জেলগেটে ঢুকতেই জেলার সাহেবের সাথে দেখা। তিনি যেন ভূত দেখছেন। বললাম, জেলার সাহেব, আজ ১৯ জানুয়ারি শনিবার। আমার কথা রেখেছি। সাতদিন পরেই ঢাকা জেলে ফিরেছি। জেলার সাহেব বললেন, আপনার জন্যে আমার চাকরির খাতায় প্রথম কালো দাগ পড়ল। নিরাপত্তা রক্ষীদের ওয়ার্ডের জমাদার নজির আহমদ বললেন, চলুন আপনাকে ওয়ার্ডে দিয়ে আসি।
দেশের রাজনীতিতে তখন এক ভিন্ন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। ১৯৫৯ সালের ডিসেম্বর মাসে সারাদেশে ইউনিয়ন পর্যায়ে নির্বাচন হয়েছে। ১৯৬০ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি আইয়ুব খান আস্থা ভোট গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ পাকিস্তানে চালু হয়েছে সেই অভিনব ‘হ্যাঁ’ বা ‘না ভোটের প্রক্রিয়া। এ অভিনব পদ্ধতিতে সমর্থন আদায়ের প্রক্রিয়া ভালোভাবে ব্যবহার করেছেন জিয়াউর রহমান। তিনি সংবিধান সংশোধন করেছেন, এই হ্যাঁ/না ভোট অনুষ্ঠান করে। এই ভোটে কোনোদিন কেউ অংশগ্রহণ করে না। আর সরকার পক্ষও কোনোদিন পরাজিত হয় না। লক্ষ কোটি ভোটে জয়লাভ করেন ক্ষমতাসীনরা।
শুধু তাই নয়, প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ক্ষমতায় এসে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান চালান। রাজনীতিকদের কোণঠাসা করার জন্যে পাবলিক অফিস ডিসকোয়ালিশন অর্ডিন্যান্স জারি করলেন। এ অর্ডিন্যান্স বলে কেউ দোষী সাব্যস্ত হলে ১৯৬৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কেউ কোনো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে না। জনাব শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আতাউর রহমান, আবু হোসেন সরকারসহ অসংখ্য রাজনীতিকের বিরুদ্ধে এ আইনে মামলা দায়ের করা হয়। শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং আবু হোসেন সরকার অপরাধ অস্বীকার করলেও তাদের ১৯৬৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কোনো নির্বাচনে দাঁড়াবার অধিকার বাতিল করা হয়। মরহুম আতাউর রহমান মামলায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করে ১৯৬৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কোনো নির্বাচনে না দাঁড়াবার মুচলেকা দিয়ে রেহাই পান।
সারাদেশে অত্যাচারের স্টিম রোলার চালানো হয়। সীমান্ত প্রদেশে তিন হাজার নেতা কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। রাজবন্দিদের কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। কোয়েটায় বন্দি শিবিরে ৪শ বেলুচিকে অর্ধনগ্ন অবস্থায় পায়ে দড়ি বেঁধে টান দিয়ে রাখা হয়। সিন্ধু প্রদেশের হায়দারাবাদে ৭ জন ফাঁসি দেয়া হয়। কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ন্যাপের দফতর সম্পাদক হাসান নাসির ১৯৬০ সালে ১৩ নভেম্বর নির্যাতনের ফলে লাহোর জেলে মৃত্যুবরণ করেন। এ পরিস্থিতিতে আমাকে ঢাকা জেল থেকে রাজশাহী জেলে পাঠানো হয়েছিল। আমি ঢাকা জেলে ফিরে এলাম। ১৭ এপ্রিল আমার পরীক্ষা। কিন্তু বই কোথায়? কে দেবে?
১৯৬১ সালে জানুয়ারিতে ঢাকা ফিরে এলাম মাত্র ৭ দিন পর। সতেরো এপ্রিল আমার বিএ পরীক্ষা। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চূড়ান্ত অনুমতি তখনও আসেনি। বাইরে থেকে আমার টাকা জমা দেয়া হয়েছিল। জেলখানা থেকে পরীক্ষার ফর্ম পূরণ করেছিলাম। কিন্তু পরীক্ষা দিতে পারছি কিনা সে সিদ্ধান্ত আমাকে জানানো হলো না।
এদিকে ইংরেজি, বাংলার কোনো বই নেই বললেই চলে। দর্শনের বই আছে। অর্থনীতির প্রাথমিক জ্ঞান পাবার মতো বইও আছে। পাঠ্য তালিকার দুটি বই আমার পড়া হয়েছিল। বিশ্বাস ছিল রচনা ও ব্যাকরণে ভালো নম্বর পাব। সুতরাং ইংরেজি নিয়ে তেমন ভয় ছিল না। ভয় ছিল না বাংলা নিয়েও। বাংলা গদ্যের একখানা বই ছিল। কবিতা বা অন্য কোনো বই ছিল না। আমার একটা ধারণা ছিল শুদ্ধ বাংলা ও ইংরেজি লিখতে পারলে বিএ পাস করা তেমন কঠিন নয়।
এভাবেই বিএ পরীক্ষায় বসেছিলাম। প্রথম দিনেই আমার কাছে বিস্ময়কর একটি ঘটনা ঘটল। জেলখানার ডেপুটি জেলার ছিলেন আমাদের পরীক্ষার পরিদর্শক। এক সময় তিনি আমাদের কক্ষে ঢুকলেন। জিজ্ঞাসা করলেন কোনো সাহায্য প্রয়োজন আছে কিনা। তাঁর কথায় পরীক্ষার হলে বই দেখেও লেখা যায়। জেলখানায় নাকি এ ধরনের পরীক্ষা হয়। আমার মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে গেল। আমি বললাম, আপনি চলে যেতে পারেন, এ হলে আপনার প্রয়োজন নেই। ভভদ্রলোক ক্ষুব্ধ হয়ে ফিরে গেলেন। আমার বন্ধুরাও সমালোচনা করলেন। তারা বললেন, ওই ভভদ্রলোককে রাগানো ঠিক হয়নি। তিনি আপনার ক্ষতি করতে পারেন। কারণ পরীক্ষার সবকিছুই তার দায়িত্বে। তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভালো হলো না। কোনো মতে পরীক্ষা পর্ব শেষ হলো। বিশ্বাস ছিল পরীক্ষায় পাস করব। কিন্তু ভালো ফল করতে পারব না। অথচ সবাই আশা করেছিল জেলখানা থেকে পরীক্ষা ভালোই হবে। কিন্তু আমি জানতাম, তা হতে পারে না। আমার এখনও মনে আছে ইংরেজি বই না থাকায় আমি আন্দাজে ইংরেজি কবিতার ব্যাখ্যা লিখেছি। শশ্চন্দ্র সম্পর্কে লিখেছি বাইরে পড়া বইয়ের জ্ঞান দিয়ে। তবুও শেষ পর্যন্ত পাস করে গেলাম। এ পাসের পর সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছিল আমার জেলখানার ছাত্র এককালের বিহারের অধিবাসী আব্দুর রহিম। পরীক্ষা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একদিন জেল অফিসে ডাক এল। আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন গোয়েন্দা বিভাগের এক কর্মকর্তা। এ ভভদ্রলোককে আমি চিনতাম। এর আগেও আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। তিনি বললেন, আপনি শিগগিরই বাইরে খবর দিন। আনোয়ার জাহিদ ও জহিরুল ইসলামকে সাবধান হতে বলুন। তারা কিছুদিন আগে ফজলুল হক হলে সভা করেছে। সে সভার খবর আমরা জানি। ওরা সাবধান না হলে যে কোনো মুহূর্তে গ্রেফতার হয়ে যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন করে আন্দোলন শুরু হতে পারে।
