মাঝপথে তপস্যা ভঙ্গ হয়, তার নরকবাস ঘটে। একে তো এতদিনের সব শ্রম ব্যর্থ গেল তার উপর লোকের উপহাস–এই তো নরক। সেই জন্য তপস্যায় বসার আগে মনঃস্থির করে নে। যদি শেষ পর্যন্ত যাবার মানসিকতা না থাকে শুরুই করিস না। মনঃ স্থির হলে বলিস, যা যা লাগে আমি এনে দেব।
ভাবি আমি, বেশ কয়েকদিন ধরে খুব ভাবি। শেষে একদিন জিজ্ঞাসা করি, আইচ্ছা আপনে আমারে পড়াশোনা শেখানোর লাইগ্যা এত ব্যাকুল ক্যান! এইতে আপনের কী লাভ?
উনি কী আমার কথায় মনে কোন আঘাত পেলেন? কিছুক্ষণ গম্ভীর হয়ে থেকে শেষে বলেন–তুই একটা ডিম। সেই জন্য। আমি কথাটার মানে বুঝতে পারিনি। সেই কারণে আবার বলেন–একটা ডিমে তা দিলে সেটা ফুটে বাচ্চা বের হয়। কেন বের হয়? কারণ ডিমের মধ্যে সেই উপাদান মজুদ আছে যা একটু তাপ পেলে প্রাণ হয়। যাতে সেই উপাদান নেই, যতই চেষ্টা করি-হবে না। আমি তো মানুষ চিনি। মানুষ নিয়েই যে আমার কারবার। সেদিন তুই তোর কথা আমাকে সব বলেছিস। লেখাপড়া না জানার জন্য তোর একটু দুঃখবোধ আছে সেটাও জেনেছি। তোর মুখচোখ দেখে মনে হচ্ছে, যদি তোর পিছনে একটু শ্রম দিই, সেটা ব্যর্থ যাবে না। এমনিতে আমারও তো সময় কাটে না এইভাবে সময়টাও কেটে যাবে। কথা থামিয়ে উনি কিছুক্ষণ হাঃ হাঃ করে হেসে নিয়ে কথা শেষ করলেন–বীজের মধ্য দিয়ে গাছ, পুত্রের মধ্য দিয়ে পিতা, শিষ্যের মধ্য দিয়ে গুরু বেঁচে থাকে। আমি তোর মধ্যে দিয়ে বেঁচে থাকব।
ওয়ার্ডের সবলোক গভীর নিদ্রায় ঢলে পড়েছে এ সময়। খানিকক্ষণ আগে যে শোরগোল ছিল, এখন আর তা নেই। যে ছেলেটা সব সময় বই পড়ে সেও এখন ঘুমে কাদা। জানালা দিয়ে পূর্ণিমার চাঁদের আলো এসে পড়েছে আমাদের ওয়ার্ডের মধ্যে। তবে সে শুভ্রতা খেয়ে নিচ্ছে জেলখানার বৈদ্যুতিক আলো। তখন আবার কথা বলে ওঠেন সেই ভুয়োদর্শী। কথা নয়, যেন আবেগ-আক্ষেপ–অতপর্ণ-দ্যাখ, পৃথিবীতে কোন মানুষই একেবারে নিখাদ হয় না। তার কিছুটা কালো কিছুটা আলো। আমি দেখেছি যার মধ্যে একশোটা ভালোগুণ আছে তার একটা এমন দোষ যা জঘন্য থেকে জঘন্য। আবার সবচেয়ে খারাপ লোকটার মধ্যে এমন একটা গুণ আছে যা তুই কোন মহানের মধ্যেও খুঁজে পাবি না। আমি জানি আমার বহু দোষ। কারও প্রতি আমি কোন সুবিচার করতে পারিনি। আমার স্ত্রী যে কারণে আমার সঙ্গে কোন সম্পর্ক রাখে না। ছেলে মেয়ে বাবা বলে আমার পরিচয় দেয় না। এতদিন তারা আমাকে একবার দেখতে পর্যন্ত আসেনি। কিন্তু আমারও কিছু ভালোগুণ ছিল রে। কী ছিল কাউকে দেখাতে পারলাম না। কত কিছু শিখেছিলাম, সে শিক্ষা কোন ভাল কাজে লাগাতে পারলাম না।
আবার সাময়িক নীরবতা। মাস্টার মশাই যেন ডুবে গেছে। একদিশেহারা কুটিল কৃষ্ণগহ্বরে। কোথাও কোন পাড়ের কিনারা পাচ্ছেন না। যে ভয়াল অন্ধকার ওনাকে পরিত্রাণহীন অতলবিতলে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু উনি কিছুই করতে পারছেন না। বড় দেরি করে ফেলেছেন যে। এখন আর ঘুরে দাঁড়াবার মত, ফিরে আসার মত হাতে খুব বেশি সময় নেই। হঠাৎ একটা ঝড় উঠল। কোথা থেকে কেমনভাবে যেন একটা শুকনো ডাল ভেঙে এসে পড়ল সামনে। উনি তাকে বিরাট অবলম্বন ভেবে দু হাতে চেপে ধরলেন। নিভু নিভু মনের আদিম সবুজতা দিয়ে সেই মরা ডালটাকে সতেজ প্রাণবন্ত করবার বাসনায় কেঁদে উঠলেন, তুই আমার মনের আশ্রয় হ। বেঁচে ওঠ আর বাঁচিয়ে রাখ।
