মাস-তারিখ মনে নেই। জেলগেটে ডেকে এনে বলা হলো, আপনি মুক্তি পাচ্ছেন। রাত বাড়ছে। হাতে টাকা নেই। ঢাকা থেকে গ্রেফতার হয়েছিলাম–তাই জেল কর্তৃপক্ষ রিকশা ভাড়া দিতে পারে। গ্রামের বাড়ি কোটালীপাড়া থেকে গ্রেফতার হলে যাবার খরচ-খাবার খরচ পেতাম। এখন যাব কোথায়? বন্ধুরা কে কোথায় আছে জানি না। একই সঙ্গে মহিউদ্দিন সাহেব এবং হাসান জামিল মুক্তি পাচ্ছে। লক্ষ করলাম একজন অচেনা লোক তাদের সঙ্গে কথা বলছে এবং তাদের হাতে একটি কাগজ ধরিয়ে দিচ্ছে। আমার সন্দেহ হলো, হয়তো আমাদের অন্তরীণ করা হচ্ছে।
আমি জেলার সাহেবকে ডাকলাম, বললাম, ওই অচেনা ভভদ্রলোক কে? কী তাঁর পরিচয়? এরমধ্যেই ওই ভভদ্রলোক আমার কাছে এলেন–বললেন, আপনার একটি অর্ডার আছে। আমি বললাম, আপনি কে আপনাকে আমি চিনি না। জেলার সাহেবকে বললাম–এ ভভদ্রলোককে বের করে দিল। আমি তাঁর কাছ থেকে কোনো অর্ডার নেব না। অর্থাৎ জেলগেটেই আবার গোলমাল শুরু হলো। মহিউদ্দীন সাহেব, জামিল সাহেব ওই অর্ডার নিলেন। তাঁদের ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ অন্তরীণ করা হলো। আমাকে ঢাকায় অন্তরীণ করার নির্দেশ দিলেন। আমি গ্রহণ করলাম না। ওই ভভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করলেন–আপনাকে কোথায় পাওয়া যাবে? আমি বললাম–আগামীকাল ইত্তেফাক অফিসে। আমি ইত্তেফাঁকের সহকারী সম্পাদক হিসেবেই গ্রেফতার হয়েছিলাম।
শেষ পর্যন্ত ঠিক করলাম ঢাকা হলে অজয় রায়ের খোঁজ করব। ঢাকা হলে গিয়ে অজয় বাবুকে পেলাম না। তিনি নেই। পরের দিন অজয় বাবুর বিয়ে। তবে ভার কক্ষে আশ্রয় পেলাম। জেলখানা থেকে খেয়ে এসেছিলাম। তাই রাত ভালোভাবেই কাটল।
পরের দিন ইত্তেফাক অফিস গেলাম। আমার প্রথম কাজ একটি আশ্রয় খুঁজে পাওয়া এবং আয়ের সূত্রের সন্ধান। ভাবলাম জেল থেকে এলেও ইত্তেফাঁকে আমাকে চাকরি দেবেই। আইয়ুববিরোধী এ আন্দোলনে ইত্তেফাঁকের সহকারী সম্পাদক আলী আকসাদ গ্রেফতার হয়েছিলেন। জেল থেকে মুক্তি পাবার পর তার চাকরি হয়েছে। আন্দোলনের সময় আহমেদুর রহমান আত্মগোপন করেছিলেন। তিনিও চাকরিতে যোগ দিয়েছেন।
ইত্তেফাক অফিসে ঢুকে মনে হলো আমার চাকরি হচ্ছে না। আমি চাকরিতে ঢুকবার সময় এমএ আউয়াল সহকারী সম্পাদক ছিলেন। আউয়াল এক সময় ছাত্রলীগের সম্পাদক ছিল। জেল থেকে শুনেছি আউয়াল ইত্তেফাক ছেড়ে দিয়েছে। কারণ ইত্তেফাঁকের মালিকানা নিয়ে বিরোধিতা। ইত্তেফাক সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া গ্রেফতার হয়ে গেলে আউয়াল নাকি পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক আইন প্রশাসক ওমরাও খানের কাছে ইত্তেফাঁকের মালিকানা দাবি করে দরখাস্ত দিয়েছিল। এ বিতর্কে তাকে চাকরি ছেড়ে দিতে হয়। আমি আউয়ালের সঙ্গে দেখা করলাম। আউয়াল বলল, তোর চাকরি হবে না। আমি বললাম, কেন। আউয়ালের জবাব হলো, তোকে মানিক ভাই বিশ্বাস করবে না। কারণ তুই আমার বন্ধু।
ইত্তেফাঁকে চাকরির জন্যে অনেকেই দেনদরবার করলেন। তেমনি কাজ হলো না। শেষ পর্যন্ত বলা হলো নির্মল সেনের বার্তা বিভাগে চাকরি হতে পারে, সম্পাদকীয় বিভাগে নয়। তাও হলো না। বার্তা বিভাগের নেতা বার্তা সম্পাদক সিরাজউদ্দীন হোসেন আমাকে আশ্বাস দিলেন। দু’দিন টেবিলে বসতে বললেন। পরে বুঝলাম, এ চাকরি হবে না। কারণ সকলে জানে সম্পাদকের পরিবারের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় সকলে আমাকে সমীহ করে। এরপর আমি চাকরিতে ঢুকলে আমার ক্ষমতা আরো বাড়বে। সুতরাং বার্তা বিভাগেও আমাকে নেয়া হবে না এবং হলো না।
বুঝলাম আমাকে আবার টিউশনিতে ফিরে যেতে হবে। খবর এলো তোয়াহা সাহেবের কন্যাকে পড়াতে কেউ সাহস পাচ্ছে না। তোয়াহা সাহেব আত্মগোপন করে আছেন। আমাদের বিপ্লবী বন্ধুরা কেউ রাজি নয়। আমি সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করলেও তোয়াহা সাহেবদের রাজনীতি সঠিক মনে করি না। তবুও বললাম, আমি পড়াব।
এ টিউশনি এবং তোয়াহা সাহেব নিয়ে আমার জীবনে আর একটি কাহিনী আছে। তখন ঢাকা হলে থাকি। একদিন রাতে হলে ফিরে দেখি তোয়াহা সাহেব এবং অধ্যাপক মোজাফফর সাহেব আমার অপেক্ষায় বসে আছেন। তাদের প্রস্তাব মওলানা ভাসানীর পুত্র আবু নাসের খান ভাসানী ওরফে বাবুকে পড়াতে হবে। তাকে ম্যাট্রিক পাস করানো দরকার।
আমি রাজি হলাম। আমার শর্ত ছেলেটি আমার হলে এসে পড়তে হবে এবং আমাকে বেতন দিতে হবে। কারণ মওলানা সাহেব গরিব নন। এ শর্তে বাবুকে পড়িয়েছিলাম। বাবু পাস করেছিল এবং অনেক পরিবর্তন করে মওলানা সাহেবের কাছ থেকে এক মাসের বেতন আদায় করেছিলাম।
এবার তোয়াহা সাহেবের কন্যাকে পড়াতে হবে। তিনি আত্মগোপন করে আছেন। তাই বেতন নেয়া ঠিক হবে না। আমার সমস্যা মিটল না। তবে ভিন্ন একটি টিউশনি জুটে গেল এসএনকিউ জুলফিকার আলীর বাসায়। তিনি ঢাকা হলে প্রভোস্ট নিযুক্ত হলে প্রথম এক বছর আমরা তাঁকে হলে ঢুকতে দিইনি। আবার তিনিই আমাকে ১৯৫৯ সালে ২৪ ঘন্টার নোটিসে ঢাকা হল থেকে বের করে দিয়েছিলেন। যদিও ১৯৮৪ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে মাসের পর মাস তার বাসায় আশ্রয় পেয়েছি।
অজয় বাবু বিয়ে করেছেন। শ্বশুর বাড়ি কুমিল্লায়। অজয় বাবুর কোয়ার্টার আজিমপুরে। তাঁর সঙ্গে কোয়ার্টারে আছি। তার স্ত্রী ফেরা পর্যন্ত থাকব। ইতোমধ্যে অর্থনীতি প্রথম পর্ব পরীক্ষা দিয়েছি। মৌখিক পরীক্ষায় সকলের জিজ্ঞাসা, জেল থেকে কোন সাহসে অর্থনীতি নিয়েছি।
