জেলের বন্ধুরা কোনো সিদ্ধান্ত দিলেন না। বললেন, এ সিদ্ধান্ত ব্যক্তিগত। কারণ আপনার শিক্ষাঙ্গনের সঙ্গে জড়িত। এতে আমি পড়লাম বিপদে। প্রথম দিনে আমার পরীক্ষা। তাই আমাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমি পরীক্ষা না দিলে অপর দু’জনও পরীক্ষা দেবে না। এমনকি আমার পরীক্ষা দেয়া হয় না। জেলের বাইরে থাকতে পরীক্ষা দেবার সুবিধা হয় না। শেষ পর্যন্ত জেলে এসে বিজ্ঞানের পরিবর্তে কলা নিয়ে বিএ পাস করলাম। এবার জেলেও পরীক্ষা দিতে পারব না। শেষ পর্যন্ত পরীক্ষার হলে গেলাম। গিয়ে বললাম, আমি পরীক্ষা দেবো না। জেল কর্তৃপক্ষ অবাক হলেন। খুশিও হলেন। জেলার সাহেব বিকালে জানালেন, ভাইস চ্যান্সেলর আপনার পরিচয় জানতে চেয়েছেন–তিনি বলেছেন এ ছেলের পরিচয় কী যে, জেলখানায় পরীক্ষা দিতে অস্বীকার করে। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ছিলেন ড. মাহমুদ হোসেন–ভারতের তখনকার রাষ্ট্রপতি ড. জাকির হোসেনের ভাই- যার জন্যে পরবর্তীকালে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পেরেছিলাম।
বাইরে আন্দোলন শুরু হয়েছে। ১ ফেব্রুয়ারি আইয়ুব খানের পূর্ব পাকিস্তানে সফর শুরু করার কথা। গোয়েন্দা রিপোর্ট হচ্ছে ছাত্ররা আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। রাজনীতিকরাও গোপনে বৈঠক শুরু করেছে। এ বৈঠক হচ্ছে বিয়ের দাওয়াতে বা এ ধরনের কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে। এ রিপোর্টের ভিত্তিতেই শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে ৩০ জানুয়ারি গ্রেফতার করা হলো। কারণ তিনিই তখন পাকিস্তানের দু’অংশের মধ্যে একমাত্র গ্রহণযোগ্য নেতা। তিনি ইতোমধ্যে দু’অংশের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন এবং যে কোনো মুহূর্তে তার আলোচনার ওপর ভিত্তি করে নতুন আন্দোলন শুরু হতে পারে। শেষ পর্যন্ত সে আন্দোলন সরকারই শুরু করলেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে গ্রেফতার করে।
বাইরে আন্দোলন শুরু হলে ভেতরে আশা আকাঙ্ক্ষার সৃষ্টি হয়। আন্দোলন দানা বাঁধে, সরকার নরম হয় এবং এক সময় রাজবন্দিদের মুক্তি দিতে শুরু করে। আন্দোলন শুরু হবার পর এমন একটি চিন্তা আমাদের সকলকে পেয়ে বসেছিল। কারণ শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে জেলে রেখে আইয়ুব খানের ক্ষমতায় থাকা যে সম্ভব নয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
কিন্তু জেলখানায় সকলের জীবন সমান যায় না। যাদের পুত্র পরিজন আছে জেল তাদের জন্যে এক দুর্বিসহ জগৎ। যাদের বাইরে থাকা স্ত্রী-পুত্রের অন্নের সংস্থান নেই, তাদের জেলখানায় বিনিদ্র রজনী কাটে। জেলখানা থেকে মুক্তি পাবার চিন্তাও তাদের পাগল করে দেয়। কারণ তারা জানে না জেলখানা হতে বের হয়ে কোন অবস্থায় দেখবে তার অসহায় স্ত্রী-পুত্রকে।
এমনি এক রাজবন্দি ছিলেন প্রখ্যাত রিকশা শ্রমিক নেতা সেলিম। সেলিম সাহেবের কাহিনী আছে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের লেখায়। সেলিম সাহেব আমাদের সঙ্গে দীর্ঘদিন জেলে ছিলেন। তিনি ঢাকাইয়া ভাষায় উপন্যাস এবং ইতিহাস লিখতেন। আমাদের শোনাতেন। আর এক সময় বিষণ্ণ হয়ে যেতেন। কারণ জানতেন না তার স্ত্রী-পুত্র খেয়ে-পরে আছে কিনা।
জেলে আসার প্রথম দিকে সেলিম সাহেবের স্ত্রী জেলগেটে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। তাঁর আসা শুরু হলো বিলম্বিত লয়ে। সেলিম সাহেব চিন্তিত, উদ্বিগ্ন। তাঁর স্ত্রী আর তার সাথে দেখা করতে আসেন না।
এইতো রাজনীতি। এইতো জীবন। আজ যারা পূর্বসূরিদের গালমন্দ করেন, যাঁরা নির্বিপাকে আত্মসমর্পণ করেন, আত্মসমর্পণকে আজকের জগতের একমাত্র রাজনীতি বলে মনে করেন, তাঁরা জানেন না রাজনীতি কাকে বলে, জানেন না আত্মত্যাগ কাকে বলে। তারা সমাজের উচ্ছিষ্ট ভোজন করে প্রাসাদোপম অট্টালিকা নির্মাণ করে মনে করেন সেলিম সাহেবরা ছিল বোকা। কারণ তারা রাজনীতিকে মনে করেছিলেন আদর্শের বাহুল্য। আজকের রাজনীতির বাণিজ্যের যুগে তাঁরা বেমানান।
বাইরে আন্দোলন শুরু হলে সকলের মনে আশার সৃষ্টি হয়, হয়তো মুক্তি পাওয়া যাবে। আমরা সামরিক শাসনের এক বছর পর গ্রেফতার হয়েছিলাম। প্রবীণ রাজনীতিকরাও জানতেন না কবে আমরা মুক্তি পাব। এবার ধারণা হলো বেশি দিন জেলে থাকতে হবে না।
তবে জেল থেকে মুক্তি পাবার দুটি ঐতিহ্য আছে। সাধারণত শেষে যারা গ্রেফতার হয় তারা আগে মুক্তি পায়। আবার দীর্ঘদিন যারা জেলে থাকে তাদের মধ্যে নেতারাই আগে মুক্তি পায়। অনেক সময় সাধারণ সদস্যদের দীর্ঘদিন জেলে কাটাতে হয়। এ অবস্থা দীর্ঘদিন থেকেই চলছে। পাকিস্তানের প্রথম সামরিক শাসনের বিশেষ কিছু চিত্র আছে। ১৯৫৮ সালে ৭ অক্টোবর রাতে সামরিক শাসন জারি হয়। সামরিক সরকারের প্রেসিডেন্ট হলেন ইস্কান্দার মীর্জা। তিনিই প্রথম সামরিক আইন প্রশাসক। প্রধানমন্ত্রী হলেন জেনারেল আইয়ুব খান। এই দুই নেতৃত্ব বেশিদিন টেকেনি। ২৭ অক্টোবর প্রেসিডেন্ট মীর্জা পদচ্যুত হলেন। আইয়ুব খান হলেন প্রেসিডেন্ট।
ইতোমধ্যে গ্রেফতার শুরু হয়ে গেছে। ১৭ অক্টোবরের মধ্যে আব্দুল গাফফার খান, মওলানা ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমানসহ হাজার হাজার নেতা কর্মী গ্রেফতার হলেন। ১৫ অক্টোবর সংবাদপত্রের ওপর সেন্সরশিপ আরোপ করা হয়। সামরিক শাসনের প্রথম দিনে রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীরা আত্মগোপন করেন। কারো সামনে কোনো কর্মসূচি ছিল না। বছর ঘুরতে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আইয়ুব খান ক্ষমতায় এসেছিলেন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে। তিনি প্রধান সেনাপতি থাকাকালে পাকিস্তানের জন্যে একটি সংবিধান প্রণয়ন করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে ১৯৬২ সালে সেই সংবিধানই জারি হয়েছিল। সংবিধান প্রণয়নের জন্যে কমিশন গঠন ছিল একটি লোক দেখানো ব্যাপার।
