ভগবান এতদিনে তার প্রতি সদয় হয়েছে। পেয়ে গেছে এমন এক রোগী যার অর্ধেক শরীর পোড়া। এবার চলবে চিকিৎসা। গিনিপিগের উপর যেমন পরীক্ষা নিরীক্ষা চলে। যদি রোগী বেঁচে যায় নবীন এক ডাক্তারের নামে জয় জয়কার হবে। যদি মরে যায়, কোন ভয় নাই। নদীতে ঢের জল। ভুতো বুখোরা নিজেদের জ্বালায় লাশ নিয়ে নদীতে ফেলে আসবে। কেউ ডাক্তারের নামে দোষ চাপাবার সুযোগ পাবে না।
হাট থেকে ডাক্তার ভুতোর সাথে আমাকে দেখতে এসেছিল। দেখে সে তখনকার মত চলে গেল। ফের এল ঘণ্টা দুয়েক পরে, হাতে ছিপ আর লুঙ্গির কোঁচড়ে কিছু ওষুধপত্র নিয়ে। আগেই সে বলে গিয়েছিল–সে ডাক্তার নয়, ডাক্তারের ভাই। তবে কোন রোগে কী ওষুধ সেটা সে জানে। যদি চিকিৎসায় কোন জটিলতা দেখা দেয় সে তার দাদার পরামর্শ নেবে।
এখন সে আমাকে দুটি ইনজেকশান দেবে। একটি টিটেনাস একটি পেনিসিলিন। পোড়াস্থানে লাগাবে সোফ্রামাইসিন। আমি আর কী করব তখন। নিজেকে সমপর্ণ করে দিলাম এই শিক্ষানবিশের হাতে। যার জীবনের প্রথম রোগী আমি। হয় রোগ, নয় চিকিৎসা এতেই তো মানুষ মরে। আমি শুনেছি, সারা পৃথিবীতে নাকি যতলোক রোগে মরে তার অর্ধেক বিনা চিকিৎসায়, অর্ধেক ভুল চিকিৎসায়। যারা সেরে ওঠে সব বরাত জোরে, নয় ট্যাকের জোরে। আমার সামনে এখন দুটো পথ খোলা, হয় ডাক্তারের হাতে খুন হওয়া, না হয় ভাগ্যের জোরে বেঁচে যাওয়া।
প্রথমদিনের ওষুধে ভূতোর চল্লিশ টাকা শেষ। তাহলে কাল কী হবে? পরশু? একটা পাঠাছাগল ছিল ভুতোর। সেটা বিক্রি করে দিল একশো কুড়ি টাকায়। ষাট টাকা নিজের সংসারের জন্য রেখে বাকি ষাট টাকায় আরও দুদিন চলে গেল। এখন রোজ দুটো করে ইনজেকশান আর পোড়াতে পাউডার অষুধ লাগানো হচ্ছে।তিন দিন পার হয়ে গেল, আহবালিরা কেউ এল না। আসবে না যে সে আমার মন জেনেছিল। বোঝেনি বোকা ভুতো।
ডাক্তারের তখন চিকিৎসার নেশা ধরে গেছে। নতুন গাড়ি চালানো শিখলে যেমন হয়। সব সময় মনে হয় চালাই, চালাই। সে তার দাদার ডিসপেনসারি থেকে লুকিয়ে লুঙ্গির কোচড়ে ওষুধ এনে দুদিন চিকিৎসা চালিয়ে তিনদিনের বেলা ধরা পড়ে গেল। তখন কী উপায়? যে লোকটা বিড়ি ধরাবার চেষ্টায় দেশলাই জ্বেলেছিল, গ্রামের সবাই–বিশেষ করে বুধো চাপ দিল তাকে–কেরাম মানুষ তুই! মানষির রক্ত শরীলি আছে? না, নেই? তোরি জন্যি লোকটা মরতিছে আর তুই মোট্টে হাত উপুর করলি না? সে গরিব, খুবই গরবি। তার সম্বল বলতে একখানা ভাঙা সাইকেল। যা সে প্রায় বছরখানেক আগে চুরি করে এনেছিল। বহু অভাব অনটনেও সেটা বিক্রি করেনি। কঠিন চাপের সামনে পড়ে এবার সেটা তিনশো টাকায় বিক্রি করে দিল। তবে তা থেকে সে ভূতোকে দেড়শোর বেশি কিছুতে দিল না। এইভাবে “এদিক সেদিক” করে প্রায় পনেরদিন চিকিৎসা চলার পর লাঠিতে ভর দিয়ে পায়ের উপর উঠে দাঁড়াতে পারলাম। যেদিন সকালে প্রথম ঘরের বাইরে এসে সূর্যোদয় দেখলাম, মনে হল পৃথিবীটা কী সুন্দর। ধানের শিষে পড়া সোনা রোদ যেন শিশুর মত হাসছে। মিষ্টি মিষ্টি স্বতন্ত্র স্বাসফেদুল গায়ে বুলিয়ে দেওয়া মায়ের কোমল হাত।
আমাকে দু পায়ের উপর দাঁড়াতে দেখে ভুতো বুধো সুধা তার বউদির মুখে যে কী অনাবিল হাসি! তবে সব হাসিকে ছাপিয়ে গিয়েছিল নবীন ডাক্তারের সাফল্যের হাসি। যেন সে আজ চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পেয়ে গেছে। পঞ্চাশ ষাট টাকার ওষুধ তার নিজের ট্যাক থেকে এসেছে, পনের দিনের পরিশ্রমও গেছে। সে নিয়ে তার মনে এখন কোন শোকতাপ নেই। সে যেদিন পারে দেবে ভুতো। এখন তার সফলতার সুখ উপভোগ করার দিন। বলে সে–আজ রাতে আমি তোমাকে আমাদের বাড়ি নিয়ে যাব। তোমার পোড়ার জায়গাগুলো আমার দাদাকে দেখাবে।
আশুদা, আমাকে ক্ষমা কোরো, নকশাল বাড়ি আন্দোলনের অসংখ্য শহিদ, আমাকে ক্ষমা কোরো। আমি জানতাম না, গ্রামবাংলার মানুষ তোমাদের এত ভালোবাসে। তোমাদের নাম এত শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারণ করে। আমি কিছুদিন তোমাদের সাথে ছিলাম। তোমাদের মতো ছিলাম না। বিপ্লবী রাজনীতির বিন্দুবিসর্গ তখন বুঝতাম না। এখনও যে বুঝি এমন দাবি করতে পারব না। তবু সেদিন তোমাদের সঙ্গে যে ছিলাম এক সময়, সেই পরিচয়টুকুতে আমি প্রিয় হয়ে গিয়েছিলাম কিছু মানুষের কাছে।
একজন শ্রমিক যে উৎপাদনমুখি শ্রমের সাথে যুক্ত। একজন কৃষক, যে সন্তান স্নেহে যত্নে জমিতে ফসল ফলায়।শ্রমজীবনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংযোগের ফলে তারা শোষণবাদী ব্যবস্থার স্বরূপ জানে। ফলে তার ব্যবস্থার প্রতি সঙ্গত ক্ষোভ জন্মে। সে ওই ব্যবস্থার ধ্বংস সাধনে পুঁথি পড়া রাজনৈতিক কর্মীর তুলনায় অনেক সময় অনেক বেশি সক্রিয় হয়ে যেতে পারে। ভারতবর্ষে যে ছোটবড় প্রায় দুশো আদিবাসী ও কৃষক বিদ্রোহ হয়েছে তারা তো কেউ দাস ক্যাপিটাল বা রেডবুক পড়া মানুষ ছিল না। তাদের বাস্তব জ্ঞান তাদের বাধ্য করেছিল বিদ্রোহ করতে।
আমি তো শ্রমিক নই কৃষক নই। আমার কোন দেশ নেই। যে অবস্থা এবং ব্যবস্থার মধ্যে আমার বাস, সেখানেও জীবন কোন শেকড় বসাতে পারেনি। যে গভীর অধ্যয়ন থাকলে সবকিছুর পরেও একজন ভালো রাজনৈতিক কর্মী হওয়া যায় নিরক্ষরতার জন্য আমি সেও পারিনি। তবু সেদিন আমার সব অযোগ্যতা অপূর্ণতা অজ্ঞতা চাপা পড়ে গিয়েছিল বারুদে পোড়া দাগের নিচে।
