সে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি। জেলখানায় যারা যায়, সবাই মুক্তি চায়। জেলে যারা থাকে বা চাকরি করে তারাও চায় আমরা যেন মুক্তি পাই। কিন্তু আমার মুক্তির কথা শুনলে রহিম বিষণ্ণ হয়ে যেতে।
এছাড়া মাঝখানে আমার মুক্তির কথাও বারবার আলোচিত হতো। আমার আগে ইত্তেফাকের সম্পাদক মরহুম তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া গ্রেফতার হয়েছিলেন। তিনিও ঢাকা জেলে ছিলেন। আমি জেলে আসার পর তিনি মুক্তি পান। অনেকেই প্রত্যাশা করেছিল আমি হয়তো শিগগিরই মুক্তি পেয়ে যাব। বাইরে আমার ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিল প্রখ্যাত সাংবাদিক মোহাম্মদ মোদাব্বেরের সঙ্গে। তখন পূর্ব পাকিস্তানের চিফ সেক্রেটারি ছিলেন মোহাম্মদ আজফর। আমার গ্রেফতারের খবর পেয়ে মোদাব্বের সাহেব আজফরকে জিজ্ঞেস করেছিলেন আমাকে কেন গ্রেফতার করা হলো। আজফর বলেছিলেন, এ ব্যাপারে সব দায়িত্ব ব্যুরো অব ন্যাশনাল রি-কনস্ট্রাকশন অর্থাৎ বিএনআর-এর প্রধান কাজী আনোয়ারুল হক-এর।
এই বিএনআর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে তকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। এই সংগঠনের দায়িত্ব ছিল বুদ্ধিজীবীদের কেনাবেচা করার। এরা দেশের প্রখ্যাত কবি-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীদের টাকা দিত। তাদের রচনা প্রকাশ করত। এসব রচনায় পাকিস্তান সরকারের প্রশংসা করা হতো। বিভ্রান্তির সৃষ্টি করা হতো শিক্ষিত মহলকে। এই সংগঠনটি তাদের এই সাহিত্যকর্মের আড়ালে গোয়েন্দাবৃত্তি করত। এদের গোয়েন্দারা ছাত্র, শিক্ষক, শিল্পী, সাহিত্যিক মহলের খবরাখবর রাখত। এই সংগঠনের সুপারিশের ভিত্তিতেই কেউ গ্রেফতার হতো। কারো সরকারি চাকরি হতো। আবার কাউকে সরকারি চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়া হতো। এককালে এই সংস্থার প্রধান ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাসান জামান এবং অধ্যাপক কবীর চৌধুরী। চিফ সেক্রেটারি আজফারের কথা শুনে কিছুটা বিষ্মিত হলেন মোদাব্বের সাহেব। তিনি জানতেন না যে বিএনআর গোয়েন্দা বৃত্তিও করে। তবুও তিনি কাজী আনোয়ারুল হককে জানিয়েছিলেন। তিনি বললেন, নির্মল সেন বড্ড দুর্বিনীত। সে কাউকে মানে না। রাস্তাঘাটে সবাইকে গালি দেয়। এ মুহূর্তে তাকে মুক্তি দেয়া সম্ভব নয়। বেশ কিছুদিন ধরে সে বিশ্ববিদ্যালয়ে গোলমাল করছে। তাকে ঢাকা হল থেকে ২৪ ঘণ্টার নোটিসে বের করে দেয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে তার প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবুও সে কোনো কিছু মানতে চাইছে না।
এ খবর জেলখানায় পৌঁছলে বুঝলাম আমি তাড়াতাড়ি মুক্তি পাচ্ছি না। বাইরে তখন সরকার মৌলিক গণতন্ত্রের নির্বাচন করার উদ্যোগ নিচ্ছে। অনেকে বলল মৌলিক গণতন্ত্রের নির্বাচন হয়ে গেলে হয়তো আমাদের মুক্তি দেয়া হতে পারে। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে দেখলাম, বিপরীত ঘটনাই ঘটেছে। একের পর এক রাজনীতিক নেতা ও কর্মীদের গ্রেফতার করে জেলখানায় পাঠানো হচ্ছে। তবুও আমার একটা ক্ষীণ আশা ছিল। আমি সাংবাদিক হিসেবে গ্রেফতার হয়েছি। সাংবাদিক ইউনিয়ন নিশ্চয়ই আমার মুক্তির দাবিতে আন্দোলন করবে।
এবার আমার মাথায় একটা নতুন বুদ্ধি খেলল। আমি জেলে যাবার আগেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর পরিবর্তিত হয়েছেন। ভাইস চ্যান্সেলর বিচারপতি ইব্রাহিম আইয়ুব খান সরকারের আইনমন্ত্রী নিযুক্ত হয়েছেন। আমি জেলখানা থেকে তাঁকে চিঠি লিখলাম। চিঠিতে বললাম, আপনি ভাইস চ্যান্সেলর থাকাকালীন আমি ঢাকা হলের ছাত্র ছিলাম। তখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদালয়ের সকল ছাত্রাবাসকে ধর্মনিরপেক্ষ অর্থাৎ কসমোপলিটন করার দাবিতে অনশন করেছিলাম। আপনি কথা দিয়েছিলেন আমি অনশন ভাঙলে এই দাবিটি অন্তত আপনি পূরণ করবেন। আপনি বলেছিলেন ইকবাল হল অর্থাৎ আজকের সার্জেন্ট জহুরুল হক হলকে আপনি কসমোপলিটন করবেনই। আপনি এখন আইনমন্ত্রী। আপনি আপনার কথা রাখলে বাধিত হব।
আমার চিঠি পৌঁছেছিল কি না জানি না। তবে সে চিঠির জবাব আমার কাছে কোনোদিন পৌঁছেনি আর আইয়ুব খানের আমলে কোনো হলই কসমোপলিটন হয়নি।
তবে এবার বিপদ দেখা দিল আমার বিএ পরীক্ষা নিয়ে। আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সম্পর্ক নেই দীর্ঘদিন ধরে। দলের অন্যতম নেতা রুহুল আমিন কায়সার দীর্ঘদিন যাবত মিটফোর্ড হাসপাতালে। তিনি যক্ষ্মায় ভুগছেন। অনেক কষ্ট করে হাসপাতালে তাঁকে ভর্তি করিয়েছিলাম। কথা ছিল ২৫ অক্টোবর হাসপাতাল থেকে তিনি মুক্তি পাবেন। সব ব্যবস্থা হয়েছিল। ২৪ অক্টোবর তাঁর সঙ্গে দেখা করে এসেছি। কিন্তু ওই রাতেই আমি গ্রেফতার হয়ে গেছি। ওই রাতে গ্রেফতার হয়ে যাবার পর শুনেছি দীর্ঘদিন রুহুল আমিন কায়সারকে হাসপাতালেই থাকতে হয়েছে। পরবর্তীকালে আরেক নেতা কমরেড সিদ্দিকুর রহমান তখন বিএ পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেবল ঢুকেছেন। নিতাই গাঙ্গুলীর ওপর তখন পুলিশের কড়া নজর। অর্থাৎ আমি জেলে যাওয়ায় আমার মা যেমন নিশ্চিত হয়েছিলেন আমার ঠিকানা সম্পর্কে, আমার বন্ধুরা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিলেন সবকিছু সম্পর্কে।
এ সময় একজনমাত্র মানুষ আমার সঙ্গী দীর্ঘদিনের বন্ধু বিএসসি ক্লাসের সতীর্থ আমার নিমতলী ডি-লাক্স হোটেলের রুমমেট তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যার গবেষক অজয় রায়। তিনি আমার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন হিমালয়ের মতো। প্রায় প্রতিদিন তিনি ঢাকা জেলে আমার জন্যে কলকাতার স্টেটসম্যান পত্রিকা পৌঁছে দিতেন। সিটি নাইট কলেজে গিয়ে আমার সার্টিফিকেট সংগ্রহ করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে আমার বিএ পরীক্ষার অনুমতি আদায় করেছেন। সে অজয় রায় পরবর্তীকালে ড. অজয় রায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক। এককালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সম্পাদক। বেশ কিছুদিন হলো তিনি অবসর গ্রহণ করেছেন। এক কথায় বলা যায়, অজয় রায় না থাকলে আমার জেলখানা থেকে বিএ পরীক্ষা দেয়া সম্ভব হতো না।
