–কে! কে?
–আমি বুধো।
–কী হয়েছে?
–দাঁড়া।
অন্ধকার রাতের জল জঙ্গল সাঁতরে ছুটে এসেছে অন্ধ বুধ। কেন! কেন? তার পিছনে আরও দুই মূর্তি। একজন পাঁচ মাসের গর্ভবতী ভুতোর বউ অন্যজন এক নাবালিকা “নারী” সুধা।
ভুতো আমার বাঁ পায়ের দিকে। বুধোর গলার শব্দে সে যেন শক্ত খোটার মতো মাটিতে গেঁথে গেছে। যে খোটা অন্য তিনজনে মিলে উপড়ে ফেলতে পারবে না। তারাও দাঁড়িয়ে পড়ে। একটা অবিশ্বাস্য–অলৌকিক কিছু ঘটে যাক, মনে প্রাণে চাইছিল সে। থেমে যাক এই মরণযাত্রা। অন্ধভাইয়ের রূপ ধরে যেন সেই পার্থিব এগিয়ে আসছে।
বুধো ছুটে গিয়ে সবার সামনে আমার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে পড়ে। তারপর যেন আকাশ মাটি জল হাওয়া মাঠ অন্ধকার সব কিছুর দিকে–মচাকাঁধে দাঁড়িয়ে থাকা চারজনের দিকে অন্ধচোখে আগুন জ্বেলে চিৎকার করে ওঠে–শালা খানকির ছাবালরা–তোরা কী মানষির জন্ম! নাকি কুকুর শেয়ালের পেটে হইচিস! নিজিগার ব্যগ্র ক্ষত্রিয় বলিস। বালের ক্ষত্রিয়। ক্ষত্রিয়ের অক্ত কী আছে তোগার শরীলি! যে বাবু পাড়ার নোক তোগার মা বোনির কাছে শুয়ে গেল তাগার কোনদিন এট্যা বালও ছিড়তি পারিসনি। আর এই মানুষটা সেই কঁহা মুল্লুক থিকে পেরান হাতে নে এয়েচে তোগার উবগার করতি, বেপদে পড়েছে যে তোগার জন্যি। আর তারে নে চলেছিস নদীতি ফেলতি? ছিঃ ছিঃ!
শুধু বুধো নয়, আমার মনে হয় ভুতোর বউয়ের পেটে যে বাচ্চা সেও প্রতিধ্বনি করছে–ছিঃ ছিঃ ছিঃ ছিঃ!
কে যেন মিনমিন করে বলে–কিন্তুক যা ওর অবোস্তা এতো বাঁচবে না। কাল না হয় পরশু তো মরেই যাবে।
গর্জে ওঠে বুধো–তুই কী চের জীবন বাঁচবি! এ বচ্ছর নয় ও বচ্ছর যোম তোরে নেবে। তেবু পরান নে ইদিক সিদিক পালাচ্ছিস ক্যান! কতায় বলে য্যাতক্ষণ শ্বাস ত্যাতক্ষণ আশ। যার শ্বাস নাই তার আশ নাই। মানুষটার এ্যাখোনও ঘাস চলতিছে।
–ভয় তো এ্যাটাই–যেদি পুলুশে ধরে নে যায়।
–সে তো উত্তম কতা। সেখেনে চিকিচ্ছেডা পাবে। বেঁচে যাবে।
–যদি আমাগার নাম বলে দ্যায়!
তাতে কার কী বাল ছেঁড়া যাবে? পাঁচটা কেসে এ্যাখোন পুলুশে খোঁজে, ত্যাখন ছটায় খুঁজবে। এর বেশি আর কী হবে!
ভুতো আর কোন কথা বলে না, কথা শোনেনা। পাঁক মেরে মাঁচার মুখ ঘুরিয়ে দ্যায়। যে পথে ওরা চারজনে হেঁটে এসেছিল সেই পথে এখন ফিরে চলে সাত জোড়া পা। যাবার বেলা যাদের বুক জুড়ে দাপাচ্ছিল ভয়, এখন দৌড়ে বেড়াচ্ছে সাহস। সাপ জোঁক ঝিনুক শামুক পিষে যাচ্ছে ওদের দৃঢ় পায়ের তলে। তাকিয়ে দেখি পূর্বাকাশে তখন দেখা যাচ্ছে হালকা আলোর একটা রেখা। মনে হয় কিছুক্ষণ পরে সূর্য উঠবে।
এ আমার নবজীবনের সূর্যও।
.
অবশেষে অনেকবারের মত আর একবার ফিরে আসতে পেরেছি নিশ্চিন্ত মৃত্যুর দোরগোড়া থেকে। আমাকে ঢুকিয়ে রাখা হল সেই ঘরে যে ঘর থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল নদীবক্ষে বিসর্জনের জন্য। ঘরের দরজায় একটা বল্লম নিয়ে পাহারায় বসে গেল বুধধা। তার চোখে এখন আর কোন অন্ধকার নেই। সে এমন অনড় হয়ে বসে রইল যে দেখে মনে হচ্ছিল, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ তো তুচ্ছ, ভারত সরকারের সেনা বাহিনীরও ক্ষমতা হবে না, তাকে ঠেলে এই ঘরে প্রবেশ করে। সুধা আর তার বউদি মমতাময়ী দুই বঙ্গললনা লেগে গেল অসুস্থের শুশ্রূষায়। কিন্তু শুধু শুশ্রূষায় তো আর দেহের দগ্ধক্ষত নিরাময় হবার নয়। এর জন্য চাই চিকিৎসক, চাই ওষুধ। আহবালিরা মনে হয় গোটা পঞ্চাশ টাকা ভুতোর কাছে দিয়ে গিয়েছিল সেই সম্বল নিয়ে ভুতো খুঁজতে বের হল এক ডাক্তার।
সেদিন ছিল হাটবার। হাটবার না হয়ে অন্যকোন বার হলে নিঃসন্দেহে আমার সমস্যা অনেক বেড়ে যেত। সেই হাটে ভুতো গরু খোঁজার মত খুঁজে বেড়াচ্ছিল এমন একজনকে যে এই মহা বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারে। সে শুধু ডাক্তার হলেই তো হবে না যেন বিশ্বস্তও হয়। যেন গোপন কথা পাঁচকান করে না বসে। এটাই ছিল ভুতোর কাছে একটা ঘোর সমস্যা। ডাক্তার তো অনেক পাওয়া যাচ্ছিল, পাওয়া যাচ্ছিল না বিশ্বস্ত কাউকে। যাদের পেয়েছিল তারা কেউ ডাক্তার নয়।
ঘরে পোড়া রুগী। তাকে তো বিনা চিকিৎসায় ফেলে রাখা যায় না। তাই সে নিরুপায় হয়ে এমন একজনকে ধরে নিয়ে এলো যে এক ডাক্তারের ভাই।
অল্প কিছু পড়াশোনা জানা, মধ্যম চাষীর ছেলে, সেই কোয়াক ডাক্তারের এই ভাইয়ের আশা “বড়” হয়ে সে একটা বিরাট কিছু হবে। কিন্তু কী যে হবে সেই বিষয়ে এখনও ভাবনা চিন্তা করে যাচ্ছে। ভাবনা চিন্তার মত কঠিন কাজ লোকজনের ভিড়ে হয় না। এর জন্য একটা নিরিবিলি স্থান। দরকার। তেমন নিরিবিলি স্থান আজকাল আর কোথায় মেলে? তাই বেচারা বাধ্য হয়ে একটা মাছমারা ছিপ নিয়ে চলে যায় কোন জলাশয়ের পাড়ে। জলে ছিপ পেলে ফাতনায় চোখ রেখে দিনভর নানা রকম পরিকল্পনা করে। কিন্তু তার মা বাবা এসব গুঢ় বিষয় বোঝে না। তারা বলে–লেখাপড়া শিখলি না, চাষের কাজও পারিস না। মাছ ধরা ছাড়া আর কিছু জানিস নে। আমরা মরে গেলে কী যে হবে তোর।
কী হবে? আর যদি কিছু করতে না পারে, ডাক্তারি করবে। তার দাদা বলে ডাক্তারি করতে হলে সেটা তো শেখা লাগবে। শেখা? সে আর এমন কী। দেখে দেখে শেখা তো হয়েই রয়েছে। সে যে সব শিখে বসে আছে, সেই প্রমাণও একদিন দিয়ে দেবে। যদি নাগালে কোনদিন তেমন কোন কঠিন রুগী পেয়ে যায় তাকে সারিয়ে। নিয়ে যাবে তাকে দাদার সামনে–দ্যাখ দাদা আমিও পারি।
