আমি আজো সঠিক ভাবে জানি না বিপিন পাল রোড়টা কোথায়। তবে এটা জানি যে বিপিন পাল একজন বিরাট বড় নেতা ছিলেন। লালা লাজপত রায়, বাল গঙ্গাধর তিলক আর এই বিপিন পাল–এরা সেই ইংরেজ শাসকদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল। যে কারণে তখন তিনটে নাম এইভাবে বলা হোত লাল বাল পাল। তো পুলিশ আমাকে সেই মহান নেতার নামাঙ্কিত বিপিন পাল রোডের মারপিট অর্থাৎ তিনশো সাত ধারায় একটা কেস দিয়েছিল। সাথে একটা উপধারা ছিল তিন বাই পাঁচ। এই শেষ উপধারাটা যদি থ্রি প্লাস ফাইভ না হয়ে টুয়েন্টি ফাইভ বাই টুয়েন্টি ফাইভ দিত-মিসা হয়ে যেত। তখন মিসা হয়নি বলে যতটা খুশি হয়ে ছিলাম এখন ততোটা কষ্ট পাচ্ছি। যারা সে সময় মিসা খেটেছিল সব এখন পেনশন পাচ্ছে। তিন বছরের ত্যাগ বাকি জীবনটা সুখি করে দিয়েছে। তবু পুলিশ বিভাগের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ যে তারা আমাকে জেলে পাঠিয়ে ছিল বলে এই জীবনী লিখতে পারছি। যদি ওই ছোট ধারাটা লাগিয়ে দিত, সারা জীবনের আমার চাল ডালের সমস্যাটা মিটে যেত, বড়ো ভালো হত। আরো অনেক বেশি কৃতজ্ঞ হতে পারতাম।
জীবন আমাকে অনেকবার অনেক পরীক্ষায় ফেলেছে, নিয়ে গেছে অনেক অচেনা অজানা জায়গায়। জল জঙ্গল পাহাড়। যে কারণে অকাঁদেমি পুরস্কার বিজেতা হিন্দি সাহিত্যিক অলকা সারাওগীবলেছেন–এক জীবনের মধ্যে দশটা জীবন। সেই দশ জীবনের এক জীবন এই জেলখানার জীবন। আমি যেদিন জেলে এলাম তারই অল্প কয়েকদিন পরে সারা দেশে ঘোষণা করা হল অভ্যন্তরীণ জরুরী অবস্থা। বাথরুমের মধ্যে মানুষ উদোম উলঙ্গ হয়। কেন তা পারে? কারণ তার চারিদিকে দেওয়াল থাকে। কেউ কিছু দেখতে পায় না।
জেলখানার চারিদিকেও নিচ্ছিদ্র দুর্ভেদ্য কঠিন দেওয়াল। ফলে সেই দেওয়ালের আড়ালে জরুরি অবস্থার যে নগ্ন নির্লজ্জ পৈশাচিকতার আত্মপ্রকাশ ঘটবে এতে আর আশ্চর্য কী? তাই তখনকার জেলখানার পরিবেশ মোটেই সংশোধনাগার ছিল না। ছিল পিশাচদের ক্রুর বিভৎস বধ্যভূমি।
কেউ কেউ বলে থাকেন জেলখানা নাকি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে জীবনের যে পাঠ মেলে সে নাকি আর কোথাও পাওয়া যায় না। কী কারণে তারা একথা বলে থাকেন সে আমার জানবার কথা নয়। তবে আমার পক্ষে একথা বলা মোটেই অসমীচীন হবে না যে, সেই বধ্যভূমি সেদিন অধ্যয়নের পক্ষে মোটেই অনুকূল স্থান ছিল না।
পি.সি খেটে, গাটে গাটে থার্ড ডিগ্রির বিষ বেদনা নিয়ে প্রথম যেদিন জেলখানায় এসেছিলাম, দোতলার জানলা দিয়ে যে আকাশটুকু দেখা যায় সেদিকে তাকিয়ে খুব কাঁদছিলাম। চোখের জলে বুক ভেসে যাচ্ছিল আমার। হতে পারে, বিবাহের পরে পিত্রালয় ছেড়ে চিরদিনের মতো চলে যাবার সময়ে বহু মেয়ে কাঁদে না। কিন্তু মুক্ত মানুষের বাসভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জেলখানায় এসে না কাঁদে এমন শক্ত মনের মানুষ খুব একটা পাওয়া যায় না। জেলখানা তো কোন মনোরম ভ্রমণের স্থান নয়। এটা যেন হিংস্র শ্বাপদ সংকুল কোন দ্বীপ। কে যে কখন ঘাড়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে কোন ঠিক নেই। ফলে বুক তো ধরফর করবেই। চোখে তো জল আসবেই।
আমি কাঁদছিলাম গোপনে–নিঃশব্দে। কোর্ট লকআপে বসেই শুনে এসেছি জেলখানায় জোরে জোরে কাঁদলে, তা যারা বছরের পর বছর আত্মীয় স্বজন থেকে বহুদুরের এক জগতে, অসহনীয় অবস্থায় দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে তাদের চেপে রাখা মনঃকষ্টউথলে ওঠে। আত্ম পরিজনের জন্য তাদেরও কান্না পায়। চোখের জল বড় সংক্রামক যে। ফলে তারা রেগে গিয়ে আমাকে মারধর করা শুরু করে দিতে পারে।
আমি যে ঘনঘন চোখ মুছছি সেটা একজন মানুষের নজর এড়ায়নি। পঞ্চাশ পঞ্চান্ন বছরের মত বয়সী মানুষটা আমাদের এই দোতলা ওয়ার্ডের দক্ষিণ দিকের বড় জানালার উপর উঠে বসে দূরের বড় রাস্তা, বাস ট্যাক্সি, লোকজনের চলাচল, দেখছিলেন। মুখময় খোঁচা খোঁচা দাড়ি, কিছুটা রোগা, গ্রামবাংলার কোন পাঠশালার গরিব মাস্টারের মত চেহারার সেই লোকটা আমাকে কাছে ডাকলেন–এই ছেলে এদিকে আয়। আমি কাছে গেলে জানতে চাইলেন–কী কেস?
বলি–পুলিশেরা কইছে, আমার দশ বছর থাকা লাগবে। সেই কেস!
–দশ বছর! ধারা কত?
–সে তো আমি কইতে পারি না।
–হিস্ট্রি টিকিটে তো লেখা আছে। পড়।
–আমি তো লেখাপড়া জানিনা।
উনি একচোখে দুর্বাসা ক্রোধ আর এক চোখে বুদ্ধের দয়া দিয়ে আমাকে দেখলেন। তারপর হাত বাড়ালেন আমার দিকে–টিকিটটা দে, দেখি।
এই কিছুক্ষণ আগে আমাকে রেশন কার্ডের মত একখানা মোটা কাগজ দেওয়া হয়েছে ’কেস টেবিল’ থেকে। এর নাম হিস্ট্রি টিকিট। এতে বন্দীর নাম ঠিকানা বয়স উচ্চতা ওজন, শনাক্ত করনের জন্য শরীরের একটা বিশেষ চিহ্ন, কী কেসে ধরা হয়েছে তার ধারা, পরবর্তী কোর্টে যাবার দিন, সব লেখা আছে। সেটা আমার হাতে ধরা ছিল। আর ছিল সদ্য পাওয়া একটা থালা, একখানা কম্বল। কার্ডখানা ওনার দিকে এগিয়ে দেই। উনি সেটা দেখে হুম করে একটু শব্দ ছেড়ে বলেন–বাইরে কে কে আছে?
বাইরে আমার সব আছে। কিন্তু তারা থেকেও না থাকারই মত। তাই বলি–কেউ নাই।
–একেবারে একা।
–একেবারে একা।
চিন্তিত দেখায় ওনার মুখ, তাহলে উকিল দেওয়া, জামিন নেওয়া, কেস লড়া এসব কে করবে?
–ত্যামোন তো আমার কেউ নাই।
কিছুক্ষণ গুম মেরে থেকে ফের বলেন তিনি–তাহলে তো খুবই মুশকিল। পুলিশ এক তরফা কেস সাজাবে। তোর হয়ে যদি কেউ ডিফেন্স না করে–সমস্যা আছে। ওনার গায়ে একটা খাদির পাঞ্জাবি। তার পকেট থেকে একটা বিড়ি বের করে একজনের কাছ থেকে আগুন চেয়ে সেটা জ্বালিয়ে দুটান মেরে আবার বলেন–ক্রিমিনাল কেস জিনিসটা কী রকম জানিস? যেমন ধর রাজমিস্ত্রির কাজ। ধর তোর হাত পা বেধে মাঝখানে বসিয়ে রেখে মিস্তিরি চারপাশে দেওয়াল তুলছে। তখন তোর তো কিছু করার ক্ষমতা নেই। তখন তোর পক্ষ নিয়ে একজন লোক এগিয়ে এল। এক ধাক্কা দিয়ে দেওয়ালটা ফেলে দিল। তুই বেঁচে গেলি। সরকারি যে উকিল সে হল মিস্ত্রি আর পুলিশ হল তার যোগাড়ে। আর ধাক্কা মারা লোকটা হল তোর উকিল। তা তুই যদি সেই উকিলই না দিতে পারিস তো!
