সন্ধ্যে ঘোর হয়ে গেলে ডাক্তার একজন বলবান যুবাকে নিয়ে হাজির হয়েছিল ভুতোর বাড়ি। সেই যুবক বি. এ. পাশ করে এখন বেকার হয়ে বসে আছে। যে আমাকে কাঁধে করে প্রায় মাইল তিনচারেকধান ক্ষেতের জলকাদার মধ্যে দিয়ে, নিয়ে এসেছিল ডাক্তারের বাড়ি। তারপর নিঃশব্দে পিছন দরজা দিয়ে ঢুকিয়ে দিয়েছিল ঘরে। আমিও চাইছিলাম ভুতের বাড়ি থেকে চলে আসতে। এই চৌদ্দ পনের দিনের সবকটা রাত কেটেছে ভয়ে ভয়ে-এই বুঝি পুলিশ আসে। সকালে সে ভয় আরও বেড়ে গিয়েছিল, তীরে এসে তরী ডোবে এই উপমাটা মনে পড়ায়।এতদিন বিছানায় পড়েছিলাম, তখন কিছু হলে করার কিছু থাকত না। কিন্তু এখন হলে, সেবড় আক্ষেপের। তাই ডাক্তার বলা মাত্র রাজি হয়েছিলাম। তা ছাড়া ডাক্তারের বাড়ির সামনে পাকা রাস্তা। এ রাস্তায় ভ্যান রিকশা চলে। ভোর বেলা সেই ভ্যানে চেপেই বাস রাস্তায় যেতে হবে।
ডাক্তার আমাকে এ বাড়িতে নিয়ে এসেছিল তার দাদাকে দেখাবে বলে। পরে অবশ্য সে মত পাল্টে ফেলেছিল। না থাক। যদি কিছু হয়। পরের দিন সে আমাকে, যেভাবে লুকিয়ে তার ঘরে ঢুকিয়ে ছিল, সেইভাবে সবার নজর বাঁচিয়ে ভ্যানে এনে তুলে বাস রাস্তায় নিয়ে এসেছিল। পথে একজন জিজ্ঞাসা করেছিল–কী করে পুড়েছে? আমার হয়ে জবাব দিয়েছিল ডাক্তার–স্টোভ ফেটে। বলেছে–আমি তাদের চাষের কাজের লোক। বাসে সে আমার সাথে বর্ধমান পর্যন্ত গিয়ে টিকিট কেটে ট্রেনে তুলে দিয়েছিল।
সে কবেকার কথা। আজও আমি সেই প্রাণরক্ষাকারী ভুতো বুধো সুধা তার বৌদি, ডাক্তার, এবং সেই কাঁধে বয়ে নিয়ে আসা যুবক কারও কথা ভুলতে পারিনি। উচিৎ ছিল একবার গিয়ে সবার সাথে দেখা করে আসা। নানা কারণে সে সুযোগ হয়ে ওঠেনি। আর এখন তো সে গ্রামের নাম, যাবার পথ, সব ভুলে গেছি। জানি না এই লেখা তাদের কারও চোখে পড়বে কী না। ভুতোরা লেখাপড়া জানত না। কিন্তু ডাক্তার আর সেই যুবক তো জানে। ওরা বুঝবে কেন আমি যেতে পারিনি। তখন নিশ্চয় আমার না যাওয়ার অপরাধ ক্ষমা করে দেবে।
শহাওড়া স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমে লাঠিতে ভর দিয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে এসে বাসে উঠলাম। তখনও ঠিক করতে পারছিলাম না এই শরীর নিয়ে কোথায় যাব। শিয়ালদহ স্টেশনে এসে বহুক্ষণ বসে একে একে মনে করছিলাম সব চেনা মুখ। যার কাছে গেলে এই সময়ে সাহায্য পাবো। মেঘনাদ আহবালিদের বাড়ি চিনি না। ওরা চেনায় নি। সবার সাথে সবার দেখা হয়, বারুইপুর রেল ব্রিজের পাশে এক চায়ের দোকানে। সেও আগে ভাগে বলা কওয়া থাকলে। আজ সন্ধ্যায় ওরা সেখানে আসবে কী আসবে না তা কে জানে। একবার মনে হল, পাগলা সরদারের বাড়ি যাবার কথা। কিন্তু তারা এত দুঃস্থ যে নিজের পেটের ভাতই যোগাড় করতে পারে না। আমাকে খাওয়াবে কী? কম পক্ষে আট দশদিন আমার সুস্থ হবার জন্য সময় দরকার।
শরীরের যে সব অংশ পুড়ে গিয়েছিল তার ঘা তো শুকিয়ে গেছে। রয়ে গেছে পোড়ার দাগ। যা আগে ডিমের মত সাদা দেখাচ্ছিল–এখন কয়লার মত কালো। জামা আর লুঙ্গির নিচে সে দাগ ঢাকা পড়ে আছে। বাইরে থেকে দেখা যায় না। দেখা যায় মুখের ডানদিকের পোড়া দাগটা। মাথায় গামছা বেধে গামছার একটা প্রান্ত ঝুলিয়ে দিয়ে সে দিকটাও ঢেকে নিয়েছি যতটা পারি। তবে ঢাকা যায়নি ডানপায়ের জোড়ের উপরকার পোড়া। শরীরে সবচেয়ে বেশি পুড়েছিল এই জায়গাটা। এখানকার চামড়া খুলে ঝুলছিল। যা আমি তখনই টেনে ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছিলাম। এখনও সেই ঘাটা কিছু রয়ে গেছে। যা কড়কড় করছে। হাঁটতে গেলে টান ধরে আর মনে হয় বুঝি ছিঁড়ে গেল। পায়ের কারণেই আমার হাঁটায় বড় অসুবিধা হচ্ছে। এই পা নিয়ে আমি কোথায় যাব!
যাদবপুর স্টেশনে ট্রেন থেকে নামতে সাহস হল না। ওখানে গণেশ গোপালরা থাকে। ওদের কাছে কিছু সাহায্য পাওয়া গেলেও যেতে পারে। কিন্তু তার আগে যদি কোন শত্রুর সামনে পড়ে যাই নিজেকে রক্ষা করতে পারব না। কার্তিক হাসপাতাল থেকে এসে গেছে। যদিও তার শরীর এখন অক্ষম কিন্তু তার ভাই, মণি ও শিবশংকর তো সক্ষম সুস্থ। তাই ট্রেনের ভিড়ে মুখ লুকিয়ে গিয়ে নামলাম বাঘাযতীন স্টেশনে। আর সারাদিন সেখানে শুয়ে বসে থেকে সন্ধ্যের কিছু পরে একটা রিকশায় পঞ্চাশ পয়সা ভাড়া দিয়ে গিয়ে পৌঁছালাম বাস রাস্তার মোড়ে সেই ডেকরেটার্সে-কাজ না থাকলে কাজ পাবার আশায় যেখানে নরেশ ঠাকুর বসে থাকে। এখন এই লোকটাই আমার সবচেয়ে বড় ভরসার।
নরেশ ঠাকুর আমাকে ভালোবাসে সেটা জানতাম। জানতাম না কতটা ভালবাসে আর সে জন্যে কতদূর আগাতে পারে। ঝুঁকি নিতে পারে। এমনিতে মানুষটা যথেষ্ট বিপন্ন। তার মুখটা দেখলে খুবই মায়া হোত। তাই আমিও চাইতাম না যে তার সাথে কোন গভীর যোগাযোগ রাখি। তাহলে হয়ত “সঙ্গদোষের” কারণে সে আমার শত্রুপক্ষের নিশানায় এসে যাবে। মানুষ তো এই সময় পাগলা কুকুরের চেয়ে খারাপ। সব সময় দাঁত বের করে ঘুরছে কাকে কামড়াবে। কিছুদিন আগে সেই বিভৎস কাশীপুর বরাহনগর গণসংহার হয়ে গেছে। যাকে খুঁজছে তাকে না পেয়ে তার ভাই বন্ধু যাকে পেয়েছে খুন করে দিয়েছে খুনিরা। তাই গরফায় চলে যাবার পর তার সাথে আর কোন সম্পর্ক রাখিনি। এমন কী দণ্ডকারণ্য থেকে ফিরে এসে চার পাঁচদিন না খেয়েছিলাম, আমি জানতাম তার কাছে যেতে পারলে সে যা খেত তার থেকে একভাগ নিশ্চয় আমাকে দিত। তবে তখন সে যেখানে থাকত যাওয়া যেত কিনা সে আমার পক্ষে একটা ভাবনার বিষয়।
