আমার তখন মনে হল, তার মুখে চোখে যেন আমার জন্য মাখামাখি হয়ে যাচ্ছে এক ধবল, দুগ্ধফেননিভ মাতৃমমত্ব। যা কোন হারিয়ে যাওয়া সন্তান বহুদিন পরে ঘরে ফিরে এলে মায়ের মুখে ফুটে ওঠে। আমি ঠিক জানি না, তখন আমি কী করেছিলাম আর কেন করেছিলাম। শুধু জানি আমি একটা ঘোরের মধ্যে ধীরে ধীরে চলে গিয়েছিলাম সেই মাতৃমূর্তির সামনে। মনে হচ্ছিল–উনি আমাকে ডাকছেন-আয় বাছা, কাছে আয় আমার। সে সময়ে সেখানে আর কেউ ছিল না। আমি আর আমার মা। তখন খুব সন্তর্পণে মায়ের পীনোন্নত স্তনে রেখেছিলাম আমার তৃষ্ণার্ত দুটো ঠোঁট। আর আকণ্ঠ পীযূষ পানে যেন শীতল করেছিলাম দগ্ধ জীবন। একটি শিশুমন এভাবেই সেদিন বিদ্যারদেবীকে বরণ করেছিল মাতৃপদে, জানিয়েছিল তার ভালোবাসা।
কিন্তু সেই মাটির মূর্তিতে আমার হৃদয়াবেগ প্রাণপ্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। মাটির মা মাটি হয়ে রয়ে গেছে। তাই তার আশীর্বাদ আমার ভাগ্যে জোটেনি। আমি আজও নিরক্ষর।
.
সেই প্রাজ্ঞ পুরুষ জানালার উপর থেকে এখন নিচে নেমে আসেন। তার নিজের পাশে কম্বল পেতে আমার জন্য জায়গা রাখেন। তখন আমি তাকে জিজ্ঞাসা করি, আপনার কী কে?
হাসলেন তিনি–আমি শিকার করি।
বন্যপ্রাণী সংরক্ষন আইনে শিকার করা দণ্ডনীয় অপরাধ। এটা আমার জানা। তবে অনেক চোরা শিকারি বাঘ হরিণ গণ্ডার মেরে তার চামড়া বিক্রি করে। বলি–এখন পর্যন্ত কয়টা বাঘ মারছেন?
–আমি পশু পাখি মারি না। মানুষ মারি। শিকারি বলেই ওনাকে বিশ্বাস করা শক্ত। এখন আবার বলছে মানুষ মারে। লোকটার চেহারা মোটেই খুনির মতো নয়। অবিকল একজন দরদি শিক্ষকের মতো।
একটু হেসে আবার বলেন তিনি-আমার দুটো শখ। একটা হচ্ছে দাবা খেলা। আর একটা শিকার। দুটোই বুদ্ধির খেলা। খুব মগজ খাটাতে লাগে বলে আমার খুব প্রিয়। দাবায় যেমন প্রতিপক্ষ ভালো খেলোয়াড় হলে খেলে খুব মজা পাওয়া যায়, মানুষ শিকারের সময় যে মানুষ খুব চালাক-অন্যকে শিকার করে বেড়ায় তাকে শিকার করে খুব আনন্দ পাই।
এক মুহূর্ত থেমে কী যেন ভেবে আবার বলেন তিনি–আনন্দ, এই কথাটা কে বলেছে জানিস? গৌতম বুদ্ধ। ইহকাল পরকাল, পরজন্ম পূর্বজন্ম স্বর্গ নরক বলেনি। সুখ, ভোগ, বিলাস বলেনি। বলেছে আনন্দের কথা। অমৃতের পরশে অমরত্ব প্রাপ্তি হয়। যাহা আনন্দ তাহাই অমৃত। আনন্দের মধ্যে মানুষের জন্ম। সেই জন্য মানুষকে বলে অমৃতের সন্তান। আনন্দ জিনিসটা কী? মনের একটা অবস্থা এই তো? সেই অবস্থা বিভিন্ন মানুষের ক্ষেত্রে বিভিন্ন রকম। কারও ব্রহ্মচর্যে আনন্দ কারও বহু গমনে। কারও গ্রহণে আনন্দ কারও বর্জনে। গৌতম বুদ্ধ আনন্দের সন্ধানে রাজত্ব ছেড়ে দিয়ে বৃক্ষের তলে আশ্রয় নিয়েছিলেন। আলেকজান্ডার রাজ্যের পর রাজ্য জয় করেছে ওই আনন্দেরই জন্য। সেই রকম আমার আনন্দ চালাক চতুর লোককে বোকা বানানোয়।
যে ওয়ার্ডে আমাদের রাখা হয়েছে সেখানে আরও সত্তর আশিজন লোক আছে। তবে ওনার মত বয়স্ক আর কেউ নেই। সব পঁচিশ তিরিশ। তারা বড় গোলমাল করছে। কাউকে দেখে এখন বোঝবার উপায় নেই যে জেল খাটছে। সে দুঃখ বেদনা চেপে রাখার চেষ্টায় তারা তাস নিয়ে খেলতে বসে গেছে। কেউ লুডো কেউ ষোলগুটি নিয়ে সময় কাটাবার খেলায় চেঁচাচ্ছে। অনাবশ্যক পায়চারি করছে দু চার জন। এই হৈ চৈয়ের মধ্যে ওয়ার্ডের এক কোণে এক “নকশাল বন্দি” বইয়ের পাতায় চোখ রেখে স্থির। মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতি চলছে।
প্রাজ্ঞ পুরুষ তখন চিৎ হয়ে শুয়ে পড়েছেন। চোখ দুটো ছাঁদের কড়িবরগায় নিবদ্ধ। মন যেন চলে গেছে এই ঘর এই পরিবেশ, লোহার দরজা, কড়া পাহারা, উঁচু দেওয়াল সব কিছু ছাড়িয়ে মহাকাশের কোন নাম না জানা গ্রন্থে। যেখানে আলো নেই অন্ধকার নেই জল নেই তৃষ্ণা নেই, জীবন নেই মৃত্যু নেই। বহু সময় সেই মহাকাশ ভ্রমণের পর আবার তিনি মাটিতে নেমে এলেন। আমাকে দেখলেন। কেন কে জানে একটা হাত আমার পিঠে রাখলেন। তারপর সিদ্ধান্তমূলক অন্তর্মুখী স্বরে বলেন–কোন কিছু অধিক হওয়ার ফল কখনও ভালো হয় না। অধিক ধন অধিক ক্ষমতা অধিক জ্ঞান-হ্যাঁ জ্ঞানও, অধিক জ্ঞানও মানুষকে বিপথে চালিত করতে পারে। পৃথিবীর দুঃখের কারণ কোন মুখ নয়, জ্ঞানীরাই।
বোধহয় একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন তিনি–আমার বেলা এটাই হয়েছে। যা জ্ঞান অর্জন করেছিলাম তাদিয়ে অনায়াসে সমাজে একটা উঁচু স্থান পেয়ে যেতে পারতাম। কী থেকে যে কী হয়ে গেল। উনি চিৎ থেকে আমার দিকে কাত হলেন তারপর যেন গলায় নির্বেদসন্তাপ ভরে বললেন–চারশো বিশধারায় কেস আমার।
জেলখানায় সবচেয়ে সম্মানীয় কেস তিনশো দুই। সবাই তাকে সমীহ করে চলে। এখন অবশ্য মার্ডার কেসের আসামির আর আগের মতো সম্মান নেই। তাদের তুচ্ছ করে দিয়েছে রাজবন্দিরা। বিশেষ করে নকশাল বন্দিরা। আর সবচেয়ে অসম্মানজনক কেস রেপ। কয়েদিরা বলে–চামড়া চুরি। এই কেসের আসামিকে সবাই ঘৃণা করে। চিটিংবাজি কেসটা রয়েছে এই দুয়ের মাঝে। বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে তার সাথে বেইমানি করা এটাকে কেউ সুনজরে দেখে না। তবে লোকটা যে খুব বুদ্ধিধর সেটা সবাই মানে অনেকে এমনও বলে মার্ডার মাথা মোটা লোকের কাজ। কিন্তু চিটিং করতে হলে চিকন বুদ্ধি লাগে।
