কিন্তু সব কিছুরই একটা সীমা আছে। অজয় রায় আমার জন্যে কতটুকু পারেন! আমি বই কোথায় পাব? এক সময় রসায়নে অনার্সের ছাত্র ছিলাম। পরে পদার্থ, রসায়ন ও গণিত নিয়ে বিএসসি পাস কোর্সের ছাত্র হলাম। রাজনৈতিক বিপত্তির জন্যে সব ছাড়তে হলো। এবার আমি বিএ’র ছাত্র। আমার পরীক্ষার বিষয় হচ্ছে–ইংরেজি, বাংলা, অর্থনীতি ও দর্শন।
ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম থেকে দু’জন বিকম পরীক্ষার্থী ঢাকায় এলেন। তাঁরা হচ্ছেন জনাব নূরুল ইসলাম ও সাইফুদ্দীন আহমেদ খান। তাঁরা আসায় আমার বেশ সুবিধা হলো। ওদের কাছে কিছু অর্থনীতির বই ছিল, কিন্তু বাংলা, ইংরেজি, দর্শনের বই কোথায় পাব? টাকাও বা কোথা থেকে জুটবে? জেলে যাবার আগে তৎকালীন অ্যাডভোকেট জেনারেল মরহুম বিএ সিদ্দিকীর জ্যেষ্ঠ পুত্রকে পড়াতাম। তিনি আমার গ্রেফতারের খবর শুনে সঙ্গে সঙ্গে মাইনের টাকা জেলগেটে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। বই-এর জন্যে খবর দিয়েছিলাম মোদাব্বের সাহেবকে। তিনি বই কিনে সরাসরি নিজেই গোয়েন্দা বিভাগের দফতরে চলে যান এবং অর্থনীতির একটি বই জেলখানায় পাঠিয়ে দেন।
এদিকে তখন বাইরে তেমন আন্দোলন নেই। একদিন আমাকে জেল অফিসে ডাকা হলো। বলা হলো গোয়েন্দা বিভাগের এক কর্মকর্তা আপনার সঙ্গে দেখা করবেন। জেল অফিসে ঢুকে আমি চমকে গেলাম। দেখলাম, আমার অতি চেনা এক মানুষ সেখানে বসে আছেন। বহুদিন ধরে তাঁর সঙ্গে মধুর ক্যান্টিনে গল্প করেছি। চা খেয়েছি। তিমি আমাকে দেখে হাসলেন। বললেন, নির্মল বাবু নিশ্চয়ই বিষ্মিত হয়েছেন। আপনি জানতেন আমি আইন বিভাগের ছাত্র। রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করি, একথা সত্য। তবে প্রধানত আমি গোয়েন্দা বিভাগের কর্মচারি। আপনার ওপর নজর রাখার জন্যেই আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলাম। আমার মতো অনেক গোয়েন্দা বিভাগের কর্মচারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তিনি আমার বিস্ময় কাটতে না কাটতেই একটি ভিন্ন প্রশ্ন করলেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি ছাত্রলীগ ছাড়লেন কেন? কথা ছিল আপনি সম্পাদক এবং এমএ আউয়াল সভাপতি হবেন। সে প্রস্তাব পরে পাল্টে গেল দেশের বামপন্থীদের চাপে। তারা কেউ আপনাকে পছন্দ করল না। পরে কথা হলো মমিন তালুকদার সভাপতি হবেন। আপনি সহসভাপতি এবং এমএ আউয়াল সম্পাদক হবেন। আপনি সে প্রস্তাব মানলেন না। সে প্রস্তাব মানলে আপনি ছাত্রলীগের একচ্ছত্র নেতা হতেন।
আমি বিস্মিত হয়ে ভদ্রলোকের দিকে তাকালাম। বললাম, এ ধারণা আপনি কেন করছেন? তিনি বললেন, দেশে সামরিক শাসন জারি হওয়ার পর মমিন তালুকদার কিংবা আউয়াল সাহেব নিশ্চয়ই নেতৃত্বে থাকতেন না। আপনি ছাত্রলীগকে চিনতেন। এ সংগঠনে কিছু বোহিমিয়ান সংগ্রামী কর্মী আছে। এই পুরো সংগঠন নিয়ে আপনি আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যেতে পারতেন। এ সংগঠনের সংগ্রামী ভূমিকা আপনার অন্তত অনুধাবন করা উচিত ছিল। কারণ দীর্ঘদিন এদের সঙ্গে আপনি ছিলেন এবং নেতৃত্বেই ছিলেন। আপনার সম্পর্কে তাদের কোনো প্রশ্নই ছিল না।
আমি বললাম, দেখুন আজকে ১৯৫৯ সালে একথা যেমন সত্য মনে হচ্ছে, ১৯৫৭ সালে তেমন অনুভূতি আমার ছিল না। নেতৃত্বের বিশ্বাসঘাতকতা আমাকে ক্ষুব্ধ করেছিল। আমি নিশ্চিত দাবি করতে পারি, তখন আমি না থাকলে ছাত্র ইউনিয়নের এ প্রবল জোয়ারের যুগে ছাত্রলীগকে বাঁচিয়ে রাখা কঠিন হতো। ছাত্রলীগে আমিই একমাত্র ছিলাম অসাম্প্রদায়িকতা ও প্রগতিপন্থী রাজনীতির প্রতীক। আমার সঙ্গে একমাত্র ছিল কমিউনিস্ট পার্টির ময়মনসিংহের কাজী আব্দুল বারী। তবে ইচ্ছা থাকলেও আমার ছাত্রলীগে থাকার উপায় ছিল না। শহীদ সোহরাওয়াদী প্রধানমন্ত্রী হয়ে যাবার পর আওয়ামী লীগ একটি কমিউনিস্টবিরোধী সংগঠনে পরিণত হয়। ছাত্রলীগও আওয়ামী লীগকে অন্ধ অনুকরণ করতে শুরু করে। আমাদের দল অর্থাৎ আরএসপি সিদ্ধান্ত নেয় যে, ছাত্রলীগ ছাড়তে হবে। এই সিদ্ধান্তের ফলেই আমার ছাত্রলীগে থাকা সম্ভব হয়নি। এবার তিনি প্রশ্ন তুললেন ময়মনসিংহের কাজী আব্দুল বারী সম্পর্কে। কাজী আব্দুল বারী পূর্ব পাকস্তিান ছাত্রলীগ ময়মনসিংহ শাখার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। মূলত কমিউনিস্ট পার্টির লোক। ময়মনসিংহে ছাত্রলীগ কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্রদের দখলে থাকায় পৃথক। ছাত্র ইউনিয়ন গঠন করা হয়নি। কাজী বারী তাদেরই নেতা ছিল। আমরা একসঙ্গে ছাত্রলীগ থেকে পদত্যাগ করেছিলাম। ১৯৫৪ সালে একটি সাধারণ নির্বাচন হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানে। যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করেছিল। মুসিলম লীগ পরাজিত হয়েছিল। জেলখানা থেকে সকল রাজবন্দি মুক্তিলাভ করেছিল। অনেকের ধারণা ছিল শিগগিরই হয়তো আর জেলে আসতে হবে না। আমি খুনের মামলার আসামী হয়ে ঢাকায় এসে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলাম। সে মামলায় আমি প্রথম দুদিন ব্যতীত কোনোদিন হাজির হইনি। ১৯৫৪ সালের মামলা ১৯৬৫ সালে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ভেবেছি এভাবে নির্বিঘ্নে হয়তো কিছুদিন কাটানো যাবে।
কিন্তু হলো না। যুজফ্রন্ট মন্ত্রিসভা ভেঙে দেয়া হলো। যুফ্রন্টে কোন্দল হলো। সমগ্র পাকিস্তানের রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ স্পষ্ট হয়ে উঠল। সামরিক বেসামরিক আমলারা ক্ষমতা দখল করল। দেশে সামরিক শাসন জারি হলো ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর। আর সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো গ্রেফতার। আমাদের মুক্ত থাকার স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
৪. আজ যারা এ কাহিনী পড়বেন
আজ যারা এ কাহিনী পড়বেন তারা কিছুতেই সেকালের পরিস্থিতি অনুভব করতে পারবেন না। পৃথিবীতে দেশের পর দেশ বিদেশি শৃঙ্খলমুক্ত হয়েছে। কাছাকাছি ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মায়ানমার, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে মুক্ত হয়েছে। শুধু পাকিস্তান আর মায়ানমারের লোক কোনোদিন শাস্তি দেখেনি। তবে পাকিস্তানের পরিস্থিতি আরো দুঃখজনক। এখানে জাতপাতের প্রশ্ন প্রধান হয়ে উঠেছিল। একটি দেশের মানুষ স্বাধীন হয়েছিল পিতৃপুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে যাবার শর্তে।১৯৪৭ থেকে ১৯৫৮। এ পরিস্থিতি আমরা মেনে নিয়েছিলাম। তাই ১৯৪৮ সালের জেলের চেয়ে ১৯৫৮-৫৯ সালের জেল ছিল সেদিন থেকে অনেক নির্ভয় কিন্তু অনিশ্চিত। কারো ধারণা নেই রাজনীতির কী হবে। ১৯৫৪ সালে বিরোধী দল জিতেছিল স্বতঃস্ফূর্ততায় এবং আবেগে। রাজনৈতিক দিক থেকে দেশ তেমন এগোয়নি। শ্রমিক বা কৃষক আন্দোলন গড়ে উঠেনি। এক সময় শুধু বামপন্থী দলগুলো নিষিদ্ধ ছিল। এবার সকল দল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সংসদ সংবিধান সবই বাতিল করা হয়েছে। তাহলে কী হবে?
