জেলখানায় কেউ কোনো কিছু নির্দিষ্ট করে বলতে পারছে না। শুধু সকলের ধারণা ছিল এবারো জেলে থাকতে হবে দীর্ঘদিন। এবারো একমাত্র ভরসা ছাত্র আন্দোলন।
তবে আন্দোলন থাক বা না থাক গ্রেফতারের বিরাম ছিল না। ইতোমধ্যে জেলে এলেন ফরিদপুরের শ্যামেন ভট্টাচার্য, চুনী মুখার্জি এবং ফরিদপুরের ডিঙ্গামানিকের পণ্ডিত মশাই বিভূতিভূষণ ভট্টাচার্য।
পণ্ডিত মশাইয়ের পরিবার বিশুদ্ধ ব্রাহ্মণ। পিতা মহামহোপাধ্যায়ের ছিল ধর্ম সম্পর্কে অগাধ জ্ঞান। কিন্তু তিনি কমিউনিস্ট। পণ্ডিত মশাইয়ের মেজাজ তিরিক্ষি। একবার জেলখানার অফিসে একজন গোয়েন্দা অফিসার তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, পণ্ডিত মশাই কেমন আছেন? পণ্ডিত মশাই জবাব দিয়েছিলেন–এক চোপারের সকল দাঁত ভাঙবো। ব্যাডা জেলে রাখছো আর জিয়াও কেমন আছি, জেলে কেউ ভালো থাকে? এরপর আর তাদের কথা জমেনি এবং পণ্ডিত মশাইয়ের কাছে কোনোদিন গোয়েন্দা এসেছে বলে শুনিনি।
জেলখানায় দিন ভালোই চলছে। মাঝে মাঝে মুক্তি পাবার সম্ভাবনার কথা শুনি। তারপর আর কোনো কথা শুনতে পাই না। আমার মনে হতো পরীক্ষার আগে জেলে থাকাই ভালো। বাইরে গেলে ঝামেলা। শুধু জেলখানায় অসুবিধা বই নিয়ে। অগতির গতি শহীদুল্লাহ কায়সার। তিনি জেলখানায় জনপ্রিয় ব্যক্তি। দীর্ঘদিন জেলে থাকায় পরিচিত। তিনি ঘুরছেন। সকলের সঙ্গে কথা বলছেন। আবার রুমে ঢুকে লিখছেন। তাঁর সংশপ্তক এবং সারেং বৌ ওই সময় জেলে বসে লেখা। মাঝে মাঝে তিনি মামলার জন্যে বাইরে যান। একের পর এক তারিখ পড়ে। ফিরে আসেন।
আমার সঙ্গে জেল সুপারিন্টেনডেন্টের সম্পর্ক ভালো হলেও অন্যান্য জেল কর্মকর্তারা আমার ওপর খুশি নন। আমি সুপারিন্টেনডেন্টের সঙ্গে মুখেমুখে তর্ক করি। জেলখানার সব এলাকার খবর রাখি। জেল সিপাইকে পড়াই বলে সকলে কৃতজ্ঞ। ফলে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বেজার।
হঠাৎ একদিন ডেপুটি জেলার কাজী আলতাফ হোসেনের নেতৃত্বে একদল সেপাই আমাদের ওয়ার্ডে এল। আমার পাশে এক বন্ধুর কাছে এক টুকরো সাদা কাগজ পাওয়া গেল। জেলখানায় অনুমোদিত কাগজ ছাড়া কোনো সাদা কাগজ রাখার নিয়ম নেই। আলতাফ সাহেব তর্ক জুড়ে দিলেন। আমি বললাম, এতে তর্ক করার কী আছে। সাদা কাগজ পেয়েছেন নিয়ে যাবেন। এ নিয়ে হইচই করছেন কেন? মনে হলো আলতাফ সাহেব আমার কথায় অখুশি হয়েছেন; উনি কোনো কথা না বলে পটপট করে পুলিশ বাহিনী নিয়ে চলে গেলেন।
আমি এ নিয়ে তেমন কিছু ভাবিনি। বিকেল বেলা মোগাসন করছিলাম। সেদিন শনিবার। জেল অফিস থেকে নজির জমাদার এল। তার হাতে একটি চিরকুট। চিরকুটে লেখা আছে আমাকে জেল অফিসে যেতে হবে। নজির জমাদার বলল–আপনাকে অন্য জেলে যেতে হবে। আপনাকে এ জেলে রাখা যাবে না। সবকিছু গুছিয়ে নিন। তবে কোন জেলে আপনাকে পাঠানো হবে তা আমি জানি না।
আমি খানিকটা চমকে গেলাম। কারণ এটা জানুয়ারি মাস। এপ্রিল মাসে আমার পরীক্ষা। পরীক্ষার অনুমতি এখনো পাইনি। সব বই আমার নেই। অথচ আমাকে অন্য জেলে যেতে হবে। আমার বলার বা করারও কিছু ছিল না। সকল বন্ধুর সঙ্গেই কথা বললাম। তাদের বললাম, আমার সিট যেন ঠিক থাকে। আজকে ১২ জানুয়ারি শনিবার। আগামী ১৯ জানুয়ারি শনিবার এই জেলে ফিরে আসব। জেল কর্তৃপক্ষ আমাকে চিনে না।
জেলগেটে ডেপুটি জেলার কাজী আলতাফের সঙ্গে দেখা হলো। দেখা হলো জেলারের সঙ্গে। আমি বললাম, জেলার সাহেব, একটা ভুল করলেন। আগামী শনিবার আমি আবার ফিরে আসছি। তারা দু’জনেই হাসলেন। আমার বিশ্বাস ছিল সুপারিন্টেনডেন্ট নিয়ামত উল্লাকে না জানিয়ে এ নির্দেশ স্বাক্ষর করানো হয়েছে। তিনি ঘটনা জানলে এ নির্দেশ স্বাক্ষর হতো না। আর ওরা জানত না ঢাকা জেল থেকে পরীক্ষার্থী ছাত্র বন্দিকে অন্য জেলে পাঠাবার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আছে। পরীক্ষার্থী বন্দিরা ঢাকাতেই থাকবে।
কিছুক্ষণ পরে দেখলাম আর তিনজন বন্দি জেলেগেটে এসেছেন। তাদেরও আমার সঙ্গে রাজশাহী জেলে পাঠানো হবে। সঙ্গ পাওয়ায় আমার মনটা ভালো হয়ে গেল। সন্ধ্যার পরে জেলগেট থেকে ঘোড়ার গাড়িতে আমরা ফুলবাড়ি স্টেশনে এলাম। ট্রেন রাত সাড়ে দশটায়–উত্তরবঙ্গ মেইল। আমাদের স্টেশনে এসে বসে থাকতে হবে।
কিন্তু আমাকে নিয়ে বিপদ দেখা দিল জেলগেটে। আমাদের এক জেল থেকে অন্য জেলে নেয়া হবে। আমাদের কোমড়ে দড়ি বাঁধতে হবে। হাতে হাতকড়া লাগাতে হবে। এ ব্যাপারে সবাই বিদ্রোহ করে। আমার কিন্তু কোমড়ে দড়ি বাঁধতে এবং হাতে হাতকড়া লাগাতে মজা লাগে। কোমড়ে দড়ি আর হাতে হাতকড়া থাকলে লোকের চোখে পড়ে। মানুষ জানতে চায় আমরা কারা? কোথায় যাচ্ছি? কেন আমাদের গ্রেফতার করা হয়েছে? দেশে তখন সামরিক শাসন। অনেকেই জানেন যে, আমাদের মতো হাজার হাজার ছাত্র এবং যুবক পাকিস্তানের জেলখানায় তখন বন্দি। তবে আমার যুক্তি যাই হোক না কেন, ওই তিন রাজবন্দি কিছুতেই রাজি হলেন না কোমড়ে দড়ি দিতে। ঠিক হলো আমাদের হাতে হাতকড়া দিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। কিন্তু কোনো হাতকড়াই আমার হাতে লাগছে না। সব হাতকড়াই বড়। আমার হাতে হাতকড়া লাগাবার সঙ্গে সঙ্গে আমি হাত বের করে আনছি। এবার ঠিক হলো প্রতীক হিসেবে আমার হাতে একটা হাতকড়া থাকবে। তবে কখনোই আমি হাত বের করব না।
