সেকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিতে প্রাইভেট হিসেবে পরীক্ষা দিতে দেয়া হতো না। আমি হলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ছাত্র। আমার পূর্বে পটুয়াখালীর এক আইনজীবী অর্থনীতির প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে পরীক্ষা দিয়ে ডিগ্রি পেয়েছিলেন।
পরীক্ষার ফল বের হলো। ভালো হলো না। এবার বিপদ দেখা দিল। আমি জেল থেকে প্রথম পর্ব পাস করেছি প্রাইভেট হিসেবে। এবার দ্বিতীয় পর্ব পড়তে হলে আমাকে হলের মারফৎ ভর্তি হতে হবে। কিন্তু আমাকে ভর্তি করবে কে? ঢাকা হলের ছাত্র ছিলাম। ঢাকা হলের প্রভোস্টের কাছে গেলাম। তিনি রাজি হলেন না। প্রভোস্ট ড, মুশফেকুর রহমান আমার বিরুদ্ধে ১৯ পৃষ্ঠা রিপোর্ট দিলেন। আমার সিদ্ধান্ত, আমি জগন্নাথ হলে যাবো না। কসমোপলিটন হল ঢাকা হলে থাকব। ভাইস চ্যান্সেলর ড, মাহমুদ হোসেনের সঙ্গে দেখা করলাম। আমি বললাম, স্যার জেলের বাইরে আসলে আমাকে পড়ার অনুমতি দেয়া হয় না। জেলে গেলে অনুমতি পাই। ১৯৪৮ সালে প্রথম জেলে গিয়ে শুরু করেছি এ সংগ্রাম। এখন ১৯৬২ সাল। এ সংগ্রাম শেষ করতে চাই।
ড. হোসেন আমাকে চিনলেন। বললেন, তুমি জেলখানা থেকে পরীক্ষা বর্জন করেছিলে। আমি তোমার জন্যে চেষ্টা করব।
তবে পরের ঘটনা নিম্নরূপ-ভাইস চ্যান্সেলর প্রভোস্টদের বৈঠক ডেকেছিলেন। সকলে আমার বিরুদ্ধে বলেছেন। ভাইস চ্যান্সেলর তখন জগন্নাথ হলের প্রভোস্ট ড. গোবিন্দ দেবকে বললেন–It is my request. ড. দেব বললেন–আপনাকে লিখিত নির্দেশ দিতে হবে। আপনি নির্দেশ দিলে। নির্মলকে ভর্তি হতে দেব । কিন্তু সে কোনোদিন হলে সিট পাবে না। ড. মাহমুদ হোসেন আমাকে জানালেন, চুপচাপ ভর্তি হয়ে যাও। পড়ে পাস করো। হলে সিট পাবার চেষ্টা করো না।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রশ্নে সুরাহা হলেও রাজনৈতিক দিক থেকে গুছিয়ে ওঠা সহজ হলো না। কাজী বারীকে কথা দিয়ে এসেছিলাম যে আমি মুক্তি পাবার এক মাসের মধ্যে তাকে মুক্ত করবো। কাজী বারীকে মুক্ত করেছিলাম। সে ছিল আর এক অধ্যায়। জেলখানায় জেনেছিলাম এসবি’র স্পেশাল সুপারিন্টেনডেন্ট হচ্ছেন জনাব আব্দুর রহিম। তিনি ঢাকার এডিশনাল এসপি থাকাকালীন তাঁর স্ত্রীকে আমি পড়াতাম। জেল থেকে এসে তাঁকে ফোন করলাম। তিনিই চাইছিলেন আমার সঙ্গে কথা বলতে। তাঁর সঙ্গে দেখা হলে তিনি প্রথমেই বললেন, দেখুন আপনি আমাকে বিপদে ফেলেছেন। আমার জন্যে আপনি মুক্তি পেয়েছেন। আপনার তখন মুক্তি পাবার কথা ছিল না। ১৯৬২ সালের ছাত্র আন্দোলনের সব ছাত্র নেতাকে মুক্তি দেয়া হলো। অফিসে গিয়ে দেখি আপনার নামে একটি ফাইল। জানতাম না আপনি জেলে। বাসায় স্ত্রীকে ফোন করলাম। জিজ্ঞাসা করলাম–তোমার স্যার কোথায়? বলল, স্যার জেলে। আমি সকল ইন্সপেক্টরদের ডাকলাম। জিজ্ঞাসা করলাম, সব ছাত্রনেতা মুক্তি পেলে নির্মল সেন কেন পাবে না? কোনো ইন্সপেক্টর আপনার পক্ষে কথা বলল না। আমি বিপদে পড়লাম। তবুও আপনার ফাইলের এক কোনায় লিখলাম If this case can be considered… ফাইল ডিআইজি সাহেবের কাছে পাঠালাম। তিনি অফিসে ডেকে পাঠালেন। বললেন, আমি ভভদ্রলোককে চিনি দীর্ঘদিন ধরে। পূর্বে একবার এর জন্যে তদবির করেছি অনেক বছর আগে। আপনি ঝুঁকি নিলে ছেড়ে দেব। তাই আপনাকে ঢাকায় অন্তরীণ করার শর্তে মুক্তি দেয়া হয়েছিল। আর আপনি জেল গেটেই অন্তরীণ আদেশ অগ্রাহ্য করলেন। এখন বুঝুন আমার অবস্থা।
আমি রহিম সাহেবের কথায় বিস্মিত হলাম। বললাম, ঠিক আছে আপনার কথা মানব। তবে আমার একটি কাজ করে দিতে হবে। কাজটি হচ্ছে এক মাসের মধ্যে ময়মনসিংহের কাজী আব্দুল বারীকে মুক্তি দিতে হবে।
রহিম সাহেব বললেন, অসম্ভব। কাজী বারী দশ ঘা বেত খেয়েছেন। আসলে তাকে মুক্তি দেয়া সহজ নয়। আর বারী সাহেব কমিউনিস্ট পার্টির লোক, আপনি আরএসপি করেন। আপনি কেন তার জন্যে দেন-দরবার করছেন?
আমি বললাম, আমি কোন দল করি তা বড় কথা নয়। বড় কথা হচ্ছে আমি তাকে কথা দিয়েছি। আমার কথা রাখতে হবে। রহিম সাহেব রাজি হলেন। বললেন, তিনি চেষ্টা করবেন। তিনি কথা রেখেছিলেন। কাজী বারী মুক্তি পেয়েছিল। রহিম সাহেব দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আইজি হয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের সচিব হয়েছিলেন।
জেলখানায় দলের তেমন খবর পাইনি। জেল থেকে বেরোবার পর রুহুল আমিন সাহেব খবর পাঠালেন। তিনি রাষ্ট্রেরবাজারে বাসা নিয়েছেন। রায়ের বাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক। আমি জেলে যাবার আগে তিনি মিডফোর্ড হাসপাতালের টিবি ওয়ার্ডে ছিলেন। রাজনীতির ক্ষেত্রে তারা ইতোমধ্যে কিছুটা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তারা ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট এনডিএফ-এর নামে কাজ করছেন। দল অর্থাৎ আরএসপির নামে কাজ কছেন না। তখন এনডিএফ-এর নেতা জনাব নূরুল আমিন, আতাউর রহমান খান, শেখ মুজিবুর রহমান, মাহমুদ আলী প্রমুখ। পাকিস্তানে সংবিধান জারি হবার সঙ্গে সঙ্গে সামরিক শাসন প্রত্যাহার করা হয়েছিল। প্রকাশ্যে রাজনৈতিক দল করার সুবিধা সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু সকল দলের সিদ্ধান্ত হলো কোনো দলকেই পুনরুজ্জীবিত করা হবে না। তবে এ সিদ্ধান্ত বেশি দিন টেকেনি। শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবিত হয়।
