রাত সাড়ে দশটায় ঢাকার ফুলবাড়িয়া স্টেশন থেকে ট্রেন ছাড়ল। আমাদের সঙ্গেই রাজবন্দি শ্যামেন ভট্টাচার্য। রাশভারী চেহারা। লেখাপড়া করেছেন বিস্তর। তাঁকে তর্কে হারানো মুশকিল। রাতভর তাঁর সঙ্গে তর্ক হলো অন্যান্য যাত্রীর। বিষয় পরিবার পরিকল্পনা। শ্যামেন বাবু সবাইকে বুঝিয়ে ছাড়লেন যে, এ সমাজের মৌলিক পরিবর্তন না করে পরিবার পরিকল্পনা করতে গেলে সমাজে বিকৃতি ঘটবেই।
আমি ভাবছিলাম ভিন্ন কথা। আমাকে সাত দিনের মধ্যেই ঢাকা ফিরতে হবে। আমি আমার সাথে গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করলাম। ট্রেন ছাড়বার আগে স্টেশনে বসে গোয়েন্দা বিভাগের এক কর্মকর্তার কাছে চিঠি লিখলাম। লিখলাম, পরীক্ষার জন্যে আমার ঢাকা ফিরে আসা দরকার। তিনি ছিলেন ডিএসটি। যতদূর মনে আছে নাম আবদুল মজিদ। তাঁর এক ছেলে কামাল ছাত্রলীগের সদস্য ছিল। পরবর্তীকালে চাকরি নিয়েছিল বিমানে। এই মজিদ সাহেবকে আমি কোনোদিন চোখে দেখিনি। অথচ তিনি আমাকে সাহায্য করেছেন বারবার। ওই চিঠি তাঁর কাছে পৌঁছেছিল কিনা তাও জানি না। তবে এ কথা সত্য, ৭ দিনের মধ্যে আমি ঢাকা জেলে ফিরেছিলাম।
রাজশাহী জেলে পৌঁছতে পৌঁছতে পরের দিন অর্থাৎ রোববার বিকেল হয়ে গেল। আমি জেলগেটে ঢুকেই বললাম আমি সুপারিন্টেনডেন্টের সঙ্গে দেখা করতে চাই। তিনি আমাকে চিনতেন। তিনি দীর্ঘদিন বরিশাল জেলের সুপারিন্টেনডেন্ট ছিলেন। আমি তখন বিএম কলেজের ছাত্র। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে খুন মামলার আসামী। তাঁর ছেলে ভানু। পরবর্তীকালে প্রখ্যাত প্রকৌশলী নূরুল উল্লা। যিনি ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে জগন্নাথ হলের হত্যাকাণ্ডের ছবি তুলেছিলেন। ভানুর সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল। যদিও ভানু তখন মুসলিম লীগ করত। আমার কথা শুনে ভানুর বাবা জেলগেটে এলেন। আমি তাকে আমার পরীক্ষা ও জেল বদলির কথা বললাম। বললাম, আমাকে তিনখানা দরখাস্তের কাগজ দিতে হবে। আমি আইজিপি, ঢাকা জেলের সুপার এবং ডিআইজি, আইবির কাছে দরখাস্ত করতে চাই। আমাকে আপনার জন্যে ঢাকায় রেডিওগ্রাম করতে হবে। আমি তিনখানা দরখাস্তের কাগজ নিয়ে জেলে ঢুকে গেলাম। তখন সন্ধ্যা নেমেছে। রাজশাহী জেলে তখন অনেক রাজবন্দি। সকল জেলখানা তালাবদ্ধ হলেও রাজবন্দি হিসেবে তাদের কিছুটা বাড়তি সুবিধা আছে। তারা তখন তালাবদ্ধ হননি। আমরা তখন ওয়ার্ডে পৌঁছে গেলাম।
পরদিন জেল সুপার এলেন ওয়ার্ডে। বললেন, ঢাকার সঙ্গে কথা হয়েছে। আপনাকে পাঠাতে হবে। ঢাকা জেলের সুপার নিয়ামত উল্লাহ জানত না যে, আপনাকে বদলি করা হয়েছে। নির্দেশ এসেছে আপনাকে ফেরত পাঠাবার। তবে আমাদের এখন পুলিশ নেই। কদিন পরে আপনাকে পাঠালে কেমন হয়? আমি বললাম না। আমাকে শনিবার ১৯ জানুয়ারি পৌঁছাতে হবে। রাজশাহী জেলের সুপার বললেন, ঠিক আছে, জরুরি ভিত্তিতে আপনাকে পাঠাব।
মাত্র রাজশাহী জেলে এসেছি। তেমন চিনি না। সঙ্গে শ্যামেন ট্টাচার্য, চুনী মুখার্জি এবং পণ্ডিত মশাই। পথে তেমন আলাপ হয়নি। রাজশাহী জেলে এসেও তেমন আলাপ করার সুযোগ হয়নি। আমি যাবার জন্যে ব্যস্ত। শুধু চেনাদের মধ্যে বগুড়ার দুর্গাদাস মুখার্জীর কথা মনে আছে, যিনি দীর্ঘদিন ঢাকা জেলে ছিলেন আমার সঙ্গে। আরো চেনা ছিল ছাত্র আন্দোলনের জন্যে। রাজশাহী জেলের স্মৃতি ঝাপসা থেকে গেল। আমার সেখানে থাকা হলো না। ইচ্ছে ছিল খাপড়া ওয়ার্ড দেখব। ঐ ওয়ার্ডে ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল রাজবন্দিদের ওপর গুলি হয়েছিল। আমি তখন ঢাকা জেলে। এ দিনটি আমার কাছে মনে আছে। মনে আছে খুলনার আনোয়ারের কথা। খুলনার আনোয়ার। ১৯৪৯ সালে ঢাকা জেলে এসেছিল। মাত্র কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। ছোটখাটো ছেলেটি। কম বয়সের দিক থেকে আমরা তখন ঢাকা জেলে তিনজন বন্দি ছিলাম। তিনজন হচ্ছি আমি, এক সময়ের মফস্বল সাংবাদিকদের নেতা শফিউদ্দিন আহমেদ ও খুলনার আনোয়ার। বয়স কম বলে জেলখানায় তিনজন খাওয়ার দিক থেকে সুবিধা পেতাম। পাশাপাশি সেলে থেকে অনশন ধর্মঘট করেছি দিনের পর দিন।
আনোয়ারকে ১৯৪৯ সালেই মুক্তি দেয়া হয়েছিল। তার গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল এলাকায়। পরে একদিন খবর পেয়েছিলাম আনোয়ার আবার গ্রেফতার হয়েছে। এবার তাকে রাজশাহী জেলে পাঠানো হয়েছে। সেই রাজশাহী জেলে গুলি হয়েছিল ১৯৫০ সালের এপ্রিলে। প্রথমে জানতে পারি নি এ গুলির কথা। যেদিন ঢাকা জেলে এ খবর পৌঁছাল তখন আমাদের প্রতিবাদ করার শক্তি পর্যন্ত নেই। দিনের পর দিন অনশন ধর্মঘট পালন করে সকলের স্বাস্থ্য বিপর্যস্ত আর তখন কমিউনিস্ট পার্টির রাজনৈতিক লাইনের পরিবর্তন হয়েছে। জেলখানা থেকে এখন আর সংগ্রাম নয়। আপোষ আলোচনার মাধ্যমে এ দাবি দাওয়ার নীতি গৃহীত হয়েছে। অথচ আজ সে হিসেবে ধরলে ঐ লাইনের জন্যে কত কমরেড জীবন দিয়েছে। কত কমরেড জীবন র ভুগেছে। এখন মনে হয় যদি ঐ অনশন ধর্মট না হতো তাহলে অনেক ভালো থাকতাম।
সঙ্গে সঙ্গে ভিন্ন কথাও মনে হয়। মনে হয় কেউ আমাদের কথা জানল না। কেউ আমাদের মনে রাখল না। পাকিস্তানের প্রথম দিকের অন্ধকার দিনগুলোতে এই যে শ’য়ে শ’য়ে মানুষ অমানুষিক জীবন যাপন করেছিল- যাদের সঙ্গে আচরণে পাকিস্তান সরকার ব্রিটিশ সরকারকেও হার মানিয়েছিল যাদের পাকিস্তান সরকার দিনের পর দিন নাস্তিক, পাকিস্তানের শত্রু বলে গালি দিয়েছে, ভিটে-মাটি উচ্ছেদ করেছে–যাদের দেশপ্রেম নিয়ে কটাক্ষ করেছে তাদের অধিকাংশই ছিল ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের পরীক্ষিত সৈনিক। ব্রিটিশকে তাড়ানোর জন্যে তারা ঘর ছেড়েছিল। তাদের জন্যে ব্রিটিশ ভারত ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল। আর ব্রিটিশ চলে যাবার পর পাকিস্তানে তাদের পুরস্কার মিলেছিল জেল আর জুলুম। পাকিস্তানে ক্ষমতায় এসেছিল ব্রিটিশ আমলের খয়ের খাঁ–খান সাহেব আর খান বাহাদুরের দল। আজ যারা সঠিক ইতিহাস লিখতে চান তাদের স্মরণে রাখতে হবে ১৯৭১ সাল একদিনে আসেনি। শুধুমাত্র কোনো দল বা ব্যক্তির জন্যে দেশ স্বাধীন হয়নি। সেদিন যারা প্রাণ দিয়েছিল তাদের মধ্যে আনোয়ার হোসেন একজন। জানি না খুলনার মানুষ আজ এ নামটি স্মরণ করে কি না। আদৌ জানে কি না এ নামের পরিচয়। আমি মাত্র ৬ দিন রাজশাহী জেলে ছিলাম। আমার খাপড়া ওয়ার্ড দেখা হয়নি।
