ভয়ে ভয়ে জানতে চাই–তাহলে কী আমার দশ বচ্ছরের আগে ছাড়ান পাওনের কোন উপায় নেই?
সেটা এখনই বলা যাবে না। বলেন তিনি–পুলিশ কীভাবে কেসটা সাজায়, কিকী সাক্ষ্যপ্রমাণ তাদের কাছে আছে, সাক্ষীরা ক জন আসে আর না আসে, কি বলে আর কী না বলে, মেজিস্ট্রেটের মুড কেমন থাকে, অনেক ব্যাপার আছে।
বলি–তা আমার বিচার হবে কবে? কবে জানতে পারমু আমার কপালে কতখানি দুর্ভোগ লেখা আছে?
সেও এখন বলা মুশকিল। কোর্টে হাজার হাজার কেস জমে আছে। যেটা নিয়ে নাড়াচাড়া পড়ে সেটা উপরে ওঠে। যেটা নিয়ে নাড়াচাড়া না পড়ে–ফাইল চাপা পড়ে থাকে নিচে। চার পাঁচ বছর ধরে বিনা বিচারে কত লোক পড়ে আছে তার কোন ঠিক নেই। আমারই তো দু বছর।
একটু পরে আবার বলেন তিনি–যা তোর কেস, যদি পুলিশ কেসটা নিয়ে খাটে উপরে দশ নিচে পাঁচ-এর মধ্যে সাজা হতে পারে। তার মধ্য থেকে যতদিন বিনা বিচারে জেলে থাকবি সেটা বাদ চলে যাবে। আর বাকি বছর কটা–বছর হবে নয় মাসে। চোখ বুজে পড়ে থাক। ঠিক কেটে যাবে।
পুলিশ কাস্টডি থেকে জেল কাস্টডিতে এসেছি এখনও চব্বিশ ঘন্টা হয়নি। এখন এক এক ঘন্টাকে মনে হচ্ছে একশো বছরের মত দীর্ঘ আর কষ্টকর। বুকটা ব্যথায় দুমড়ে মুচড়ে আসছে। চোখ থেকে নামছে অকাল বর্ষণ। আশেপাশে আপনজন কেউ নেই। আমি একা, একেবারে একা। এই অবস্থায় পাঁচ সাত বছর একা কী করে কাটাব। এ আমি পারব না। নির্ঘাত মরে যাব। আত্মীয় স্বজন কারও সাথে আর কোনদিন দেখা সাক্ষাৎ হবে না। আর এ জীবনে পা রাখা সম্ভব হবে না মুক্ত মানুষের দুনিয়ায়।
আমার চোখ থেকে জল গড়াতে দেখে বলেন তিনি, কাঁদছিস কেন?
–আমি আর বাঁচব না।
মুখটা বেঁকে গেল তার, বিদ্রূপ, বাঁচবি না তো কী করবি? এখানে যে আত্মহত্যা করবি সে সুযোগও পাবি না। সেলেবন্ধ কঁসির আসামিদের দেখেছিস? বছর বছর পড়ে আছে। সব সময় প্রাণে ভয় আজ মরি না কাল মরি। ওরা আত্মহত্যা করার সুযোগ খোঁজে। রোজ তিলে তিলে মরবার চেয়ে আগেভাগে নিষ্কৃতি নিয়ে নিতে চায়। পারে? এখানে মরাটাও তোর হাতে নেই। ও সব বাজে ভাবনা ছেড়ে দিয়ে ভাব, কী করে এই অবস্থার মধ্যেও ভালোভাবে বাঁচা যায়।
উনি একমনে কিছুক্ষ বিড়ি টেনে শেষে আবার বলেন–আঁম কাছে এদিকে সরে আয়। তোকে একটা জিনিস দেখাই। ওনার ডাকে সরে গেলাম জানালার কাছে। জানালা দিয়ে দখিনা বাতাস আসছে। ভেসে আসছে পথে চলা মোটরকারের হর্নের আওয়াজ। দেখা যাচ্ছে রাস্তার ওপারে কতগুলো বড় বড় গাছ, কটা বড় বড় দালান। বলেন উনি, ওদিকে দ্যাখ তো কিছু চোখে পড়ে কীনা। আমি জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকাই। কিন্তু কিছু চোখে পড়ে না।
কিছু দেখতে পাচ্ছিস? ভালো করে ন্যাশন্যাল লাইব্রেরির কার্নিশটা দ্যাখ। দেখতে পাচ্ছিস একটা ছোট্ট বটের চারা। এবার বল দেখি, ওখানে এই বটের চারাটা বেঁচে আছেকী করে? সিমেন্টের নিরেট কার্নিশ, ওখানে রস কোথায়? রসদ কোথায়?
আমি কোন জবাব দিতে পারছি না দেখে জবাব উনিই দেন–ওখানেও রস-রসদ আছে, চারাটার বেঁচে থাকাটাই এ কথার বড় প্রমাণ। তা না হলেও তো মরে যেত। আপাতঃদৃষ্টিতে যা নীরস কঠিন কঠোর ও সেখানে রস পেল কী করে? পেয়েছে, কারণ, সে খুঁজেছে। খুঁজেছে, কারণ সে বেঁচে থাকতে চায়। তাহলে এটা এখন প্রতিষ্ঠিত সত্য–যে খোঁজে সে পায়, যে খোঁজে না সে পায় না।
ওনার চোখ দুটো এখন প্রাজ্ঞ ঋষির মত অর্ধ নিমীলিত। যেন কোন আত্মজ্ঞানের অতল গভীরে ডুবে বসে আছেন। খোঁজ, খুঁজে দ্যাখ এখানেও আনন্দের উপাদান, রস রসদের ক্ষেত্রবসুধা আছে। না হলে মানুষ এখানে বহু বছর ধরে বেঁচে থাকে কী করে? খুঁজতে থাক, খুঁজলে ঠিক পেয়ে যাবি। এবং এখন তোর সেটাই একমাত্র কাজ। এখানে কেঁদে কোন লাভ হবে না। যতই কাদিস আর মাথা খুড়িস তোকে ছেড়ে দেবে না। যা তাদের করার তা করবেই। যেদিন থেকে জেলগারদের সৃষ্টি হয়েছে লক্ষ লক্ষ লোক এখানে এসেছে। যারা কেঁদেছে, কেঁদে কেঁদে শেষ হয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত টিকেছিল তারা, যারা কান্না দমন করতে পেরেছিল। আর যারা হাসতে পেরেছিল তারা ইতিহাস হয়ে গেছে।
মুগ্ধচোখে আমি ওনার দিকে তাকাই। কথা শুনে বুঝতে পারি উনি বিদ্বান মানুষ। বিদ্বান এই শব্দের সাথে বিদ্যাভবন পুঁথিপুস্তকের একটা নিবিড় সংযোগ। আমি এখান থেকে বড় রাস্তার ওপারে বিশ্বের এক বৃহত্তম বাচনালয়-ন্যাশন্যাল লাইব্রেরিটা দেখতে পাচ্ছি। শুনেছি, এই পাঠ্যকেন্দ্রে জ্ঞান তপস্বী মানুষেরা পুঁথির পাতায় নিমগ্ন থেকে আহরণ করে নিয়ে যেতে পারে সেই মহাজ্ঞান, যা দিয়ে জীবন ধন্য সার্থক আর পূর্ণ হয়। তবে সে দিয়ে আমার কোন লাভ হবার নয়। আমি কোনদিন ওখানে প্রবেশ পাব না। আমি যে অক্ষরজ্ঞানহীন। ওপার আমার জন্য নয়। আমি এপারের জীব। জেলখানার বাসিন্দা। যে বয়সে বাচ্চারা পাঠশালায় গিয়ে বাল্যশিক্ষা মুখস্থ করে, জীবন আমাকে নিয়ে গেছে গরু ছাগল চড়াতে। বড় সাধ ছিল পড়াশোনা শিখে আমি বড় মানুষ হব। সে সাধ পূরণ হয়নি। আর কোনদিন হবারও নয়।
একদিন সন্ধ্যায়, যখন সূর্য ডুবে গিয়ে চারদিকে নেমেছিল এক বিষণ্ণ আবছায়া আমি একা আমাদের তাবুতে ফিরে আসছিলাম। আর তখন বন্ধ হয়ে যাওয়া, পথের পাশের প্রাথমিক স্কুলটার কাছে এসে কেন কে জানে পাদুটো ভারী হয়ে গিয়েছিল আমার। মনের মধ্যে কে যেন বড় হাহাকার করে কেঁদে উঠেছিল। সে কান্না কী এমন অনাদরে ফেলে চলে যাওয়া বিদ্যাভবনের জন্য। নাকি আমার বিদ্যাবঞ্চিত ব্যর্থ জীবনটার জন্য, তা আমি জানি না। কী এক অমোঘ আকর্ষণ যেন আমাকে টেনে নিয়ে গেল সেই স্কুলবাড়িটার মধ্যে। উপরে টিনের চালা, নিচে সিমেন্টের মেঝে, ঘর মাত্র দুখানা। যে ঘরের মেঝের উপর এখন ধুলোর পুরু আস্তরণ। কোণে কোণে মাটি লেপা বেড়ার এখানে সেখানে মাকড়সার জাল। আমি তখন সেই ধুলো মাকড়সার জাল আর স্কুলের মধ্যে অন্ধকার ঘরের এককোণে বসা দেখলাম তাকে একা–যার আশীর্বাদে মহামুখ কালিদাস এক মহাপণ্ডিত হয়েছিল। যে গল্প আমাকে বলেছেন আমার বাবা। সেই বিদ্যার দেবীমাতা, হংসবাহিনী সরস্বতাঁকে।
