এবারের জেলখানায় অনেক প্রবীণ কমিউনিস্ট নেতাই ছিলেন। জীবন সায়াহ্নে শুনছি তাদের খেদোক্তি। দলে একের পর ভুল সিদ্ধান্তের ফলে তারা বারবার জেলে এসেছেন। অনেক কমিউনিস্ট নেতাই পাকিস্তান সৃষ্টির পর বছরের পর বছর জেলে থেকেছেন। আপনজনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছে। ঘর ভেঙেছে। কিন্তু রাজনীতি এগোয়নি। দুপুরের স্নানের সময় আমি ব্রিটিশ আমলের দেশাত্মবোধক গান গাইতাম। তখন পাশে এসে দাঁড়াতেন বরিশালের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা হিরণ ভট্টাচার্য। কলেজের এককালীন নামকরা ছাত্র। আত্মীয় বলতে এদেশে কেউ নেই। আত্মীয় হচ্ছে একমাত্র রাজনীতি। সে রাজনীতি বিপর্যস্ত। আমার পাশে দাঁড়িয়ে তিনি গান শুনতেন। চোখ থেকে তখন টপটপ করে জল পড়ত।
আমাদের সঙ্গে ছিলেন বগুড়ার কমিউনিস্ট পার্টির নেতা সুবোধ লাহিড়ী। এককালে অনুশীলন সমিতির সদস্য ছিলেন। এক সময় আরএসপি করেছেন। পরে কমিউনিস্ট পার্টিতে এসেছেন। জীবন মধ্যাহ্ন পার হয়েছে। দেশে সামরিক শাসন। কেউ জানে না কবে সামরিক আইন প্রত্যাহার করা হবে। কবে আমরা মুক্তি পাব। সুবোধ বাবু মাঝে মাঝে গল্প বানাতেন। বলতেন, ঢাকা জেলের গেটের সামনে একটি বাদাম গাছ আছে। এই বাদাম গাছে একটি ডাইনি বসে আছে। যে বা যারা জেলখানা থেকে বের হয়, ডাইনি তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। সবাই জেলখানার কথা ভুলে যায়। সুবোধ বাবু এ। কথা বলেছিলেন বড় দুঃখে। সে এক অদ্ভুত ঐতিহ্য। জেলখানায় থাকাকালীন সকলেই সকলের বন্ধু থাকে। জেল থেকে মুক্তি পাবার সময় প্রতিশ্রুতি দেয় যে, জেলের বাইরে গিয়ে সকলকে মনে রাখবে। সকলকে সম্মান করবে। কিন্তু দু’একজন ব্যতিক্রম ছাড়া বন্ধুদের কেউ কখনো মনে রাখে না। তখন ঢাকা জেলের সুপারিন্টেভেট ছিলেন নিয়ামত উল্লাহ। তার বড় ভাই রহমত উল্লাহ ১৯৫০ সালে ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। দায়ী ছিলেন সে সময় দাঙ্গার জন্যে। কিন্তু নিয়ামত উল্লাহ ছিলেন ভিন্ন মানুষ। তার ভয়ে জেলখানায় বাঘ-মোষে একসঙ্গে পানি খেত। তিনি জেলখানায় ঢুকলে জেলখানা ভিন্ন রূপ ধরত।
এক কথায় নিয়ামত উল্লাহ কঠিন লোক ছিলেন। তিনি জেলখানায় ঢুকলে জেলে পাতাটিও নড়ত না। গাছ থেকে একটি পাতা ঝরলে পর্যন্ত জেল পুলিশ কুড়িয়ে পকেটে রাখত। এই নিয়ামত উল্লাহর সঙ্গে যে কোনো কারণেই হোক আমার একটি ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। সস্তায় বুধবার তিনি আমাদের ওয়ার্ডে আসতেন। দেখতেন আমরা কেমন আছি। একদিন আমি বললাম, আপনার জেলখানায় এসে বিপদে পড়ে গেছি। তিনি বললেন কেন? আমি বললাম, বাইরে থাকতে জানতাম দুধের মধ্যে জল দেয়। জেলখানায় দেখছি জলের মধ্যে দুধ দেয়া হয়। আমি একসময় রসায়নে অনার্সের ছাত্র ছিলাম। আমি ঠিক বুঝতে পারছি না জলের মধ্যে দুধ দিয়ে সাদা করা হয় কী করে। জেলখানায় তো দুধের বর্ণ সাদাই দেখছি।
নিয়ামত উল্লাহ সাহেব হেসে ফেললেন। আমি একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে চাচ্ছিলাম। আমার প্রয়োজন ছিল ভিন্ন ধরনের। ১৯৫২ সালে ঢাকা জেল থেকে মুক্তি পাবার সময় আমি এক ফুটফুটে বিহারী ছেলেকে দেখে গিয়েছিলাম। ছেলেটির নাম রহিম। তখন জেলখানায় অসংখ্য অবাঙালি সিপাহী ছিল। মাত্র দু’জন ছিল পাঞ্জাবের অধিবাসী। আর সবার বাড়ি বিহার এবং উত্তর প্রদেশে। বিহারের ইয়াকুব মিয়া, উত্তর প্রদেশের মাহমুদ হাদিস, উড়িষ্যার রমজান আমার কাছে দুঃখের কথা বলত। ওরা দেশ ছেড়ে এসেছে। দেশের কথা ভুলতে পারেনি। দেশ ছাড়তে গিয়ে সব হারিয়েছে। পাঞ্জাবি আলী মহাম্মদ খান এবং গোলাম খানের প্রায় স্থায়ী ডিউটি ছিল আমাদের ওয়ার্ডে। এরা ব্রিটিশ আমলের সিপাই। গোলাম খান ৮ ঘণ্টা হেঁটে হেঁটে ডিউটি করত। কখনোই বসত না। আলী মহাম্মদ খান তত কঠিন ছিল না।
১৯৫৯ সালে জেলে গিয়ে এদের খোঁজ করলাম। আলী মহম্মদ খান অবসর নিয়ে দেশে চলে গেছে। গোলাম খান কোনোক্রমে চাকরিতে আছে। বৃদ্ধ ইয়াকুব ও রমজান মিয়া এখনও ডিউটিতে এলে অতীতের স্মৃতি রোমন্থন করে। হাদিস জমাদার হয়ে গেছে। মাহমুদ অন্য জেলে চলে গেছে। রহিম ঢাকা জেলেই আছে। একদিন সন্ধ্যার পর রহিমের সঙ্গে আমাদের দেখা। রাতের ডিউটিতে রহিম আমাদের ওয়ার্ডে এসেছিল। সে আমাকে চিনতে পেরেছে। আমি জানালার পাশে বসে পড়ছিলাম। রহিম বলল, বাবু সাব আবার জেলে এলে। তুমি বারবার কেন জেলে আস? আমি বললাম, তুমি দেশ ছেড়েছ কেন? পাকিস্তানে তুমি কী করবে। লেখাপড়া করেছে কতদূর।
রহিম ভাঙা ভাঙা বাংলায় বলল, ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় ১৯৫০ সালে সে বিহার থেকে ঢাকা এসেছে। আত্মীয় স্বজন অনেকেই দেশে রয়ে গেছে। তার ইচ্ছা আছে প্রবেশিকা পরীক্ষা দেবার। আমি বললাম, তুমি পড়তে চাও? আরবি, উর্দু ছাড়া সব বিষয় আমি তোমাকে পড়াব। তুমি বড় জমাদারকে বলো। তোমাকে যেন স্থায়ীভাবে আমাদের এখানে ডিউটি দেয়।
কিন্তু ব্যাপারটি সহজ ছিল না। আমরা রাজবন্দি। রাজবন্দির ওয়ার্ডে কাউকে স্থায়ী ডিউটি দেবার নিয়ম নেই। খুব বিশ্বস্ত হলে ভিন্ন কথা। অন্যথায় রাজবন্দিদের সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে এবং তাদের মারফত রাজবন্দির বাইরে খবর আদান প্রদান করতে পারে। তাই ব্যাপারটি সহজ ছিল না। সে প্রেক্ষিতে সুপারিন্টেনডেন্টের সঙ্গে আমার কথা বলার প্রয়োজন ছিল এবং সেদিন সুপারিন্টেনডেন্ট নিয়ামত উল্লাহ দ্বিমত করলেন না। কিন্তু আমাকে জানানো হলো রহিম আমাদের ওয়ার্ডেই ডিউটি করবে, তবে স্থায়ীভাবে নয়। মাঝে মাঝে তাকে পাল্টিয়ে দেয়া হবে।
