তখন বিশ্বে ঠাণ্ডা লড়াইয়ের যুগ। একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে পাশ্চাত্যের শিবির। অপরদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক শিবির। মাঝখানে যুগোস্লাভিয়া, ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার নেতৃত্বে নিরপেক্ষ জোট। এই পরিবেশে পাকিস্তানের অবস্থান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ভারত, চীন এবং সোভিয়েত সীমান্তের কাছাকাছি পাকিস্তান। তাই ভৌগোলিক রাজনীতিতে পাকিস্তান ছিল বিশেষ উল্লেখযোগ্য। ঠাণ্ডা লড়াইয়ের যুগে পাকিস্তান ছিল পাশ্চাত্য শিবিরের পক্ষে। প্রেসিডেন্ট হিসেবে আইয়ুব খান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গিয়ে আশ্বাস দিয়েছিলেন, পাকিস্তানই হবে পশ্চিমা শক্তির একমাত্র বন্ধু। তাই পাকিস্তান ছিল পাশ্চাত্য শিবিরের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানের রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অপ্রতিহত প্রভাব ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতে, পূর্ব পাকিস্তান ছিল কমিউনিস্ট প্রভাবিত। তাই পাকিস্তান শাসন করার জন্যে প্রয়োজন একটি শক্তিশালী কেন্দ্র। এছাড়া পাকিস্তানে পাশ্চাত্যের ধরনের গণতন্ত্র অচল। নতুন ধরনের গণতন্ত্র চালু করে ক্ষমতা বজায় রাখা হবে সামরিক প্রকারের লক্ষ্য।
এই লক্ষ্যে ১৯৫৯ সালে সামরিক সরকার দুটি আইন জারি করল। একটি হচ্ছে, নির্বাচনে অযোগ্যতা অধ্যাদেশ, অপরটি মৌলিক গণতন্ত্র। নির্বাচনে অযোগ্যতা অধ্যাদেশ বলে শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেখ মুজিবুর রহমানসহ অসংখ্য রাজনীতিককে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা হলো। আর মৌলিক গণতন্ত্র অধ্যাদেশ বলে ইউনিয়ন বোর্ড ভেঙে নাম করা হলো মৌলিক গণতন্ত্র। সারা পাকিস্তানে আশি হাজার মৌলিক গণতন্ত্রী নির্বাচিত হবে। পূর্ব পাকিস্তানে ৪০ হাজার এবং পশ্চিম পাকিস্তানে ৪০ হাজার। এরা নির্বাচিত হবে ইউনিয়ন বোর্ডের পরিবর্তে মৌলিক গণতন্ত্র সদস্য হিসেবে। সহজে বলা যায় বোর্ডগুলোকে মৌলিক গণতন্ত্রে পরিণত করা হলো। পাকিস্তানের দুই অংশে ৪০ হাজার করে মৌলিক গণতন্ত্রী নির্বাচিত হবে। এরাই প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করবে। এরাই প্রাদেশিক পরিষদ এবং জাতীয় পরিষদ-এর ভোটার হবে। অর্থাৎ সাধারণ মানুষকে সাধারণ পরিষদ এবং জাতীয় পরিষদ নির্বাচন থেকে বঞ্চিত করা হলো। সব নির্বাচনের মালিক হলো এই ৮০ হাজার মৌলিক গণতন্ত্রী। এই ৮০ হাজার মৌলিক গণতন্ত্রীকে কেনা-বেচা খুব কঠিন নয়। এদের ভিত্তিতেই নির্বাচনী এলাকা নির্বাচিত হবে।
১৯৫৯ সালের ডিসেম্বর মাসে মৌলিক গণতন্ত্র নির্বাচন দেয়া হলো। পূর্ব পাকিস্তানে এ নির্বাচনে ৭৮,৮৭৬ জন প্রার্থী ছিল। ১৪টি নির্বাচনী এলাকায় কোনো প্রার্থী ছিল না। দল হিসেবে এ নির্বাচনে কারোরই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ ছিল না। পূর্ব পাকিস্তানের ৪০ হাজার নির্বাচিত প্রার্থীর মধ্যে ৫,৮১০ জন ছিল ব্যবসায়ী, ২,৮০০ জন ছিল রাজনৈতিক কর্মী, ৪৩৪ জন কন্ট্রাক্টর, ২৫৭ জন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারি, ২৯৮ জন আইনজীবী। বাদবাকি সকলেই ছিল কৃষক। এই মৌলিক গণতন্ত্রীদের হা এবং না ভোটে জেনারেল আইয়ুব খান প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
লক্ষণীয় যে, ১৯৫৮ কিংবা ‘৫৯ সালে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন তেমন জোরদার ছিল না। ছাত্ররা তেমন তৎপর ছিল না। এই সুযোগে সামরিক শাসকরা মৌলিক গণতন্ত্রের নির্বাচন দেয় এবং শিক্ষা নিয়ন্ত্রণের জন্যে শরীফ কমিশন নিয়োগ করে ।
১৯৬১ সালের দিকে ছাত্ররা কিছুটা তৎপর হতে শুরু করে ২১ ফেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করে। প্রথম ছাত্রসভা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৬১ সালে ৫ এপ্রিল। প্রতীক ধর্মঘট হয় পশ্চিম পাকিস্তানে ছাত্রদের কারাদণ্ড দেয়ার প্রতিবাদে।
মোটামুটিভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন শুরু হয় শহীদ সোহরাওয়ার্দী গ্রেফতার হবার পর। ৩০ জানুয়ারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী গ্রেফতার হন। ১ ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা মিছিল করে সামরিক আইন ভাঙে। ২ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মঞ্জুর কাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লাঞ্ছিত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেয়া হয়। আমি আগেই বলেছি আমাদের পূর্বে গ্রেফতার হলেও শেখ মুজিবুর রহমানসহ অনেক নেতাই আমাদের আগে মুক্তি পেয়ে যান। শহীদ সোহরাওয়ার্দী গ্রেফতার হবার পর এবার আবার গ্রেফতার হন। গ্রেফতার হয় ১২৮ জন ছাত্র আর ইতোমধ্যে আইয়ুব খাব তার নতুন শাসনতন্ত্র জারি করলেন, যে শাসনতন্ত্র বাতিলের দাবি শেষ পর্যন্ত মুখ্য দাবিতে পরিণত হয়।
মার্চ মাসের পর প্রদেশব্যাপী ছাত্র আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্রদের তিনটি দাবি ছিল–এক, নতুন শাসনতন্ত্র বাতিল, দুই, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, তিন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেখ মুজিবসহ সকল রাজবন্দির মুক্তি।
ছাত্রদের তিন দফা প্রকাশের পর সঙ্কট দেখা দিল নির্বাচন নিয়ে। ইতোমধ্যে আইয়ুব খান ২৮ এপ্রিল জাতীয় সংসদ এবং ৬ মে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন। নির্বাচনের সিদ্ধান্ত ছাত্রদের পক্ষ থেকে বিরোধিতা করা হয়। তারা নির্বাচন বর্জনের ডাক দেয়। কিন্তু সফল হয়নি।
নির্বাচন বর্জন করার জন্যে পূর্ব পাকিস্তানে এক শ্রেণির নেতৃবৃন্দ বিবৃতি প্রদান করেন। এর মধ্যে ছিলেন নূরুল আমিন, আবু হোসেন সরকার, আতাউর রহমান খান, মাহমুদ আলী, পীর মহীউদ্দিন দুদু মিয়া প্রমুখ। কিন্তু তাদের বিবৃতিও কাজে আসেনি।
