এ সময় একদিন গভীর রাতে বড় জমাদার এসে বলল, বাবু আপনাকে সামসুদ্দিন খোঁজ করছে। সামসুদ্দিন ঢাকা হলের বাবুর্চি। আমি ঢাকা হলের ছাত্র ছিলাম। শুনলাম বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পুলিশের সঙ্গে ছাত্রদের সংঘর্ষ হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ছাত্র গ্রেফতার হয়েছে। গ্রেফতার হয়েছে সামসুদ্দিনসহ ঢাকা হলের অনেক কর্মচারী। গভীর রাতে ওদের জেলে আনা হয়েছে। সারাদিন খাওয়া হয়নি। তাই ওরা আমাকে খুঁজছে। আমি বড় জমাদারকে বললাম, বেআইনি কাজ করতে হবে। গুদামের লোক এনে চিনি ডাল বের করতে হবে। নাইট গার্ডদের দিয়ে রান্না করে ওদের রাতেই খাওয়াতে হবে। কীভাবে বড় জমাদার এ কাজটি করেছিল তা আমি জানি না। শুধু জানতাম জেলখানায় রাজবন্দিদের সেকালে একটি বিশেষ মর্যাদা ছিল। সেকালে যারা বিনা বিচারে বন্দি হতাম আমাদের বিরুদ্ধে আজকের অনেক রাজনীতিকদের মধ্যে দুর্নীতির অভিযোগ থাকত না। আজকাল অনেক রাজবন্দি টাকা দিয়ে জেলখানায় সম্মান কেনে। আর আমাদের ছিল ভিন্ন মর্যাদা। জেলখানা কর্তৃপক্ষ এ মর্যাদা আমাদের দিতে কুণ্ঠিত হতেন না।
শুধু ঢাকা হলের কর্মচারী সামসুদ্দিন নয়, জেলে এসেছেন অনেক ছাত্র। ১৯৬২ সালের ৩০ জানুয়ারি করাচিতে শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে গ্রেফতার করা হয়। ৩১ ফেব্রুয়ারি গ্রেফতারের প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ধর্মঘট হয়। ৬ ফেব্রুয়ারি দৈনিক ইত্তেফাঁকের সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন (মানিক মিয়া) আবার গ্রেফতার হন। ৭ ফেব্রুয়ারি গ্রেফতার হন শেখ মুজিবুর রহমান। একই সময় গ্রেফতার হন প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী আবুল মনসুর আহমেদ।
ঢাকা জেল তখন জমজমাট। জেলখানার বিভিন্ন এলাকায় সকলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। শেখ সাহেব ঢাকা জেলেই আছেন। আমাদের ওয়ার্ড থেকে সকালের খাবার যায়। আমাদের ম্যানেজার জহিরুল ইসলাম তখন সারাদিন ব্যস্ত। ছাত্রদের মধ্যে তখন অনেকে জেলে এসেছে। অনেকের নাম আমার স্মরণ নেই। স্মরণ আছে রাশেদ খান মেনন ও হায়দার আকবর খান রনোর কথা। মনে আছে ঢাকা হলের দিলীপ দত্তের কথা। মনে আছে রায়েরবাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র কাজী হাতেম আলীর কথা। কাজী হাতেম আলী ছিল আমাদের দলের অন্যতম নেতা মরহুম রুহুল আমিন কায়সারের প্রিয় ছাত্র । রুহুল আমিন কায়সার তখন রায়েরবাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। আন্দোলনে অসংখ্য স্কুলের ছাত্র গ্রেফতার হয়েছিল। তাদের মুক্ত করার জন্যে রুহুল আমিন সাহেব সকল শিক্ষকদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করেছিলেন। সেই শিক্ষকরা ছাত্রদের পক্ষে আদালতে মামলা জুড়েছিল। ফলে ছাত্ররা কারাগার থেকে মুক্তি পায়।
জেলখানায় তখন রটে গেল শেখ সাহেব নাকি আগরতলায় গিয়েছিলেন। তিনি নাকি সেখানে ভারত সরকারের সাথে আলাপ করেছেন। জেলখানায় শেখ সাহেবের কাছাকাছি ছিলাম না। তাই এ ব্যাপারে কোনো আলাপই হয়নি। পরবর্তীকালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা শুরু হলে মনে হয়েছিল সে খবরের কিছুটা হলেও সত্যতা ছিল।
এ সময় একদিন একটি ঘটনা ঘটল জেল গেটে। আমাকে জিজ্ঞাসা করার জন্যে গোয়েন্দা বাহিনীর এক লোক এসেছেন। তিনি আমার সঙ্গে আলাপ করেছিলেন জেল অফিসে। ঐ সময় অসংখ্য ছাত্র জেলে থাকায় তাদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্যে সামরিক ও বেসামরিক গোয়েন্দা প্রতিনিধি জেল অফিসে আসত। সেদিনও এসেছিল। সেদিন একজন সামরিক বাহিনীর অফিসার একজন ছাত্রকে জিজ্ঞাসাবাদ করছিল। ছাত্রটিকে আমি চিনতাম। তার ডাক নাম হিরু। এক সময় শুনলাম সামরিক বাহিনীর ঐ অফিসার হিরুকে ধমকাচ্ছে। বলছে, সত্যি কথা না বললে ১৪ বছর সাজা হবে। আমি বললাম, আপনি সাজা দেয়ার কে। ভভদ্রলোক এবার আমার ওপর চটে গেলেন। বললেন, আপনি কে? কেমন কথা বলছেন। আমি বললাম, আমি রাজনীতি করি আর আপনি সরকারের বেতনভুক্ত কর্মচারি। সাজা দিতে পারে আদালত। আপনি নন। আপনাকে বারণ করছি, আপনি ওকে ধমকাবেন না।
এবার আমার সাক্ষাৎ গ্রহণকারী গোয়েন্দা একটু ভড়কে গেলেন। তিনি বললেন, আপনি কথা বলছেন কেন? আমি আপনার সঙ্গে আর কথা বলবো না। আমি ওয়ার্ডে ফিরে যাব। আমি ডেপুটি জেলারকে বললাম আমাকে ওয়ার্ডে নিয়ে আসুন।
সন্ধ্যার দিকে ডেপুটি জেলার এলেন। বললেন, আপনাকে নিয়ে বিপদ হয়েছে। আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ হয়েছে। নির্দেশ হয়েছে আপনাকে অন্য
জেলে পাঠাবার। আমরা জানিয়েছি, উনি ছাত্র তাই অন্য জেলে পাঠানো যাবে না। তিনবার নির্দেশ এসেছে আপনাকে ছাত্রদের থেকে দূরে অন্য কোনো সেলে রাখবার। আমরা বলেছি, ঢাকা জেলের সব সেলে ছাত্ররা আছে। সুতরাং তাকে জেলে পাঠানো যাবে না। অর্থাৎ আমি ওয়ার্ডেই থেকে গেলাম। আমাকে বদলি করা গেল না।
কিন্তু সমস্যা দেখা দিল অন্য ক্ষেত্রে। বাইরে ছাত্র আন্দোলন। ছাত্ররা দাবি করেছে পরীক্ষার তারিখ পিছাবার। তারা নির্ধারিত দিনে পরীক্ষা দেবে না। ঢাকা জেলে আমরা তিনজন পরীক্ষার্থী। আমি অর্থনীতি এমএ প্রথম পর্বে। আমরা জেলখানার কমিটির কাছে সিদ্ধান্ত চাইলাম। বললাম, আপনারা সিদ্ধান্ত দিন আমরা পরীক্ষা দেব কিনা। বাইরে ছাত্ররা আমাদের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন করেছে। তারা পরীক্ষা দিচ্ছে না। তাই আমাদের পরীক্ষা দেয়া কি ঠিক হবে?
