একদিন দেখলাম আমি হাঁটতে হাঁটতে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেছি সেই কালো কুঠুরিতে।
এই সময় অর্থাৎনরেশ ঠাকুরের বাসা থেকে বের হয়ে জেলখানায় পৌঁছানো পর্যন্তকিছুদিনের কথা আমি ইচ্ছা করেই বলা থেকে বিরত থাকছি। সে এত রক্তপাত আর ভয়ংকরতা পূর্ণ তা লিখতে যেমন ভালো লাগছে না হয়ত পড়তেও কারও ভালো লাগবে না। তাই…।
বারুইপুর স্টেশনকে পিছনে ফেলে বাদিকের বাস চলা রাস্তা ধরে মাইল সাত আট আর চম্পাহাটি রেল স্টেশন পিছনে ফেলে বারুইপুরের দিকে মাইল চারেক হাটলে পাওয়া যাবে একটা নোনাজলের খাল। এই খালপাড়ের পথ ধরে মাইল তিনেক হেঁটে এলে যে গ্রাম এখানেই পাগলা সরদারের বাড়ি। হাতে কিছু টাকা এসে যাওয়ায় আশি টাকার এক কাহন খড়, চল্লিশ টাকায় আটখানা বাঁশ, দড়িদড়া পেরেক আরো গোটা কুড়ি টাকা, তিরিশ টাকার মতো মিস্ত্রি মজুরে ব্যয় করে এই খাল পারে একখানা ঝুপড়ি বানিয়েছি আমি। এই ঘরের কোন দরজা নেই। দরজার সামনে একটা বস্তা কেটে ঝুলিয়ে রাখদমজরুজাতে তাদের দরকার যাদের ঘরে দামি কোন মালপত্র থাকে। এই ঘরে এমন কিছু নেই যা চোরের পছন্দ হবে। একটা খেজুর পাতার ছেঁড়া মাদুর, মাটির একটা কলসি একটা কালো বেড়ানো ভাতের হাড়ি, একটা ভাঙা কড়াই, দুটো এ্যালমুনিয়ামের থালা।
তবে এই ঘরে একজন মানুষ থাকে। সে বর্তমান শাসক সম্প্রদায়ের কাছে খুবই মূল্যবান এক জীব। সে কী নিজে কোনদিন জানতো যে তার মতো একজন তুচ্ছ মানুষ এই দেশকালের কাছে এত দামি হয়ে উঠবে? যে, তাকে নিয়ে যাবার জন্য খোদ লালবাজার থেকে একজন উচ্চ শিক্ষিত উচ্চ বেতনে চাকুরিরত অফিসার, রাতের ঘুম নষ্ট করে জনা পনেরো কুড়ি অস্ত্র সজ্জিত পুলিশ নিয়ে বৃষ্টি ভেজা পথে পেছল খেতে খেতে সূর্য ওঠার ঢের আগে এখানে পৌঁছে যাবে।
কিছুক্ষণ আগে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল তার। তখন দুরের পথটার দিকে একবার তাকালে দেখে নিতে পারত বাস রাস্তায় ভ্যান রেখে হেঁটে আসা দলটাকে। ভোরের আধো আলোয় খাল পার হয়ে ও পারের জঙ্গলের মধ্যে গিয়ে লুকিয়ে পড়লে খুঁজে পাওয়া মুশকিল হতো।কিন্তু ভাগ্য খারাপ, ওদিকটায় চোখ যায়নি। প্রস্রাব করে ঘরে ঢুকে ছেঁড়া মাদুরে শুয়ে আর একটু ঘুমিয়ে নেবে ভেবেছিল। সে ঘুম ভেঙে গেল সদ্য চাকুরি পাওয়া এক যুবকের গলার আওয়াজে, এই ওঠ। তার হাতে চকচক করছে একটা গুলি ভরা রিভালবার। যা সেই সময় তাক করা ছিল আমার দিকে। সে তো কোন পুলিশি পোষাকে ছিল না, তবে তার পিছনে দাঁড়ানো দুজনের হাতে রাইফেল-পরিধানে খাকি পোষাক ছিল। তাদের সাথে ঘর থেকে বাইরে বের হয়ে দেখতে পেলাম, ঝুপড়িকে চারিদিক থেকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে দশ বারো জন আরো পুলিশ।
এবার যে পথে এসেছিল তারা, আমাকে নিয়ে ফিরে চলল সেই পথে। হাতে হাত কড়া পড়িয়ে দিয়েছে। কোমরে বেধে দিয়েছে মোটা দড়ি। দড়ির এক প্রান্ত ধরে রেখেছে সাদা পোশাকের একজন সেপাই। সেইভাবে এসে উঠলাম বাস রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখা একখানা জাল ঢাকা কালো ভ্যানে। সে ভ্যান দক্ষিণবঙ্গের ধানক্ষেত পেয়ারা বাগান পুকুর স্কুল হাসপাতাল গোরুর পাল দেখতে দেখতে ছুটে চলল লালবাজারে দিকে। লালবাজার–এটা শুধু মাত্র একটা নাম, একটা সরকারি অফিস বা কোন বিকিকিনির বাজার নয়–রাষ্ট্রক্ষমতার সর্বাপেক্ষা শক্তিকেন্দ্রের একটি।
ভ্যান থেকে নামিয়ে প্রথমে আমাকে নিয়ে যাওয়া হল এক বিল্ডিংয়ের দোতলাকী তিনতলায়। দেখলাম সেখানে গ্রাম শহরের নানা জায়গায় রাতভর তল্লাশি চালিয়ে আমার মত আরো জনা তিরিশকে ধরে আনা হয়েছে। আমি এদের কাউকে চিনি না। এরাও আমাকে চেনে না। আমি মাত্র একজনকেই চিনি। যাকে একবার আমার ঝুপড়িতে নিয়ে গিয়েছিলাম। যে কারণে সে এখন আমাকে ধরিয়ে দিতে পেরেছে। গতকাল সকাল সাতটায় সে ধরা পড়েছিল। বেলা দুটো থেকে বেলা চারটে দু ঘন্টার মারে তার পেটের সব খবর পুলিশ বের করে নিয়েছে। কবে, কোথায়, কার কার সাথে মিশে কি কী করেছে, সব বলে দিয়েছে। সে বলেছে একজনের নাম, সেইজন বলেছে আর দু জনার নাম, সব মিলিয়ে এই এত জন। এর কিছু পুলিশই বেলা হলে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দেবে। কিছু কোর্ট থেকে আজকালের মধ্যে জামিন পেয়ে যাবে। কিছু জামিন পাবে নব্বই দিন পরে। আর আমি? আমাকে এখন থাকতে হবে। সেটা পুলিশের কোন দোষ নয়, আমারই অক্ষমতা। জামিন করে ছাড়া পেতে হলে টাকা লাগে। আমার তা ছিল না যে।
যে আমাকে ধরিয়ে দিয়েছে তার মুখে আমার বিষয়ে শুনে পুলিশের একটা ধারণা হয়েছিল কোন রাঘব বোয়াল। কিন্তু আমার ঘর তল্লাশি করে যখন বোমা বন্দুক কিছুই পাওয়া গেল না, আর এখন যখন “জিজ্ঞাসাবাদ” করে জানা গেল যে–আমি রেডবুক পড়িনি, দেশব্রতী পড়িনি। কোন “খতম” বা রাইফেল ছিনতাইয়ের সাথে যুক্ত নই, এমন কি আমার চেহারাটাও কোন রাজনৈতিক নেতার মত নয়, স্টেশনের কুলির মত, তখন তারা খুবই হতাশ হয়েছিল। বুঝতে পেরেছিল এতো মাইল পথ ছুটে গিয়ে আমাকে তুলে আনায় খুব একটা লাভ হয়নি। এতে কোন রিওয়ার্ড পাবার সম্ভাবনা নেই। যে সি.পি.আই এম.এল দলের রাজ্য সম্পাদকের নাম পর্যন্ত জানে না, তাকেনকশাল বলে চালানো হাস্যকর। আর খুন ডাকাতি রেপ চুরি এসব কেস দিতে হলে যা সাক্ষ্য প্রমাণ লাগে, তা-ই বা কই। তবে আনা যখন হয়েছে কেস তো একটা দিতেই হবে। জিজ্ঞাসাবাদও করতে হবে, কোন উপায় নেই এটা ডিউটি। কথায় তো বলে-যেখানে দেখবি ছাই, উড়াইয়া দেখ তাই, মিলিলেও মিলিতে পারে অমূল্য রতন। পি.সি. এনে পিটিয়ে দেখতে হবে যদি কিছু বের হয়।
