তাও কাঁটায় কাঁটায় ত্রিশ দিন। ২৪ সেপ্টেম্বর ইত্তেফাকে লেখা দিয়েছিলাম। ২৪ অক্টোবর কথায় কথায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে ঢুকেছিলাম। সকাল দশটা থেকে প্রায় রাত আটটা পর্যন্ত গল্প করেছি। চা পেয়েছি। প্রায় ভুলে গিয়েছিলাম যে কলাভবনে আমার প্রবেশ নিষিদ্ধ। এক সময় মধুদাকে চিৎকার করে বললাম, মধুদা এক কাপ চা। মধুদা বললেন, ৯৯ কাপের দাম দিয়ে যান। কারণ আসুন আর না আসুন ৯ কাপের হিসাব খাতায় লেখা থাকবেই আপনার নামে। মধুদা শুধু আমাদের চা খাওয়াতেন না। চোখে চোখে রাখতেন। হোটেলে ফিরতে রাত হলো।
ভোর ৪টার দিকে ঘুম ভেঙে গেল টর্চের আলোয়। আমার পাশের খাটে অজয় রায়। পাশের কক্ষে রফিকুল্লাহ চৌধুরী। আমি চিৎকার করে উঠলাম, কোন শূকরের বাচ্চা টর্চ ফোকাস করছে। বাইরের দিক থেকে একটি গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো, নির্মল বাবু আপনার মেজাজ কি কোনোদিন ঠাণ্ডা হবে না। দুয়ার খুলুন। দুয়াল খুলে দেখলাম রমনার ওসি। সঙ্গে বেশ ক’জন পুলিশ। বললেন, চলুন। সূর্যের আলো ফুটবার পূর্বে হোটেল ডি-লাক্স থেকে বের হলাম। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলেন অজয় রায়, রফিকুল্লাহ চৌধুরী ও হোটেলের অন্যান্য বন্ধুরা। সামনে এগিয়ে দেখি পূর্বের সেই আইবির ভভদ্রলোক। যার সঙ্গে তর্ক হয়েছিল কদিন আগে। জিজ্ঞাসা করলাম, কবে বের হব। ভভদ্রলোক হেসে জবাব দিলেন, যদি কোনোদিন পাকিস্তানে গণতন্ত্র আসে–আপনি মুক্তি পাবেন শেষ ব্যাচে। তোপখানা রোডে তখন ঢাকা জেলার গোয়েন্দা অফিস। গোয়েন্দা অফিসে পৌঁছে দেখি তকালীন ন্যাপ নেতা (বর্তমান আওয়ামী লীগ নেতা) মহিউদ্দিন আহমদ বসে আছেন। বসে আছেন নারায়ণগঞ্জের ন্যাপ নেতা শফিক খান ও হাসান জামিল। বুঝলাম, আমি একা নই। সারা দেশে সেদিন অসংখ্য রাজনৈতিক নেতা ও কর্মী গ্রেফতার হয়েছে। শুনতে পেলাম–সরকারের ধারণা ২৭ অক্টোবর নাকি আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আমাদের একটা কিছু করার কথা ছিল। পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি হয়েছিল ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর। প্রথম প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন ইস্কান্দার মীর্জা। ২৭ অক্টোবর বন্দুকের মুখে তাকে সরিয়ে দেয় সামরিক জান্তা। আইয়ুব খান পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হন। ১৯৫৯ সালের ২৭ অক্টোবর ছিল আইয়ুব খানের ক্ষমতা দখলের এক বছর। গোয়েন্দা বাহিনীর ধারণা ছিল। এই দিন হয়তো আমরা গোলমাল করবো।
কিন্তু এ ধরনের কোনো চিন্তা আমার মাথায় ছিল না। ন্যাপ এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কিনা তাও জানি না। ছাত্রদের মধ্যে তেমন কোনো উদ্যোগ বা আয়োজন দেখিনি। এ ধরনের কোনো চিন্তা থাকলে আমি জানতাম। আজো আমার মাথায় আসছে না, কেন এ ধরনের ধারণা সেদিন গোয়েন্দা বাহিনীর হয়েছিল।
গোয়েন্দা অফিসে আমাকে জেরা শুরু করলেন জনাব মহিউদ্দিন চৌধুরী। তিনি আওয়ামী লীগ নেতা কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীর পিতা। আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আমাকে গ্রেফতার করলেন কোন ভিত্তিতে? এ পর্যন্ত কোনো ছাত্রনেতাই গ্রেফতার হয়নি। তাহলে আমাকে ধরা হলো কেন? তিনি বললেন, আমরা অমুসলমান ছাত্রনেতাদের তালিকা প্রণয়ন করেছিলাম। এ তালিকায় ছিল মুকুল সেন, চিত্ত ভট্টাচার্য্য, সত্য ভট্টাচার্য্য এবং স্বদেশ বসু। তারা সকলেই জগন্নাথ হলের ছাত্র। একমাত্র আপনিই ঢাকা হলের ছাত্র। খোঁজ নিয়ে দেখা গেল মুকুল সেন ভারতে চলে গেছেন। চিত্ত বাবু, সত্য বাবু গভীরভাবে পড়াশুনা কছে। স্বদেশ বসু রাজনীতি ছেড়ে দিয়েছেন। সুতরাং বাকি থাকলেন আপনি এবং আপনাকেই গ্রেফতার করতে হলো।
আমি বললাম, দেখুন আপনাদের একটা ভুল হচ্ছে। আমি কিন্তু এখন আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নই। ইন্সপেক্টর চৌধুরী চমকে উঠলেন। বললেন, মানে? আমি বললাম, মানে হচ্ছে–আমি জানতাম, সামরিক শাসনে আমি গ্রেফতার হবই। আমি বিজ্ঞানের ছাত্র; জেলে গিয়ে পরীক্ষা দিতে পারব না। তাই বেশ কিছুদিন আগে আমি ঢাকা সিটি নাইট কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম। আমি চাই এ কথাগুলো আপনি আপনার রিপোর্টে লিখুন। সরকার এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানুক। ফলে আমার পরীক্ষার অনুমতি পাওয়া সুবিধা হবে।
এবার মহিউদ্দিন চৌধুরী ভিন্ন কথা শুরু করলেন। তিনি জানতে চাইলেন আমার মা কোথায়? আমি বললাম, পশ্চিমবঙ্গে। এবার তিনি বললেন, তাহলে আপনি এদেশে কেন আছেন? আমি বললাম, আপনার জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল, আপনার মা দেশ ছেড়ে কেন গেলেন। অথচ উল্টো আপনি জানতে চাইলেন আমি কেন এদেশে আছি। তাহলে তো আমিও আপনাকে জিজ্ঞেস করতে পারি আপনি কেন পাকিস্তানে আছেন?
পাশে শফি খানকে জিজ্ঞাসাবাদ করছিলেন আরেকজন ইন্সপেক্টর। এবার তিনি কথা বললেন। বললেন, চৌধুরী সাহেব, আপনি কি বাতাসে বড় হয়েছেন? ১২ বছর আগে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছে। ১২ বছর পর আপনি নির্মল সেনকে জিজ্ঞাসা করছেন উনি পাকিস্তানে আছেন কেন।
কথায় কথায় বেলা হয়ে গেল। গোয়েন্দা অফিসেই খাবার ব্যবস্থা হলো। বিকালের দিকে আমাদের ঢাকা জেলে পাঠানো হলো। জেলে বিভিন্ন ধরনের বন্দিদের বিভিন্ন বিভাগ আছে। আমরা সিকিউরিটি আইন অর্থাৎ নিরাপত্তা আইনে আটক আছি বলে আমাদের বিভাগের নাম সিকিউরিটি বিভাগ। এই সিকিউরিটি বিভাগের তত্ত্বাবধানে এর আগে সাড়ে ৪ বছর আমি ঢাকা ছেলে ছিলাম। আমাদের বিভাগে একজন জমাদার ছিল। জমাদারের নাম নজির আহমেদ। নজির আহমেদের বাড়ি ভারতের বিহারে। কিন্তু দেখতে পাঞ্জাবিদের মতো। সব সময় হাসিখুশি। কিন্তু সরকারের প্রিয়পাত্র। তার কাছ থেকে কোনো খবরই পাওয়া মুশকিল।
