পূর্বে মিয়ানমার সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ইংল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া যান। এবার যেতে হবে পতিতালয়ে। এই পতিতালয়ে যারা আজকে আছে তাদের পূর্বপুরুষ অনেকেই এসেছিল ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের সময় একহাত থেকে আর এক হাত হয়ে। উপমহাদেশে স্বাধীন হওয়ার পর ভারত-পাকিস্তান সরকারের যৌথ কমিশনের হিসাবে দেশ ভাগের সময় উপমহাদেশের ৬ লাখ তরুণী এবং মহিলা পণ্য হয়ে এসেছিল এ দেশগুলোর পতিতালয়ে। আর এদের জীবনের বিনিময়ে যারা নেতা হয়েছিলেন, সরকার গঠন করেছিলেন তাদের সমাধি আছে নয়াদিল্লি আর করাচিতে। এখনো এ সকল সমাধিতে হাজার হাজার দর্শনার্থী আসে প্রতিদিন। কেউ খবর রাখে না এই ভাগাভাগির ফলে কোটি কোটি মানুষের দুর্ভোগের ইতিহাস।
এ পরিস্থিতিতে ১৯৪৮ সালে ঢাকা জেলে এসেছিলাম। মনে ভয় ছিল। পাকিস্তানের প্রথম যুগ। সবকিছু দেখা হয় সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে। সর্বত্রই সন্দেহ-সংশয়।
সেবার ঢাকা জেলে এসে প্রথম সবকিছু গোছানো পেয়েছিলাম। অসংখ্য কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ইতোমধ্যে জেলে এসে গেছেন। ঢাকা জেলে আছেন ঢাকার রণেশ দাশগুপ্ত, ধরণী রায়, বরিশালের নটু ব্যানার্জি আর কংগ্রেস নেতা হরিগঙ্গা বসাক। হরিগঙ্গা বসাকের ঢাকা জেলে মৃত্যু হয় ভুল চিকিৎসার জন্যে। হরিগঙ্গা বসাকের বাড়ি ঢাকার বনগ্রাম লেনে। রাজনীতি করতেন ত্রিপুরার আগরতলায়। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় তিনি ত্রিপুরাকে ভারতে নেবার জন্যে তদ্বির করেছিলেন। সে জন্যে রাগ ছিল পাকিস্তান সরকারের। তাই ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান হওয়ার পরই তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। তিনি ১৯৪৮ সালে জুলাই মাসে ঢাকায় এলেই গ্রেফতার হয়ে যান। তখন ভারত-পাকিস্তান পাসপোর্ট চালু হয়নি। ইচ্ছে হলেই যাতায়াত করা যেত। হরিগঙ্গা বসাক অসুস্থ মাকে দেখতে এসে জেলে গেলেন। আর জেলেই তার মৃত্যু হলো। কেউ আগরতলা গেলে দেখবেন একটি সড়কের নাম হরিগঙ্গা বসাক সড়ক।
১৯৪৮ সালে ঢাকা জেলে এসে প্রথমে ভয় করলেও পরে মানিয়ে নিয়েছিলাম। আর আমাদের মতো কম বয়সের কেউ জেলে না থাকায় আবার সহানুভূতি পেয়েছি সকল মহল থেকে।
তবে ঢাকা জেলে এসে বুঝেছিলাম, পাকিস্তান সরকার কাকে বলে এবং কী তার প্রকৃত চরিত্র। তখন কমিউনিস্ট পার্টির নীতি ছিল সরকারকে এ মুহূর্তে আঘাত করে ফেলে দেবার নীতি। সুতরাং অনশন গণ্ডগোল জেলে প্রতিদিন লেগেই ছিল এবং এর মধ্যে পাকিস্তান সরকার রাজবন্দিদের দেয়া ব্রিটিশ আমলের সকল সুযোগ-সুবিধা বাতিল করে দেয়। রাজবন্দিদের পরিণত করা হয় সাধারণ কয়েদিতে। এ পরিস্থিতিতে ঢাকা জেলে ১৯৪৮-৪৯-৫০ সালে মোট ১২৭ দিন অনশন করেছিল রাজবন্দিরা।
এই পরিস্থিতিতে ১৯৫২ সালের অক্টোবরে আমি মুক্তি পাই। তারপর ১৯৫৪ সালে বরিশালে খুনের মামলার আসামী। ১৯৫৬ সালে মামলা প্রত্যাহার। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক আইন। ১৯৫৯ সালের অক্টোবরে আবার ঢাকা জেলে।
এবার খুব খারাপ লাগছিল না। ঢাকায় রাজনীতি করি। দীর্ঘদিন ছাত্রলীগ করেছি। ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দিয়েছি। আওয়ামী লীগের ভাঙন দেখেছি। ন্যাপ গঠন করেছি। এবার জেলখানায় এসে দেখি অসংখ্য ন্যাপ এবং কমিউনিস্ট পার্টির নেতা জেলে। তারা চেনা। তাই ভিন্ন পরিবেশ।
১৯৪৮ সালে জেলখানায় ছিল কমিউনিস্ট পার্টির সে যুগের জঙ্গি নীতি। যে কোনো প্রকারে তোক জেলখানায় গোলযোগ করা। তাদের তত্ত্ব ছিল জেলখানায় গোলযোগ হলে বাইরের জনতা উত্তেজিত এবং সংগঠিত হবে। সরকার বিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে উঠবে। সরকারের পতন ঘটবে।
এবারের চিত্র একেবারে ভিন্ন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগ পরাজিত হয়েছে। যুক্তফ্রন্টের নামে আওয়ামী লীগ, কৃষক শ্রমিক পার্টি, গণতন্ত্রী দল মন্ত্রিত্ব করেছে। আওয়ামী লীগ ভেঙেছে, গণতন্ত্রী দলের সঙ্গে আওয়ামী লীগের একাংশ মিলে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-ন্যাপ জন্ম নিয়েছে। এ ন্যাপ প্রাদেশিক পরিষদে কখনো আওয়ামী লীগ, কখনো কৃষক শ্রমিক পার্টিকে সমর্থন দিয়েছে। ফলে মন্ত্রিসভার ভাঙন-গড়ন হয়েছে। দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়েছে। আর এক পর্যায়ে সামরিক বাহিনী পাকিস্তানে ক্ষমতা দখল করেছে।
প্রশ্ন আসতে পারে এ জন্যে দায়ী কে? এ অবস্থায় ন্যাপের দায়িত্ব কতটুকু? ন্যাপ বললে কমিউনিস্ট পার্টিকে বাদ দেয়া যায় না। কারণ ন্যাপ গঠনের আগে ও পরে কমিউনিস্ট পার্টি সঙ্গে ছিল। আর ন্যাপের নেতা ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। এ হচ্ছে ন্যাপের প্রথম যুগ।
একদিন গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেল চিঙ্কারে। ঘুম ভেঙে দেখলাম ন্যাপের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে। একপক্ষ বলছেন ন্যাপ গঠন ভুল ছিল। আমাদের আওয়ামী লীগে থাকাই উচিত ছিল। আর একপক্ষ বলছেন-ন্যাপ গঠন ঠিক ছিল। কিন্তু গণতন্ত্রী দলের সম্পাদক সিলেটের মাহমুদ আলীকে ন্যাপের সম্পাদক করা ঠিক হয়নি। আমি বিতর্কে যোগ না দিয়ে জোরে হেসে উঠলাম। সবাই বললেন, হাসছেন কেন? আমি বললাম-দেখুন, একটা কিছু ভুল হয়েছে, নইলে দেশ সামরিক শাসন জারি হবে কেন? আর আপনারা যারা কমিউনিস্ট পার্টি করেন বা সমর্থক আপনাদের গোপন সংগঠন করাই ভালো। আওয়ামী লীগ বা ন্যাপে ঢুকে এ সকল দলকে দখল করবেন বা এ সংগঠনকে আপনার মতো চালাবেন–এ তত্ত্ব সঠিক নয়। এতে আদর্শগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়। নিজের দল থাকে না। ঢাকা জেলে এককালের জাদরেল কমিউনিস্ট শামসুদ্দীন আহমদ আমার সঙ্গে ছিলেন। মুসলিম লীগ দখলের জন্যে তাঁকে আপনারা মুসলিম লীগে ঢুকিয়ে দিলেন। তিনি ঢাকা জেলা মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন। অবিভক্ত বাংলার মুসলিম লীগ রাজনীতিতে গুরুত্ব পেয়েছিলেন। কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টির পর আপনাদের ভাষায় তিনি নাকি পাকিস্তানের গোয়েন্দা হয়ে গেছেন। তিনি জেলে এলেন। তার ওপর আপনাদের এতো অবিশ্বাস যে, তিনি দিন-রাত আমার কাছেই থাকতেন আর দুঃখের কথা বলতেন। তাই রাত দুপুরে এ নিয়ে তর্ক করে লাভ নেই। ভুল সবাই মিলে না করলে কি সাধের পাকিস্তানে এমনি করে বারবার গণতন্ত্র বিপর্যস্ত হয়!
