আমি ওয়ার্ডে ফিরে এলাম। ভাবলাম কী করা যায়। কিন্তু আমাকে ভাববার অবসর দেয়া হলো না। ইতোমধ্যে আনোয়ার জাহিদ ও জহিরুল ইসলাম গ্রেফতার হয়ে আমার ওয়ার্ডেই এল। সেদিন আমার সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতেই আনোয়ার জাহিদ জিজ্ঞাসা করেছিল, আপনি কামরুন্নাহার লাইলীকে চেনেন কিনা। আমি একটু অবাক হয়েছিলাম। লাইলী ছাত্র ইউনিয়নের নেত্রী। প্রায় সর্বজন-পরিচিত। মিছিলের আগে থাকে। আমি ছাত্রলীগ করলেও আমার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক ছিল। এই একটি মেয়েকেই আমার রাজনীতির মেয়ে বলে মনে হতো। জাহিদের প্রশ্নের জবাবে আমি বললাম, লাইলীকে আমি ভালোভাবে চিনি এবং মনে করি ঐ একটি মাত্র মেয়েই আমার দেশের রাজনীতি করছে। আমি তখনও জানতাম না লাইলীর সঙ্গে আনোয়ার জাহিদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে এবং শেষ পর্যন্ত ঢাকা জেলের গেটেই লাইলী ও জাহিদের বিয়ে হয়েছিল। সে বিয়েতে কেউ বাসর ঘরে যায়নি। লাইলী ফিরে গিয়েছিল তার গোপীবাগের বাসায়। আর জাহিদ ফিরে গিয়েছিল আমাদের ওয়ার্ডে।
জাহিদ ও জহির জেলখানায় আসায় আমার খুব সুবিধা হলো। এছাড়া জেলখানায় ছিল তখন আলী আকসাদ, বগুড়ার ছাত্র ইউনিয়নের নেতা ছদর উদ্দীন আহম্মদ। অন্যান্যের মধ্যে ছিলেন মহিউদ্দীন আহম্মদ, ময়মনসিংহের বতুরায় চৌধুরী, বরিশালের হিরণ ভট্টাচার্যসহ আরো অনেকে।
ইতোমধ্যে আবদুস সামাদ সাহেব জেলখানায় এলেন (যিনি পরবর্তী সময়ে আবদুস সামাদ আজাদ নামে পরিচিত হন)। তিনি আসার পর জেলখানার রাজনীতির আবহাওয়া পাল্টে গেল। প্রশ্ন দেখা দিল জেলখানার নেতৃত্ব নিয়ে। জেলখানায় আমাদের প্রতিনিধি হবেন জনাব মহিউদ্দীন আহম্মদ। বিভিন্ন সিদ্ধান্ত দেবার জন্যে ছিল একটি ছোট কমিটি। এ কমিটিতে চার পাঁচ জন সদস্য থাকত। সামাদ সাহেব আসায় প্রশ্ন দেখা দিল মহিউদ্দীন সাহেব না সামাদ সাহেব প্রতিনিধিত্ব করবেন।
ঘটনাটি আমার কাছে চমকপ্রদ মনে হলো। জেলখানায় আমি এ ধরনের রাজনীতির সঙ্গে পরিচিত নই। কে নেতা থাকল না থাকল সে প্রশ্ন আমার কাছে মুখ্য নয়। জেলখানায় মোটামুটি ভালো থাকবার জন্যে আমাদের একজন প্রতিনিধি নির্বাচন করতে হয়, এর বেশি নয়।
তবুও দেখলাম সবকিছু পাল্টে যাচ্ছে। জেলখানায় প্রশ্ন উঠলো, কোন ভিত্তিতে কমিটি গঠন করা হয়েছে, প্রতিনিধি নির্বাচন করা হয়েছে, এ কমিটি বা প্রতিনিধির মেয়াদকাল কত। বলা হলো সবকিছু গঠনতন্ত্র মাফিক করা হয়েছে কিনা।
আমার হাসি পেল। দেশে সামরিক শাসন, সংসদ নেই, সংবিধান নেই। আর জেলখানায় আমরা বিতর্ক করছি গঠনতন্ত্রের। তবে আমরা শেষ রক্ষা করতে পারলাম না। আলোচনা করে সিদ্ধান্ত হলো, নতুন কমিটি এবং নতুন প্রতিনিধি নির্বাচন করতে হবে। অনির্দিষ্টকালের জন্যে কোনো কমিটি বা প্রতিনিধি থাকতে পারবে না।
এবার আমি, জহির, আনোয়ার জাহিদ এবং আলী আকসাদ ভিন্ন। আলোচনা করলাম। আমরা জানতাম আমাদের ওয়ার্ডের রাজবন্দিরা এক সঙ্গে বৈঠক করবে এবং নিশ্চয়ই নতুন কমিটির নাম প্রস্তাব করবে। আজ ঐ কমিটিতে আমাদের কোনো একজনের নাম থাকবেই। তখন আমরা নাম প্রত্যাহার করব। ফলে অচল অবস্থার সৃষ্টি হবে। তখনি আনোয়ার জাহিদ একটি বক্তৃতা দেবে এবং তারপরেই আমি নতুন প্রস্তাব তুলব। ঘটনা তেমনই ঘটল। কমরেড বতুরায় চৌধুরী সভাপতির আসন গ্রহণ করলেন। তিনি অন্ধ। একের পর এক প্রস্তাব এল। সব প্রস্তাবেই আমার কিংবা জাহিদের নাম থাকত। আমরা দাঁড়িয়ে নাম প্রত্যাহার করতাম। ফলে অচল অবস্থার সৃষ্টি হলো। এবার জাহিদ উঠে একটি ছোট বক্তৃতা দিল। আমি উঠে একটি প্রস্তাব দিলাম। আমি বললাম, আমি যে প্রস্তাব করব সে প্রস্তাবের কোনো সংশোধন হবে না। সংযোজন যা বিয়োজন হবে না। আমার প্রস্তাব পুরোপুরি মেনে নিতে হবে। আলী আকসাদ, আনোয়ার জাহিদ, জহিরুল ইসলাম আমার প্রস্তাব সমর্থন করল। ময়মনসিংহের কাজী আব্দুল বারীও আমার প্রস্তাব সমর্থন জানাল। আমার প্রস্তাব ছিল এই বৈঠকে সাতজনকে নিয়ে একটি কমিটি হবে। এই কমিটির বৈঠক বসবে। কমিটিতে নতুন সদস্য নিতে হলে এই কমিটির কাউকে পদত্যাগ করতে হবে। এই কমিটিই প্রতিনিধি নির্বাচন করবে। আমার প্রস্তাব গৃহীত হলো। ঐ কমিটিতে মহিউদ্দীন আহম্মদ এবং আবদুস সামাদ আজাদ দুজনই ছিলেন। ঐ কমিটি মহিউদ্দিন আহম্মদকেই আবার প্রতিনিধি নির্বাচন করল। আমাদের কাছে এক দুঃসহ প্রহরের অবসান হলো।
যারা জেলে যায়নি তারা এ পরিস্থিতি বুঝতে পারবে না। জেলখানা সীমাবদ্ধ এলাকা। বন্দির সংখ্যাও সীমিত। সেখানে দলাদলি ও কোন্দল থাকলে পরিবেশ বিষাক্ত হয়। স্বাভাবিক জীবন যাপন করা যায় না। এরকম ঘটনা এ উপমহাদেশে বারবার ঘটেছে। জেলখানায় দল ভেঙেছে। দল গড়েছে। এক দল অন্য দলের মুখ দেখাদেখি করেনি। অগ্নিযুগের বিপ্লবী সংগঠন অনুশীলন ভেঙে যুগান্তর হয়েছে। বিপ্লবী দল ভেঙে নতুন গ্রুপ হয়েছে। বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স (বি.বি) ঢাকার শ্রীসংঘ। এমনি করে অসংখ্য বিপ্লবী গ্রুপ গড়ে উঠেছিল। তাদের তাত্ত্বিক অনুশীলন হয়েছিল জেলখানায়। জেলখানায় সিদ্ধান্ত নিয়ে অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের একটি অংশ কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেয়। অপর একটি অংশ কংগ্রেস, সমাজতন্ত্রী দল সিএসপিতে যোগ দেয়। পরবর্তীতে বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী দল আরএসপি গঠন করে। কেউ গঠন করে আরসিপি (বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি)। জেলখানার কমরেডদের সিদ্ধান্তের ফলে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় জনযুদ্ধ তত্ত্ব গ্রহণ করে। জেলখানার এ তাত্ত্বিক বিতর্ক সর্বকালে ছিল এবং অনিচ্ছা সত্বেও মেনে নিতে হয়েছে। কিন্তু সে কালের সঙ্গে এ কালের অনেক তফাৎ। আমরা সে দিন তর্ক করছিলাম জেলখানার নেতৃত্ব নিয়ে। তার সঙ্গে দেশের রাজনীতির কোনো সম্পর্ক ছিল না।
