ঢাকা জেলে ঢুকতেই জমাদার নজির আহমেদের সঙ্গে দেখা। হেসে জিজ্ঞাসা করলেন, আবার আইলেন? এবার কোথায় থাকবেন। আমি বললাম, পুরানা জায়গায় থাকব। অর্থাৎ পুরানো হাজতে। ঢাকা জেলে ঢুকতে বাঁ দিকে পুরানো হাজত। এক নাগাড়ে চার বছর ছিলাম এই পুরানো হাজতে। এই পুরানো হাজতে এককালে ছিলেন আন্দামান ফেরত আগ্নিযুগের বিপ্লবীরা। ব্রিটিশরা ভারত ত্যাগ করার আগে তাদের যুক্তি দিয়ে দেয়।
জেলে ঢুকে রাজবন্দিদের কষ্ট অনেকটা কমেছে। ব্রিটিশ আমলে রাজবন্দিদের বিশেষ সুবিধা দেয়া হতো। ১৯৪৯ সালে মুসলিম লীগ সরকার সে সুবিধা বাতিল করে দেয়। এর বিরুদ্ধে রাজবন্দিরা দীর্ঘদিন সংগ্রাম করে। ১৯৫৬ সালে আবু হোসেন সরকারের আমলে তল্কালীন অর্থমন্ত্রী প্রভাস লাহিড়ীর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠিত হয়। এই কমিটির সুপারিশে স্টেট প্রিজনার রুলস ১৯৫৬ প্রণীত হয়। রাজবন্দিদের গ্রেড ওয়ান, গ্রেড-টুতে বিভক্ত করা হয়। সাধারণ কয়েদিদের থেকে একটু ভদ্রভাবে রাখার চেষ্টা করা হয়। তাই জেল গেটে গিয়েই বুঝলাম জেলে থাকা খুব একটা অসুবিধা হবে না। আমরা গ্রেড ওয়ান রাজবন্দি হিসেবেই জেলখানায় ঢুকলাম। পুরান হাজতে গিয়ে দেখি ইতোমধ্যে অনেক রাজবন্দি সারাদেশে থেকে এনে সেখানে জড়ো করা হয়েছে। সেখানে আছেন শহিদুল্লাহ কায়সার। তিনিও রাজবন্দি। তবে তার বিরুদ্ধে মামলাও আছে আওয়ামী লীগ আমলের। আছেন বরিশালের হীরণ ভট্টাচার্য। সাংবাদিক আলী আকসাদ এবং দিনাজপুরের গুরুদাস তালুকদারসহ অনেকে। বলা হতো গুরুদাস তালুকদারের বক্তৃতা দিতে কোনোদিন মাইকের প্রয়োজন হতো না। তার গলাই ছিল মাইক।
গুরু দা তেভাগা আন্দোলনের নেতা ছিলেন। ব্রিটিশ ভারত ত্যাগ করার আগে সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প এড়িয়ে একটি অগ্নিগর্ভ আন্দোলন গড়ে তুলেছিল কৃষকেরা। প্রাণ দিয়েছিল অকাতরে। নেতৃত্বে ছিল কমিউনিস্ট পার্টি। কিন্তু এ আন্দোলন সামনে এগিয়ে নিতে সেদিন ব্যর্থ হয়েছিল কমিউনিস্ট পার্টি। ব্রিটিশ, কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ এক জোট হয়েছিল এই আন্দোলন দমন করতে। কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে এই আন্দোলন সাম্প্রদায়িক রূপ নিতে, পারে, এ আশঙ্কায় মাঝপথে আন্দোলন বন্ধ করে দেয়। সেই আন্দোলনের এক অদ্ভুত মানুষ গুরু দা। গুরুদাস তালুকদার।
বেলা বাড়তে থাকলে আমরা প্রতীক্ষায় থাকি যদি কোনো চিঠি আসে। জেলখানায় চিঠি হচ্ছে বাইরের খবর। একখানা চিঠির জন্যে মানুষের কতো প্রত্যাশা। কিন্তু গুরু দা’র কোনো চিঠি আসত না। বলতাম গুরু দা, কোনো চিঠি নেই আপনার? গুরু দা বলতেন–পাগল, চিঠি লিখবে কে? বাবা ত্যাজ্যপুত্র করেছিলেন রাজনীতি করি বলে। পোষ্যপুত্র নিয়ে সকল সম্পত্তি দিয়ে গিয়েছিলেন। বাবা ত্যাজ্যপুত্র করার পর কলকাতায় আসি। কলকাতায় ক্যাম্বেল মেডিক্যাল স্কুলে এলএমএফ পড়তাম। এ সময় কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে আসি। একবার যক্ষ্মা হলে রিলিফের জন্যে দিনাজপুরে যাই। আর দিনাজপুর থেকে ফেরা হয়নি। প্রকৃতপক্ষে আমার বাড়ি রংপুর। বাবা জমিদার। বাবা জীবিত থাকা পর্যন্ত আর রংপুর যাইনি। মা জীবিত থাকা পর্যন্ত দিনাজপুর এসে দেখা করতেন। পড়ার খরচ দিতেন এক জেঠতুতো বোন। মাঝে মাঝে চিঠি লিখত। সে মারা গেছে। এখন কে আমাকে চিঠি লিখবে?
গুরু দার কথা শুনতে শুনতে মনে হতো এ কোন রূপকথার কাহিনী। এ কোন আত্মত্যাগ। জেলখানায় গুরু দা’র কোনো চিঠি আসত না। চিঠি লিখবার কেউ নেই বলে। আমার অজস্র চিঠি আসত। চিঠি লিখবার লোক আছে। আজকের প্রজন্মকে এ কাহিনী শুনাতে গেলে বলবে–গল্প। বলবে, এ ত্যাগের কোনো মানে হয় না। আজকের সমাজে এমন লোকের অভাব আছে যারা এটুকু বলবে যে, এ লোকগুলো না জন্মালে, এভাবে সব কিছু না ছাড়লে তোমাদের এমন একটি দেশ হতো না।
এর মধ্যে দীর্ঘদিন পর পশ্চিমবঙ্গ থেকে মা’র একখানা চিঠি এল। এবার তাঁরা নিশ্চিত যে, তার ছেলের একটা ঠিকানা পাওয়া গেছে। বেশ কিছুদিন হয়তো চিঠি লেখা যাবে না। মা লিখেছেন, “দেখিতে দেখিতে ১২ বছর হইয়া গেল, তোমার সঙ্গে দেখা নাই। কোথায় থাকো, কেমন থাকো জানিতে ইচ্ছা হয়। মা’র সাথে শেষ দেখা হয়েছিল ১৯৪৮ সালের ১৯ এপ্রিল। জেলখানায় মা’র চিঠি এল ১৯৬০ সালের জানুয়ারিতে। বরিশালে গ্রেফতার হয়েছিলাম ১৯৪৮ সালেরর ২০ আগস্ট। বিএসসি ফাইনাল পরীক্ষার মাত্র ৮ দিন পূর্বে। পরীক্ষা দেবার অনুমতি মিলেছিল। জেলখানায় পড়ার বই ছিল না। প্রকৃতপক্ষে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান সৃষ্টির পর স্বস্তি ছিল না। নিজেই জানতাম না কী হতে যাচ্ছে। মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, দেশ ভাগ হবে আমার লাশের ওপর দিয়ে। মওলানা আজাদ বলেছিলেন, পাকিস্তান মানব না। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেছিলেন, কাটছাঁট পাকিস্তান মানব না। পাকিস্তান চাই-বাংলা পাঞ্জাব ভাগ করা চলবে না। কারো কথা সত্য হলো না। জিতে গেলে ব্রিটিশ সরকার। জওহরলাল নেহেরু, বল্লভভাই প্যাটেল, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, লিয়াকত আলী ভারতে ব্রিটেনের শেষ বড় লাট লর্ড মাউন্ড ব্যাটেনের কথা শুনলেন। ভারতবর্ষ বিভক্ত হলো। পাকিস্তান এবং ভারত হলো। বাংলা, পাঞ্জাব ভাগ হলো। কেউ জানতে চাইল না এই ভাগাভাগির ফলে সাধারণ মানুষের কী হবে। আমি নতুন প্রজন্মকে অনুরোধ জানাবো-ভারতবর্ষের ইতিহাস পড়ন। জানার চেষ্টা করুন ব্রিটিশ বেনিয়াদের চরিত্র। জানুন, এই উপমহাদেশের ষড়যন্ত্রকারী নেতৃত্বের চরিত্র। এই ভাগাভাগির ফলে পাকিস্তানের করাচি আজ ৮০ লাখ ভারতীয় মোহাজেরের শহর। প্রতিদিন মারামারি ও দাঙ্গা করে বেঁচে থাকতে হয়। ঢাকার জেনেভা ক্যাম্পে মানুষ নামক এক ধরনের প্রাণী জীবনধারণ করছে। এদের জন্ম বাংলাদেশে। এদের পিতা-পিতামহ জন্মেছিল ভারতে। এরা দেশ বিভাগের শিকার। বাংলাদেশে অবাঙালি। এখন পাকিস্তানের নাগরিক। পাকিস্তান সরকার বলে দিয়েছে তাদের তারা নেবে না। কোথায় যাবে তারা, কী হবে তাদের পরিচয়? বেনাপোল থেকে সীমান্ত অতিক্রম করে পশ্চিমে যান, দেখবেন স্টেশনে স্টেশনে অসংখ্য মানুষের ভিড়। রেললাইন ধরে পাঞ্জাব-পাকিস্তান সীমান্ত পর্যন্ত যান–অন্তত একজন মানুষ পাবেন, ওদের পরিচয় এককালের এই পাকিস্তানের হিন্দু। জীবনযুদ্ধে পরাজিত হয়ে খাঁটি অবাঙালি হয়ে গেছে অনেকে বসনে, ভাষায়।
