এরপর আবার তার সাথে যোগাযোগ হয়েছিল আমি রিকশা চালানো শুরু করার পর। তখন নরেশ ঠাকুর কোথাও কাজে গেলে সেখান থেকে খাবারটি পরিপাটি করে গুছিয়ে আমার জন্য নিয়ে আসত। এবং যত রাত হোক পোটলাটি স্টেশনে আমার হাতে তুলে দিয়ে যেত। কোন কোনদিন কাজের জায়গা থেকে আমি তাকে রিকশায় তুলে নিয়ে আসতাম।
এরপর আবার কার্তিকের ঘটনার পর তার সাথে দেখা সাক্ষাৎ বন্ধ করে দিয়েছিলাম। সে তখন আনন্দপল্লীতে ঘর ভাড়ায় থাকত। ওই পাড়ার কিছু লোকের সাথে কামারপাড়ার একটা সম্পর্ক আছে। আমার একটা ভয় ছিল, যদি তারা আমাকে বন্ধুর শত্ৰু অতএব আমার শত্রু। এবং শত্রুর বন্ধু সেও আমার শত্রু এই মনে করে নরেশ ঠাকুরকে নিগ্রহ করে।
কিন্তু আজ আমি বড় নিরুপায়। পৃথিবীর সব দরজা এখন আমার জন্য বন্ধ বলে মনে হচ্ছে। থাকে যদি সে ওই ছোট্ট ঘুলঘুলি, ওই নরেশ ঠাকুর। আশা করেছিলাম, দেখা পাব। দেখা পেয়ে গেলাম। সেদিন তার কাজ ছিল না। ডেকে নিয়ে বলি তাকে বড় বিপদে পড়েছি। আমার শরীর পুইড়া গেছে। কী করে? তার প্রশ্নের জবাব বলি–বারুদে। বলি, একবাজির কারখানায় কাজ করি। কালী পটকা দোদমা বানায় না? সেই কারখানায়। দিন পনের সবে লেগেছি। তা আমি তো জানি না যে ওই কারখানায় বিড়ি খাওয়া বারণ। ভুল করে যেই বিড়ি ধরিয়েছি, বারুদে আগুন ধরে গিয়ে।”ওরা কোন ক্ষতিপূরণ দেয়নি।” দিয়েছে, দিয়েছে। সেই টাকায় তো চিকিৎসা করে পায়ের উপর উঠে দাঁড়াতে পেরেছি। তবে তাদের খুব বেশি চাপ দিতে পারিনি। দোষটা তো আমার। প্রচুর টাকার বাজি পুড়ে গেছে। আর বাজির কারখানায় কাজ করব না। অন্য একটা কাজ দেখেছি। তবে শরীরটা ঠিক না হলে তো। এর জন্য দশ বারোটা দিন দরকার। কোথায় থাকি, কী খাই?
নরেশ ঠাকুর সরল সোজা মানুষ। খুব একটা চালাক চতুর নয়। তা হলে কী অত বড় বাড়িটা ওভাবে চলে যায়। তবে এত বোকাও নয় যে আমার চালাকিটা ধরতে পারছে না। সে নিয়ে একটাও কথা বলল না।বলে অন্য কথা–আমি ওইশ্রীকলোনির ওদিকে ঘরভাড়া নিয়েছি।ওদিকে তোকে কেউ চেনে নাকি?
চেনে! তবে সে কথা নরেশ ঠাকুরকে বলি না। শ্রী কলোনির এক কংগ্রেস নেতা আমাকে চেনে। এই লোকটা আগে নকশাল পার্টি করত। বেশ কিছুদিন আগে কে বা কাহারা যেন বোমা পাইপ নিয়ে এক তুমুল বর্ষার রাতে শ্রী কলোনির নকশাল ছেলেদের ডেরায় হামলা চালায়। তারা তাকে তো পায় না পেয়ে যায় তার পাঁচ সঙ্গীকে। যাদের পরের দিন সকালে নলিকাটা অবস্থায় লায়েলকার মাঠে জলকাদার মধ্যে পড়ে থাকতে দেখা যায়।
শ্রী কলোনির পাশের পাড়া বিজয়গড়। সেখানে তখন সি আর পি-র ক্যাম্পবসেছে। যাদের সাহস এবং সহায়তায় পাড়া ছাড়া কংগ্রেসিরা পাড়ায় ফিরে এসে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তৈরি হচ্ছে সি.পি.এম উৎখাত করবার জন্যে। সে গিয়ে সেই দলের সাথে হাত মেলায়। যার ফলে তার নাম হয় কংসাল। এবং সে-যে আমার ছেলেদের মেরেছে তাদের নিকেশ করে দেবব্রত নিয়ে আশেপাশের পাড়ায় হামলা শুরু করে দেয়। এরই ফলে একটা বিরাট এলাকা এখন সিপিএম মুক্ত।
একান্তে সে একদিন আমাকে বলেছে–এই যা দেখছিস, এতো আমার ছদ্মবেশ। উপায় ছিল না তাই ধারণ করতে হয়েছে। আসলে আমি তা-ই আছি, আগে যা ছিলাম। চলে আয় আমার কাছে।
তার সেন্টারে চলে যেতে মনের সায় পাইনি। ওরা তো আমাকে বসিয়ে খাওয়াবে না। হাতে বোমা দিয়ে ছুঁড়তে পাঠাবে। সে ছুঁড়বো তো কার দিকে ছুঁড়বো? এদিক কিংবা ওদিক, সার বেধে যারা দাঁড়িয়ে আছে সব তো নকল শত্রু। আসল শত্রু তো নাগালের বাইরে। আমি তখন এই সত্যটা বুঝে ফেলেছি। কার্তিক যদি আবার আমার উপর আক্রমণ করে, আমি হয়ত তার পেট সোজা আবার চাকু চালাবো। কিন্তু তাতে আনন্দ হবে না, কষ্ট হবে। তাই যাওয়া হয়নি তার আশ্রয়ে। তবে এটা জানি আমার পূর্ব পরিচিতির কারণে সে আমার কোন ক্ষতি করবে না। ছোটখাটো বিপদ এলে বাঁচাবে।
বলে নরেশ ঠাকুর–বাজিতে পুড়েছিস বলবি না। বলবি, আমার সাথে কাজে গেছিলি। উনুন ভেঙে লুচির কড়াই উল্টে গিয়েছিল। সেই আগুনে পুড়েছিস। তাই বলেছিলাম আমি।
এরপর বেশ কটা দিন ছোট ছোট কটা সমস্যা ছোট ছোট কটা ঘটনার মধ্যে দিয়ে কেটে গেল। আমি এখন লাঠি ছাড়া চলতে পারি। তখন মনে হল, নরেশ ঠাকুর আমাকে একটু স্নেহ করে, সেই দাবিতে তার ঘাড় ভেঙে এত কষ্টের অন্ন ধ্বংস করা ঠিক হচ্ছে না। এবার আমাকেও কিছু একটা কাজকর্ম খুঁজে নিতে হবে। মা বাবা ভাই বোন সে তো ছিলই, তারপর আবার ঘটনাচক্রে এক মহিলার দায়দায়িত্ব আমার উপর এসে গেছে। নরেশ ঠাকুরও আশা করছে আমি তার শেষ জীবনের আশ্রয় হবে। তাই একদিন পথ খুঁজতে পথে বের হয়ে পড়লাম।
জন্ম মুহূর্তে মধু বঞ্চিত এক অভিশপ্ত মানুষ আমি। জীবন আমার জন্য সব কটা সোজা পথ, সাধারণ আর স্বাভাবিক চলার পথ বন্ধ করে রেখেছে। আমার চলার জন্য ভোলা আছে অন্ধকার আঁকাবাঁকা রক্তপেছল পথ। যে পথ গিয়ে শেষ হয় কোন হাসপাতালের লাশ কাটা টেবিলে। কোন অন্ধকার জেলখানার কালো কুঠুরিতে। কোন নুন বোঝাই গর্তে। কোন শেয়াল শকুনের পেটে। এই সব কটা পথের মধ্যে একমাত্র জেলখানার কালো কুঠুরিটাই কিছু কম নৃশংস। কারণ সেখানে প্রাণটা বেঁচে থাকে। আশা রাখা চলে হয়ত শেষ পর্যন্ত থাকবে।
