২৮ এপ্রিল জাতীয় পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে নির্বাচিত হন বগুড়ার মোহাম্মদ আলী, সবুর খান, ফজলুল কাদের চৌধুরী প্রমুখ। এঁরা নির্বাচিত হবার পর ছাত্রদের পক্ষ থেকে তাদের কাছে অনুরোধ জানানো হয় সরকারের বিরোধিতা করার। কিন্তু তাঁদের মধ্যে অধিকাংশ আইয়ুব খানকে সহযোগিতা করেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন ময়মনসিংহের মোনায়েম খান এবং চট্টগ্রামের ফজলুল কাদের চৌধুরী।
এসময় উল্লেখযোগ্য ঘটনা হচ্ছে–নয় নেতার বিবৃতি । তারিখ ১৪ জুন। জেলখানায় খেতে বসেছি। সেই সময় সংবাদপত্র এল। সংবাদপত্রে নয় জন নেতার বিবৃতি দেখলাম। এই নয় নেতার মধ্যে ছিলেন আতাউর রহমান খান, হামিদুল হক চৌধুরী, আবু হোসেন সরকার, শেখ মুজিবুর রহমান, ইউসুফ আলী চৌধুরী, মাহমুদ আলী, সৈয়দ আজিজুল হক এবং পীর মহসীন উদ্দিন আহম্মদ।
আমার পাশে খেতে বসেছিলেন ন্যাপের আবদুল হালিম। নয় নেতার বিবৃতি পড়ে তিনি বললেন, এ বিবৃতি নিশ্চয়ই আমাদের নেতারা সমর্থন করবেন। কিন্তু বলে দিতে হবে আমরা কবে কোনদিন এ বিবৃতির প্রতিবাদ করব।
বামপন্থীদের কাছে এটা এক সমস্যা। বামপন্থীরা মিছিল করবে। মার খাবে, জেল খাটবে আর আন্দোলনের সব ফসল চলে যাবে ডানপন্থীদের ভাণ্ডারে। সামরিক শাসন জারি হবার পর প্রকাশ্যে নয় জন নেতা বিবৃতি দিলেন–গণতন্ত্রের দাবিতে। আইয়ুবের সংবিধান বাতিলের দাবিতে। এই বিবৃতিদানকারীদের মধ্যে একজনও বামপন্থী নেতা নেই। অথচ এই আন্দোলন সফল করার দায়িত্ব মুখ্যত বামপন্থী কর্মীদের। নেতারা বলবেন, এ মুহূর্তে জাতীয় স্বার্থে নয় নেতার বিবৃতি সমর্থন করতে হবে। বিবৃতি অনুযায়ী কাজ করতে হবে। তারপর একদিন দেখা যাবে-আন্দোলনের নামে ডানপন্থী নেতারা আখের গুছিয়ে নিয়েছেন। আন্দোলন আপোষ পর্যবসিত হচ্ছে। তখন বামপন্থী নেতারা বলবেন–আমাদের ভুল হয়েছে। কমিউনিস্ট আন্দোলনে এই ভুলের পুনরাবৃত্তি চলছে বছরের পর বছর। এই অভিজ্ঞতা থেকে সরদার আব্দুল হালিম সেদিন প্রশ্ন তুলেছিলেন কবে আমাদের আবার এই নয় নেতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। খুব বেশিদিন গেল না। কিছুদিন পরে সরদার হালিমের বক্তব্যের সত্যতা আমাদের হাড়ে হাড়ে টের পেতে হলো।
এর পরবর্তীকালে ১৯ আগস্ট শহীদ সোহরাওয়ার্দী কারাগার থেকে মুক্তি পেলেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মুক্তি পাওয়ার পরে আন্দোলন নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়। নয় নেতার বিবৃতিতে নতুন সংবিধান প্রণয়নের দাবি ছিল। ছাত্ররা দাবি করেছিল আইয়ুবের সংবিধান বাতিলের। আইয়ুবের সংবিধান বাতিল করতে হলে জঙ্গি আন্দোলন করতে হয়। সে আন্দোলনের রূপ হতে পারে সহিংস। এ সত্যটি বুঝেছিলেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। তিনি নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে বিশ্বাসী। তিনি জেলখানা থেকে মুক্তি পেয়েই বললেন–সংবিধান বাতিল নয়, সংবিধানকে গণতন্ত্রায়ন করতে হবে। অর্থাৎ আন্দোলন করতে হবে নিয়মতান্ত্রিকভাবে। সরদার হালিমের কথাই সত্যি হলো। ডানপন্থী নেতৃত্ব তাদের নিজের কথায় আন্দোলন নিয়ে গেল এবং পুরনো নয় নেতা শহীদ সোহরাওয়ার্দী নেতৃত্বেরই আন্দোলনে শরিক হন। তারাও বললেন, সংবিধান বাতিল নয়। সংবিধানে গণতন্ত্রায়ন করতে হবে।
এবার আমাদের মুক্তি পাবার পালা। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মুক্তি পাবার পর রাজবন্দিদের মুক্তি পাওয়া শুরু হলো। প্রথম দিকে ছাত্ররা চলে গেল। নেতারা আগেই চলে গেছেন। আমাদের অনেকেরই বিশ্বাস, আমাদের অনেকদিন জেলখানায় থাকতে হবে। এবং এর মধ্যে একদিন ভোরের দিকে জেল গেটে আমার ডাক এল। গোয়েন্দা বিভাগের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এসেছিল, কথা কাটাকাটি হয়ে গেল। তিনি বললেন, আপনি মুক্তি পাবেন সবার শেষে।
প্রকৃতপক্ষে আমি মুক্তি পাবার চিন্তা করছিলাম না। বাইরের ছাত্ররা পরীক্ষা না দেয়ায় আবার পরীক্ষার তারিখ সরে গেছে। পরীক্ষার সময় জেলখানায় থাকা আমার পক্ষে ভালো। কারণ ছাড়া পেলে কোথায় যাব জানি না। নিমতলীর হোটেল ডিলাক্স থেকে গ্রেফতার হয়েছিলাম। শুনেছি সে হোটেল বন্ধ হয়ে গেছে। অজয় বাবু ঢাকা হলে কোয়ার্টারে চলে গেছেন। গ্রামের বাড়ির সাথে সম্পর্ক নেই দীর্ঘদিন। কলকাতা থেকে মাঝে মাঝে মায়ের চিঠি পাই। পুরনো এক বন্ধু কলকাতা থেকে একখানা অর্থনীতির বই কিনে পাঠিয়েছে। সে লিখেছে–তুই অর্থনীতির বই দিয়ে কী করবি। লাইব্রেরি থেকে বলেছে এ বই এমএ ক্লাসের পাঠ্য। তুই আমাদের সাথে বিএসসি পড়তি। এ বই দিয়ে কী করবি।
আমার পত্র লেখক বন্ধু বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার। বরিশালে এক সঙ্গে বিএসসি পড়তাম। সে বিএসসি পাস করে শিবপুর থেকে ইঞ্জিনিয়ার হয়েছে। তাকে জানানো হয়নি যে জেল খাটতে খাটতে আর জেল পালাতে পালাতে পড়াশুনা আর হয়নি। জেলখানায় এসেছি বলে শেষ পর্যন্ত বিএ পাস করা হয়েছে। ভাবছি এমএ প্রথম পর্ব জেলখানায় শেষ করতে পারলেই ভালো হতো। কারণ জেলখানা থেকে মুক্তি পেলে কোথায় যাব? কার কাছে যাব? কী করে পড়াশুনা চালাব, তার কোনো হদিস আমার কাছে ছিল না। অথচ ওই দিনই রাত ন’টার দিকে আমাকে জেলগেটে ডেকে পাঠানো হলো। ডেকে পাঠানো হলো মহিউদ্দীন আহমদ এবং নারায়ণগঞ্জের হাসান জামিলকে। এই তিনজনই ১৯৫৯ সালে একই দিনে গ্রেফতার হয়েছিলাম। আমাদের সঙ্গে গ্রেফতার হয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জের শফি খান। তাকে জেলগেটে ডাকা হলো না। আমাদের জেলগেটে নিয়ে বলা হলো, আপনাদের মুক্তির আদেশ এসেছে। আমি বললাম, মুক্তি! এতরাতে আমি কোথায় যাব?
