সামরিক শাসন জারি হয়েছে ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর। আমরা গ্রেফতার হয়েছিলাম ১৯৫৯ সালের ২৪ অক্টোবর। ১৯৬১ সালে ঢাকা জেল থেকে শেষ পর্যন্ত ডিগ্রি পাস করি। এটাই আমার ছিল সবচেয়ে বড় পাওয়া।
প্রথম থেকেই সামরিক শাসনকে মানুষ অভিনন্দন জানিয়েছিল। সামরিক শাসন জারি হওয়ার পর এক বছর বাইরে ছিলাম। এই এক বছরের সামরিক শাসনের বহুরূপ দেখেছি। সামরিক শাসন জারি হলে অসংখ্য আইন প্রণীত হয়। দেয়াল পরিষ্কার থেকে মাঠ পরিষ্কার রাখা পর্যন্ত সবকিছুকেই আইনের আওতায় নেয়া হয়। ঘোষণা করা হয় দরে বিধান। প্রায় সব অপরাধের জন্যে নিম্নতম দণ্ড ছিল চৌদ্দ বছর। এমনকি ইশারায় ক্ষতিকারক কথা বলা ছিল দণ্ডনীয়। আমরা বলতাম। সব অপরাধেই নিম্নতম দণ্ড হচ্ছে মৃত্যুদণ্ড।
আইয়ুব খানের সামরিক শাসনামলে ‘ক’ অক্ষরটির বড় বিপদ ছিল। ‘ক’ হচ্ছে কেরানি, কনস্টেবল এবং কুকুর। তখন কেরানিদের মাথাওঁজে কাজ করতে হতো, কনস্টেবলদের ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। বেওয়ারিশ কুকুরগুলো মেরে ফেলা হতো। সামরিক শাসকেরা ক্ষমতায় এসে জনপ্রিয় হবার চেষ্টা করত। তারা দুর্নীতি ও মজুদদারের বিরুদ্ধে কড়া কথা বলত। মজুদদারেরা ভয় পেত। তাই মজুদ মাল বাজারে ছেড়ে দিত। প্রথম দিকে সব পণ্যই সস্তা হয়ে যেত। ফলে মানুষ কিছুটা খুশি হতো। দু’একজন দুর্নীতিবাজকে দৃষ্টান্তমূলক সাজা দিত। সামরিক শাসকরা জানত তাদের গণভিত্তি নেই। তাই কিছু চমকপ্রদ কাজ করার চেষ্টা করত। আইয়ুব খানের সামরিক শাসনামলে পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে রাস্তায় হাঁটা যেত না। সেনাবাহিনীর লোক রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকত। তখন থেকেই শুরু হয় সিনেমায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন। সিনেমায় জাতীয় পতাকা দেখাবার সময় কেউ বসে থাকলে তার শাস্তি পেতে হতো। আইয়ুব খান তার অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপ জায়েজ করার জন্যে সিনেমায় জাতীয় পতাকা দেখিয়ে পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটাতে চেয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো কৌশলই কাজে আসেনি। প্রতিবারই সামরিক আইন জারি হবার পর এ ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এরশাদের আমলে সামরিক শাসন জারি হবার পর সেনাবাহিনীর সদস্যরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছেলেদের বড় চুল কেটে দিয়েছে। অনাবৃত উদরের মহিলাদের উদরে আলকাতরা মাখিয়ে দিয়েছে।
আইয়ুব খান আমলে প্রথম দু’বছর এ ধরনের অনেক ভচিক্কি করা হয়েছে। কাজে আসেনি। আইয়ুব খান বিখ্যাত হয়েছিলেন কমিটি গঠনের জন্যে। সব ব্যাপারেই তিনি একটি কমিটি গঠন করতেন। এসব কমিটির রিপোর্ট কোনোদিনই বের হতো না। সে ঐতিহ্য এখনো অটুট।
আইয়ুব খানের আমলে উল্লেখ্যযোগ্য ঘটনা হচ্ছে, ভারতের সিন্ধুনদের পানি চুক্তি। ১৯৬০ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু ও পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট এই চুক্তি স্বাক্ষর করেন।
লক্ষণীয়, এই চুক্তির ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সিন্ধু নদের পানি বণ্টনের ব্যবস্থা হয়। অথচ সেকালে গঙ্গার পানি বণ্টনের কোনো ব্যবস্থাই গৃহীত হয়নি।
আইয়ুব খানের আমলে অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে–পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতির পরিবর্তন। পাকিস্তান সম্রাজ্যবাদী যুদ্ধজোটে থাকলেও ১৯৬১ সালের ৩ এপ্রিল সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে তেল অনুসন্ধান চুক্তি স্বাক্ষর করে। তবে এর একটি ভিন্ন পটভূমি ছিল। পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি হবার সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার। তখন বিমানঘাঁটি থেকে বিমান সোভিয়েত ইউনিয়নের আকাশে উড়ে যায়। সোভিয়েত সামরিক বাহিনী বিমানটি ধ্বংস করে। সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী নিকিতা ক্রুশ্চেভ সুস্পষ্ট ভাষায় প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানকে জানিয়ে দেন যে, এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটিকে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে দেয়া হবে। অপরদিকে ১৯৬০ সালে নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী জন এফ কেনেডি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ডেমোক্রেটিক পার্টি ঐতিহ্যগতভাবে ভারতের সমর্থক। এই পরিপ্রেক্ষিতেই পররাষ্ট্রনীতি ঢেলে সাজাবার চেষ্টা করতে হয়। এই পররাষ্ট্রনীতি ঢেলে সাজাতে গিয়ে তাকে বিশেষ করে সতর্ক হতে হয়।
ইতোমধ্যে পাকিস্তানের রাজনীতিতে বিরোধীদলীয় তৎপরতা শুরু হয়। শহীদ সোহরাওয়ার্দী কিছুটা তৎপর হতে থাকেন এবং নতুন করে ছাত্র আন্দোলন সংগঠিত হতে থাকে। এ সময় জেলখানায় একটি ভিন্ন ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হই।
জেলের বাইরে থাকতে শুনেছিলাম ভারত-পাকিস্তান এক করার চেষ্টা হচ্ছে। নাগাল্যান্ডে স্বাধীনতা আন্দোলনে পাকিস্তান নাকি সহায়তা করছে। ঢাকা জেলে এই দুটি ব্যাপারেই আমার ভিন্ন অভিজ্ঞতা হলো। পরস্পর জানতে পারলাম নাগাল্যান্ড বাহিনীর প্রধান সেনাপতি (সিএনসি) ঢাকা জেলের ২০ নম্বর সেলে আছেন। তাকে নাকি জেলখানায় রেখেই আলোচনা করা হচ্ছে। পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থান সম্পর্কে ভারত সরকার প্রতিবাদ জানালে তাঁকে নাকি গ্রেফতার করে জেলে রাখা হয়।
জেলখানায় আমার তিন রাজবন্দির সঙ্গে দেখা হয়। তারা বৃহত্তর ময়মনসিংহের অধিবাসী। এই তিনজন হচ্ছেন আবদুর রহমান সিদ্দিকী, হাবিবুর রহমান এবং আরএম সাঈদ। দেশ স্বাধীন হবার পর আরএম সাঈদের সঙ্গে আমার একবার দেখা হয়েছিল। শুনেছি গফরগাঁওয়ের আরএম সাঈদ রক্ষী বাহিনীর গুলিতে মারা গেছেন।
