১৮ জানুয়ারি শুক্রবার রাজশাহী জেল থেকে রওনা হলাম। এবার একা। শ্যামল বাবু, চুনী বাবু, পণ্ডিত মশাই রাজশাহী জেলে থেকে গেলেন। পরবর্তীকালে এদের কারো সঙ্গে আর দেখা হয়নি। তিনজনেই এখন লোকান্তরে।
রাজশাহী থেকে ঢাকার ট্রেন বিকেলে। তাই বিকেলের দিকে আমাকে নিয়ে পুলিশবাহিনী জেলখানা থেকে বের হলো। স্টেশনে পৌঁছাতে ভিড় জমে গেল। আমার হাতে হাতকড়া, সঙ্গে পুলিশ। সকলেই উৎসুক। হিমশিম খেয়ে গেল পুলিশ। ট্রেনে প্রথম কথা বলল মিহির গোস্বামী। সঙ্গে তার বোন বেলা গোস্বামী। নামটা আমারও মনে ছিল। ইত্তেফাঁকের কঁচিকাঁচার মেলার সদস্য। গান গায়। এদের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ। রাজশাহী এসেছে ঢাকা যাবে বলে। জেলখানা থেকে বের হয়ে এতদিনে তাদের আর খোঁজ করা হয়নি। শুধু শুনেছি বিরাট ঝড় বয়ে গেছে ঐ পরিবারের ওপর দিয়ে। মিহির চলে গেছে। ভারতে।
আমাকে কেন্দ্র করে ভিড় বাড়তে থাকায় বিপাকে পড়ল পুলিশ। সিরাজগঞ্জে এসে ফেরিতে আমার কাছে কাউকে এগুতে দিল না। আমি নির্বাক বসে থাকলাম। কিন্তু বিপদ দেখা দিলো জগন্নাথগঞ্জ এসে। আমার জন্যে রিজার্ভ কোনো আসন নেই। সব বগিতে অসংখ্য যাত্রী। শেষ পর্যন্ত পুলিশ ও গোয়েন্দা বাহিনী মিলে আমাকে মহিলাদের কক্ষে ওঠাল। মহিলারা প্রতিবাদ করে উঠল। দেখা গেলো ইতোমধ্যে অনেক পুরুষ যাত্রী ঐ কক্ষে উঠে গেছে। কিছুক্ষণ পর এক প্রবীণ ভভদ্রলোক কক্ষে উঠলেন তাঁর কন্যাকে নিয়ে। মনে হলো কন্যাটির ঢাকায় চাকরি হয়েছে। তাকে তিনি পৌঁছে দিতে চলেছেন ঢাকায়। এরপর উঠলেন এক পদস্থ কর্মচারি। তিনি আমাকে এবং পুলিশ দেখে বুঝতে পারলেন আমার পরিচয় কী এবং তড়িঘড়ি করে কারো সঙ্গে কথা না বলে বাঙ্কারে উঠে শুয়ে পড়লেন।
ট্রেন চলতে শুরু করতেই প্রবীণ ভভদ্রলোক কথা বলতে শুরু করলেন। মনে হলো তিনি কোনো কলেজের অধ্যক্ষ। এককালে বাড়ি ছিল ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। তিনি তীব্র ভাষায় সরকারকে গালি দিচ্ছিলেন ট্রেনের দুর্গতির জন্যে। সরকারের সমালোচনা করছিলেন, বলছিলেন গণতন্ত্রের কথা। বাকস্বাধীনতার কথা। বলছিলেন যে দেশে বাকস্বাধীনতা নেই সে দেশের মানুষ বর্বর।
কক্ষের সকলেই অবাক বিস্ময়ে তাঁর কথা শুনছিলেন। তিনি সামরিক আইনের তীব্র সমালোচনা করছিলেন। কখনো ইংরেজিতে আবার কখনো বাংলায়। আমার সঙ্গের পুলিশ এবং গোয়েন্দা বাহিনীর ভভদ্রলোকদের বিব্রতকর অবস্থা। আমি আদৌ তার দিকে তাকাচ্ছিলাম না। আমার সাথে দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের লোকায়ত দলিল। আমি মনোযোগ দিয়ে পড়বার চেষ্টা করছি। হঠাৎ সে প্রবীণ ভভদ্রলোক জোরালো কণ্ঠে ইংরেজিতে বলতে থাকলেন সামরিক সরকার ভেবেছে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার মতো এদেশে কেউ নেই। এদেশের মানুষ আজও জানে না শয়ে শয়ে তরুণ সামরিক আইনের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে রাজশাহী, ঢাকা, কুমিল্লা জেলে আছে। ওরা বেঁচে থাকবে এবং জিতবে।
এ সময় বাঙ্কার থেকে হঠাৎ সেই পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা নিচে নামলেন। বললেন, আপনি কি লক্ষ করেছেন আপনার সামনে এমন এক তরুণ বসে আছে হাতকড়া নিয়ে। এবার প্রবীণ ভভদ্রলোক আমার দিকে তাকালেন। বললেন, কী বই পড়ছে। এবার আমার হাত থেকে বইখানা নিয়ে বললেন, এ বই না পড়লে রাজনীতি শিখবে কী করে? কী করে কষ্ট করতে শিখবে।
তারপর সকলে চুপচাপ। তিনি সারারাত লোকায়ত দর্শন পড়লেন। একটি কথাও বললেন না। পরদিন ঢাকা স্টেশনে পৌঁছলে আমাকে বইটি ফেরত দিয়ে বললেন, ভয় নেই। এদেশের মানুষ তোমাদের সঙ্গে। আমার ছেলেমেয়েরা শিক্ষিত এবং প্রতিষ্ঠিত। এ মেয়েকে নিয়ে ঢাকায় এসেছি। আমার চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। কিন্তু এ কোন স্বাধীনতা পেলাম?
আমি নির্বাক। কৈশোরে বাড়ি ছেড়েছি। দীর্ঘদিন জেল খেটেছি। পুলিশের ভয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছি। খুনের আসামী হয়েছি। কতদিন নিয়মিত খাবার জোটেনি। কিন্তু এমন কথা আমাকে কেউ বলেনি। ১৯৬১ সালের সেই কঠিন সামরিক শাসনের মুখে এদিন আমার কাছে অনেক বড় পাওয়া। এ প্রবীণ মানুষটির সঙ্গে আমার আর কোনোদিন সাক্ষাৎ হয়নি। কখনো আমি তাকে খোঁজ করিনি। কত লোক চিনেছি, দেখেছি। কত ভালোবাসা পেয়েছি। কারো ধোঁজ কোনোদিন পিছু ফিরে করিনি। মনে হয় সর্বত্র হেঁটে যাচ্ছি পায়ে জল মেখে। যেন আমার সঙ্গে আমার পায়ের পাপও মিলিয়ে যায়।
তবে সেদিন ঐ প্রবীণ ভভদ্রলোক আমার একটা উপকার করেছিলেন। তাঁর আচরণে আমার সঙ্গের পুলিশ এবং গোয়েন্দা বাহিনী অভিভূত। তারা ভাবল ভবিষ্যতে আমি বড় কোনো কিছু হয়ে যেতে পারি। ঢাকা স্টেশনে পৌঁছে তাদের আচরণ পাল্টে গেল। বলল, স্যার মাফ করে দিন। বুঝতে পারিনি। আপনি ইচ্ছে হলে ঢাকা শহরে জেলে যাবার আগে যে কোনো বাসায় যেতে পারেন। আপনার কোনো আত্মীয়ের বাসায় যেতে পারেন। আমরা জানি আপনি পালাবেন না। আপনাকে আমরা সন্ধ্যার আগে জেলে পৌঁছে দেব। কোনো অসুবিধা হবে না।
এ ঢাকা শহরে তখন আমার আত্মীয় বলতে কেউ নেই, আছে পরিচিত ব্যক্তি। তাদের বাসায় পুলিশ নিয়ে গেলে তারা বিব্রত হবেন। হয়তো এ সুযোগে গোয়েন্দারা জেনে যাবে আমার আত্মীয়ের ঠিকানা। আমি গোয়েন্দাদের বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। বললাম, চলুন জেলখানায়।
