আমার এই মাস্টার মশাই, একজন শিক্ষিত মানুষ।রাজনীতি সমাজনীতি অর্থশাস্ত্র ধর্মসংস্কৃতি ক্রীড়া সর্ববিষয়ে ওনার অগাধ জ্ঞান। যে কোন মানুষের সঙ্গে দশ মিনিট কথা বলে তাকে বশীভূত করবার ক্ষমতা রাখেন। এটাই তাকে নিয়ে এসেছে জেলখানার গারদের মধ্যে।
খানিকক্ষণ পরে জেল গেটের পেটা ঘন্টায় ঢংঢং করে এগারটা শব্দ হল। এগারটা থেকে সাড়ে বারোটা এই দেড় ঘন্টা চান খাওয়ার জন্য বরাদ্দ। এই সময় টুকু এখন ওয়ার্ডের বাইরে থাকা যাবে।
আমাদের ওয়ার্ডের সামনে একটা উঠোন মতো জায়গা রেখে চারদিক লোহার রেলিং দিয়ে ঘেরা। এমন ঘেরা সব ওয়ার্ডে। এতে এক ওয়ার্ড থেকে আর এক ওয়ার্ডকে আলাদা করে রাখা গেছে। সেই রেলিংয়ের গেটের কাছে খাবার নিয়ে বসে আছে “চৌকা খাটুনির” লোক। যারা মেপে মেপে থালায় খাবার ঢেলে দেয়। কয়েদিরা লাইন দিয়ে খাবার নেয়।
এটা কোন নিমন্ত্রণ বাড়ি নয়–জেলখানা। খাদ্যদ্রব্যের অবস্থা বর্ণনা না করাই ভালো। আর তার পরিমাণ এত কম যে পেটের এক কোণাও ভরে না। কেউ কেউ তো খিদের জ্বালায় চৌকা থেকে ড্রেন বেয়ে গড়িয়ে যাওয়া ভাতের ফ্যান তুলে চুমুক মারে।
মাপের খাবার খেয়ে মাস্টার মশাইয়ের পিছন পিছন ওয়ার্ডে ফিরে আসি। লোহার দরজায় তালা পড়ে যায়। এ তালা আবার খোলা হবে বিকের চারটেয়। তখন আবার দু ঘন্টা বাইরের উঠোনে থাকা যাবে। এখন ওয়ার্ডে সবাই শুয়ে পড়েছে। আমিও ওনার পাশে শুয়ে পড়ে ঘুমোবার চেষ্টা করি। কিন্তু ঘুম আসে না। আমার শরীর সুস্থ নয়। পি.সি. খেটে এসেছি। চার রাত দু জন কনস্টেবল শরীরকে কাদার মত ছেনেছিল। পরের সাতদিন মেরেছে কম, ভয় দেখিয়েছে বেশি। ওরা কত কী যে আমার কাছে জানতে চাইছিল। সেই জিজ্ঞাসাবাদের প্রক্রিয়ার যন্ত্রণা এখনও আমার শরীরময় ছড়িয়ে আছে।
তখন শুয়ে শুয়ে মাস্টার মশাইয়ের সাথে গল্প করি। বলি–আমার সেই বাল্যকাল থেকে কী ভাবে বড় হয়েছি, সেই সব কথা। এও বলি আমার খুব লেখা পড়া শেখার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু পারিনি। আমার সব কথা গভীর মনোযোগ সহকারে শুনে বলেন তিনি–এখানে দু বেলা গরম খাবার পাবি। যেমন তুই বললি–সে রকম একেবারে না খেয়ে থাকতে হবে না। যদি অসুখ হয়, একেবারে বিনা চিকিৎসায় মরবি না। কম হোক বেশি হোক কিছু চিকিৎসা পাবি। মাথার উপর পাকা ছাদ আছে। তাহলে রোদে পুড়বি না জলেও ভিজবিনা। আর সব চেয়ে যেটা বড় কথা, যে আতঙ্ক নিয়ে বাইরে ছিলি, এখানে তা নেই। কোন শত্রু তোকে মারতে পারবে না। সব চিন্তা থেকে তুই মুক্ত। এখন তোর হাতে অখণ্ড অবসর। যত কমই হোক তিন-চার বছরের আগে বিচার শুরু হবে না। এই সময়টাকে কাজে লাগা।
–কী ভাবে?
–লেখাপড়া শেখ। ওদিকে দ্যাখ।
মাস্টার মশাইয়ের চোখের ইশারায় ওয়ার্ডের উত্তর কোণে তাকাই। অনেকক্ষণ আগে ওখানে যাকে চিৎশোয়া হয়ে বই পড়তে দেখেছিলাম, খেয়ে এসে সে আবার বই নিয়ে বসেছে। আবার বলেন তিনি–কঠিন কেসে পড়েছে। কেসে কী হবে সে চিন্তা নেই, পরীক্ষার পড়া পড়ছে। একে বলে ইচ্ছা শক্তি। এই রকম ডুবে যেতে পারলে মানুষ অসাধ্য সাধন করতে পারে।
নিজের নিরক্ষরতার জন্য একটা বিরাট কষ্ট আমার বুকে আছে এটা সত্যি। কিন্তু শেখার যে বয়স সে তো বহু পিছনে ফেলে এসেছি। তা ছাড়া এখনও বাইরে রেখে আসা প্রিয় পরিচিত মানুষের জন্য মন কাঁদছে। কিছুতে তাদের কথা ভুলে এই হৈচৈ করা ভিড়ের একজন হয়ে যেতে পারছি না। মনের মধ্যে বিধছে গোপন ব্যথার কাঁটা। রক্ত ঝড়ছে। এ সময়ে পড়াশোনা শেখার মত “মননশীল” বিষয়ে মন দেব কেমন করে?
আমার মুখমন্ডলে কী মনের কোন ছায়া পড়েছে? তা না হলে উনি আমার মনের কথা জেনে গেলেন কী ভাবে? বলেন তিনি–বাইরের কথা ভুলে যা। মনে কর তুই যখন একবার এসে গেছিস-এসেই গেছিস। আর কোথাও যাবার ব্যাপার নেই। যত তাড়াতাড়ি বাইরের কথা ভুলে যেতে পারবি, তোর পক্ষে মঙ্গল। তো এখানে যখন অনেক দিন থাকতেই হবে একটা ভাল কিছু শিখে নে। যা বাইরে গেলে উপকারে লাগবে।
ম্লান গলায় বলি–বয়স বেড়ে গেছে। এই বয়সে কী আর কিছু শেখা যায়।
–যায়! জোর দিয়ে বলেন তিনি, শেখবার কোন বয়স নেই। হিন্দিতে একটা কথা আছে, যব জাগা তবহি সবেরা। যখনই ঘুম ভাঙবে সেটাই সকাল। তুই ভাববি কেন তোর বয়স বেশি। মনে কর না, ছয় আট দশ। মনে করতে বাধা কোথায়?
দিন আসে দিন যায়। রাত আসে রাত যায়। মানুষের যত কষ্ট হোক, যত মনে হোক এদিন বুঝি আর কাটবে না, দিন তার নিজস্ব নিয়মে কেটেই যায়। ভোর পাঁচটায় আমাদের দিন শুরু হয় প্রথম গুনতি দিয়ে। জেল কর্তৃপক্ষ মিলিয়ে দেখে রাত্রির অন্ধকারে কেউ পালিয়ে গেছে কী না। এরপর আর একটা গুনতি হয় ছটায়। যারা ওয়ার্ডে আছে আর যারা ওয়ার্ড থেকে বিভিন্ন জায়গায় “লেবার” দিতে গেছে সব মিলিয়ে আগের গুনতির সাথে সঠিক সংখ্যার মিল হচ্ছে কী না। এই গুনতির পর আমরা ওয়ার্ড থেকে বাইরে আসবার সুযোগ পাই, পায়খানা, মুখহাত ধোবার জন্য। তখন টিফিন পাওয়া যায়। কোনদিন ছোলা, কোনদিন মটর সেদ্ধ। এক আধদিন চিড়ে গুড়। আটটা পর্যন্ত এসময়ে উঠোনে থাকা যায়। আবার একটা গুনতি হয় দুপুরের খাওয়ার পর। ফের বিকেল চারটেয়। চারটে থেকে সন্ধ্যা ছটা এই দু ঘন্টা বাইরে থেকে খাবার খেয়ে ওয়ার্ডে ঢুকতে হয়। এই ভাবে কম খানা জাদা গোনর মধ্যে দিয়ে বেশ কটা দিন কেটে যায়। এর মধ্যে একদিন কোর্টে গিয়ে সারাদিন কোর্ট লকআপে কাটিয়ে বিচারকের মুখ না দেখেই, জেলে ফিরে আসি।
