জেলখানায় আরএম সাঈদ ও হাবিবুর রহমানের সঙ্গে আমি এক ওয়ার্ডে ছিলাম। হাবিবুর রহমানকে আমি পড়াতাম। তাদের কথা কতটুকু সত্য জানি না। তারা বলেছিলেন, ভারত-পাকিস্তান এক করার জন্যে তারা নয়াদিল্লিতে নেহেরুর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। নেহেরু তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাত করেননি। তাদের পাঠিয়েছিলেন লালবাহাদুর শাস্ত্রীর কাছে। লালবাহাদুর শাস্ত্রী তাদের পাঠিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেস নেতা কালাচরণ ঘোষের কাছে? এর বেশি কিছু তাঁদের কাছে জানতে পারিনি। তাঁদের নাকি পাঠিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা মরহুম আবুল মনসুর আহমেদ। আজকে যারা স্বাধীনতার অবিকৃত ইতিহাস লিখতে চান, জানি না তারা এ ঘটনা জানেন কিনা।
আইয়ুব খানের আমলে জেলখানায় অনেক বাহিনী ছিল। জেলখানায় তখন তর্ক বিতর্কের শেষ ছিল না। তবে এ তর্ক-বিতর্কের মধ্যেও একজন হাসিমুখী মানুষ ছিলেন। তিনি নরসিংদীর আবুল হাশিম মিয়া। তিনি আমাদের সঙ্গে একই দিনে গ্রেফতার হয়েছিলেন। জেলখানায় ঢুকতেই তিনি গল্প করলেন–ভাই আমি গণতন্ত্রের কথা বলেছি। আমাকে গ্রেফতার করা একান্তই অন্যায় হয়েছে। হাশিম সাহেবের কাহিনী হচ্ছে, সামরিক শাসন জারি হবার পর কর্নেল ভাট্টি নরসিংদীতে আসেন। তিনি সকল রাজনৈতিক দলকে নিয়ে এক আলোচনা সভা করেন। ঐ আলোচনা সভায় ন্যাপের পক্ষ থেকে বক্তা হিসেবে ছিলেন হাশিম সাহেব। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন–সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলের গণতান্ত্রিক অধিকার আছে। পাকিস্তান গণতন্ত্রের দেশ। এক সময় মুসলিম লীগ ক্ষমতায় ছিল। রিপাবলিকান পার্টি ক্ষমতায় ছিল। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল। এবার সামরিক বাহিনী ক্ষমতায় এসেছে। সামরিক বাহিনী ক্ষমতা থেকে চলে গেলে অন্য কোনো দল ক্ষমতায় আসবে, এটাই গণতন্ত্রের নিয়ম।
মনে হয় কর্নেল ভাট্টি হাশিম সাহেবের এ গণতন্ত্রের ভাষণ হজম করতে পারেননি। তাই তাঁকে জেলে পাঠিয়েছেন আমাদের গণতন্ত্রের চর্চা অব্যাহত রাখার জন্যে। কারণ জেলখানায় আলাপ আলোচনায় কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না। সে ব্যাপারে জেলখানায় একেবারেই অবাধ স্বাধীনতা।
একটি ব্যাপারে হাশিম সাহেবের কথা এখনও মনে পড়ে। তিনি ঢাকা জেলা ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক। ঢাকা জেলা ন্যাপের সম্মেলন হচ্ছে ঢাকা শহরে। সম্মেলন শেষে প্রস্তাব পাঠ শুরু হয়েছে। প্রস্তাব পাঠের প্রথম প্রস্তাব হচ্ছে-বিশ্বশান্তি সম্পর্কে। এই প্রস্তাব উত্থাপিত হলো, হাশিম সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, ভাইসব, আগেই বিশ্ব শান্তির প্রস্তাব তুললেন। আগে দেশের কথা বলা ভালো নয় কি? এ রাজনীতি দেশের মানুষ গ্রহণ করবে কি?
বিভিন্ন প্রসঙ্গে হাশিম সাহেব এ ধরনের কথা বলতেন। আমরা চুপচাপ শুনতাম। হালকা হতাম। হাসতাম। সে হাশিমকে একদিন হঠাৎ ঢাকা জেল থেকে বদলি করে দেয়া হলো। মনটা খারাপ হয়ে গেলো।
কিছুদিন পরে গোয়েন্দা বিভাগের এক ভভদ্রলোক এলেন আমার সঙ্গে দেখা করতে। তাঁর প্রশ্ন ছিল এক রাতে ঢাকা হলে ময়মনসিংহের কাজী বারী আপনার কক্ষে এসেছিলেন। আপনি সে রাতে হলে আসেননি কেন? অথচ কাজী বারী আমার কক্ষে গিয়েছিল এ কথা আমি প্রথম শুনলাম।
কে এই কাজী বারী? কেন সে আমার টাকা হলের রুমে গিয়েছিল? কাজী বারী কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য। প্রকাশ্যে ন্যাপ নেতা। এককালে এক সঙ্গে আমরা পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ করেছি। কাজী বারী ছিলেন ছাত্রলীগের ময়মনসিংহ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক। আমরা এক সঙ্গে ১৯৫৭ সালে ছাত্রলীগ থেকে পদত্যাগ করি।
১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি হবার পর আমার কাজী বারীর সঙ্গে দেখা হয়নি। তাই জানতাম না কেন কাজী বারী সেদিন আমার কক্ষে এসেছিল। গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তা বিশ্বাস করতে চাইলেন না যে কাজী বারী সম্পর্কে আমি কিছু জানি না বা সে দিনের ঘটনা সম্পর্কে আমি কিছু জানতাম না। অবিশ্বাস নিয়েই গোয়েন্দা কর্মকর্তা আমার কাছ থেকে বিদায় নিলেন।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাজী বারীর সঙ্গে আমার ঢাকা জেলে দেখা হলো। জেলে তখন বন্দির সংখ্যা বেড়েছে। ঢাকার রিকশা শ্রমিক নেতা সেলিম, ন্যাপের গোলাম মোস্তফা, কমিউনিস্ট পার্টির মৃণাল বাড়ুরী, ন্যাপের সর্দার হালিম, পীর হাবিবুর রহমান, তারা মিয়া, রংপুরের মোহাম্মদ আফজালসহ অনেকে। বাইরের জগতে সামরিক শাসকদের ভয় বাড়ছে। আর একের পর এক গ্রেফতার হচ্ছে। শহীদুল্লাহ কায়সারের সাজা হয়ে গেছে। তিনি চলে গেছেন সাত নম্বর সেলে। আমাদের সরিয়ে আনা হয়েছে দু’নম্বর ওয়ার্ডে। এখানে টেবিল টেনিস এবং ভলিবল খেলার ব্যবস্থা আছে। এই ওয়ার্ডে একদিন কাজী বারীকে জিজ্ঞাসা করলাম, আমার কক্ষে কেন গিয়েছিলেন? কাজী বারী তার স্বভাবসিদ্ধ ময়মনসিংহের ভাষায় বললেন–কি আর কমু আপনারে পাইলাম না, তাই শুইয়া থাকলাম।
সামরিক শাসন আমলে কাজী বারীর সাজা হয়েছিল দশ ঘা বেত। ঢাকা জেলে কাজী বারীকে বেত্রাঘাত করা হয়। সেদিনের ঘটনা এখনো আমাকে উদ্বেলিত করে। কাজী বারীকে রাজনৈতিক অপবাদে সামরিক শাসক যে এভাবে মারবে আমরা তো কিছুতেই ভাবতে পারি না। ১৯৪৮-৪৯-৫০ সালের জেল হলে জেলখানায় তুলকালাম কাণ্ড ঘটে যেত।
কাজী বারী বেত খাওয়ার পর অসুস্থ হয়ে পড়েন। বহুমূত্র তাকে আচ্ছন্ন করে। কাজী বারী এমনিতে কানে কম শুনতেন। এবার যেন একবারে বধির হয়ে যান। জেলখানায় থাকতে থাকতে কাজী বারীর সঙ্গে সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ হয়। আমি তাকে আশ্বাস দিই, যদি আমি তাঁর আগে জেলখানা হতে মুক্ত হই তাহলে আমার মুক্তির এক মাসের মধ্যে আমি তাকে মুক্ত করবই। সে কথা আমি রক্ষা করেছিলাম। সে কাহিনী পরে বলব। অথচ রাজনীতির দিক থেকে আমরা দুই মেরুতে। কাজী বারী কট্টর স্টালিনপন্থী। আর আমিও কট্টর স্টালিনবিরোধী-লেনিনবাদী। কাজী বারী কমিউনিস্ট পার্টির লোক। আমি বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী দলের লোক। কাজী বারীকে মুক্ত করতে গেলে পুলিশ প্রশাসনও অবাক হয়েছে। কমিউনিস্ট পার্টি বা ন্যাপের কেউ নয়, কাজী বারীকে মুক্ত করবে আরএসপির নির্মল সেন।
