কিছুদিন পর বিশ্ববিদ্যালয় ঢুকতেই প্রোক্টর নুরুল মোমেন সাহেব ডাকলেন। বললেন, তোমার সঙ্গে কথা আছে। দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম। মধুর ক্যান্টিনে তখন অনেক ছাত্রের ভিড়। আমতলায়ও তখন অনেক ছাত্রছাত্রী দাঁড়িয়ে আছে। নুরুল মোমেন সাহেব বললেন, তুমি কিছু মনে করো না। তোমার ভালোর জন্যেই একথা বলছি। ভাইস চ্যান্সেলর বিচারপতি হামিদুর রহমান তোমার সম্পর্কে একটি নির্দেশ পাঠিয়েছেন। কলাভবনে তোমার প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তুমি মধুর ক্যান্টিন বা আমতলায় আসতে পারবে না। তুমি বিজ্ঞানের ছাত্র। তোমাকে কার্জন হল এলাকায় থাকতে হবে। আমি বললাম, আমি তাহলে কোথায় যাব? আমাকে ঢাকা হল থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। এখন কলাভবনে আমার প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হলো। আমার তো চা খাবার জায়গাটুকুও রইল না। এ নির্দেশ আমি মানব না। আর এ নির্দেশ আমি না মানলে আপনারা কী করতে পারেন তাও আমি দেখতে চাই।
নুরুল মোমেন সাহেব আমার কথায় কিছুটা বিমর্ষ হলেন। বললেন, আমার করার কিছু নেই। আমি তোমাকে ভাইস চ্যান্সেলরের নির্দেশ জানালাম। তুমি কলাভবনে ঢুকলে আমি হয়তো খেয়াল করব না। কিন্তু তোমাকে নজর রাখবার জন্যে বহু লোক এই কলাভবনে আছে। তাদের তুমি এড়াতে পারবে না।
খানিকটা দমে গেলাম। তখুনি কলাভবন ছেড়ে গেলাম না। মধুর ক্যান্টিনে গিয়ে বসলাম। কয়েকজন মুখ চেনা লোকও আমার সঙ্গে মধুর। ক্যান্টিনে ঢুকল। ওদের মধ্যে একজন আমার বড় চেনা। তিনি ডাকসুর সদস্য। আমাদের বিপরীত প্যানেল থেকে নির্বাচিত। যতদূর বুঝেছি তিনিই উদ্যোগ নিয়ে আমার বিরুদ্ধে এ নির্দেশটি করিয়েছেন। নুরুল মোমেন সাহেব আমার সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি ছায়ার মতো পেছনে পেছনে ঘুরেছেন।
দীর্ঘদিন পর তিনি কথায় কথায় তাঁর কৃতকর্মের জন্যে দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। পরবর্তীকালে সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট এবং রাজাকার হিসেবে জেলও খেটেছেন। মধুর ক্যান্টিনে ঢুকতেই দেখি আহমেদুর রহমান বসে আছেন। তাঁকে ঘটনা খুলে বললাম। তিনি বললেন, আজই আমার সঙ্গে ইত্তেফাকে চলুন। আজই আপনাকে সম্পাদকীয় লিখতে হবে। এভাবে জেলের বাইরে থাকতে পারবেন না। তাঁর কথামতো সেদিন ইত্তেফাকে গেলাম। সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার সঙ্গে দেখা হলো। বললেন, যা খুশি একটা সম্পাদকীয় লিখে যাও। সংস্কৃতির ওপর একটা সম্পাদকীয় লিখে হোটেলে চলে গেলাম।
১৯৫৯ সাল, সেপ্টেম্বর মাস। আনুষ্ঠানিকভাবে আমার সাংবাদিকতা শুরু। এর আগে বরিশালে ব্রজমোহন কলেজে পড়বার সময় কলকাতায় সাপ্তাহিক গণবার্তায় লিখেছি। সাপ্তাহিক যুগবাণীতে দীর্ঘদিন সম্পাদকীয় লিখেছি। তবে কারও বেতনভুক্ত কর্মচারি ছিলাম না। ইত্তেফাকেই আমার অর্থের বিনিময়ে সাংবাদিকতা শুরু। তবে ইত্তেফাকে ঢুকে বুঝলাম, শেষ পর্যন্ত গ্রেফতার ঠেকানো যাবে না।
আমি ইত্তেফাকে ঢুকবার সপ্তাহখানেকের মধ্যেই সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া গ্রেফতার হয়ে গেলেন। তখন তিনি মোসাফির নামে রাজনৈতিক মঞ্চে লিখতেন। পাকিস্তান সরকার ইত্তেফাককে বরদাস্ত করতে পারত না। দেশে মানিক মিয়ার রাজনৈতিক মঞ্চ ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয়। এই মঞ্চের জন্যেই ইত্তেফাকের কাটতি বেশি ছিল এবং রাজনৈতিক মঞ্চে লেখার জন্যেই মানিক মিয়াকে জেলে যেতে হয়েছিল।
সম্পাদক সাহেব গ্রেফতার হবার পরে আর একটি ঘটনা ঘটল। আমি সচিবালয়ের সামনের রাস্তা দিয়ে পুরানা পল্টন মোড় থেকে প্রেস ক্লাবের দিকে যাচ্ছিলাম। ডানপাশে তখন ঢাকা জেলা গোয়েন্দা অফিস ছিল। একজন অফিসার বের হয়ে এলেন। মাঝে মাঝে তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে। তিনি পথ ঘাটে বিরক্ত করতে অভ্যস্ত। আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনারা নাকি নতুন রাজনীতি শুরু করবেন। এবার হবে সাংস্কৃতিক আন্দোলন। আপনারা এনএসএফ-এর সঙ্গে এক হয়ে রাজনীতি করবেন। আমার মেজাজটা তিরিক্ষি হয়ে গেল।
আমরা তখন এনএসএফকে সামরিক বাহিনীর দালাল বলতাম। বললাম, পায়ের স্যান্ডেল দেখেছেন। আর একবার এ কথা উচ্চারণ করলে স্যান্ডেল খুলে লাগিয়ে দেব। ওই রাস্তা দিয়ে তখন ইত্তেফাকের ফটোগ্রাফার মিজানুর রহমান সাইকেলে যাচ্ছিলেন। তাঁকে ডেকে বললাম, মিজানুর দাঁড়াও। শোন এ ব্যাটা বলছে কী! আর একবার উচ্চারণ করলে কিন্তু বিপদ হবে। মিজান আমাকে থামাল। গোয়েন্দা বিভাগের ভভদ্রলোক চলে গেলেন। ইত্তেফাকে দিন মন্দ কাটছিল না। সামরিক আইনের কড়াকড়ি। সম্পাদক জেলে। আমাদের লিখতে হতো সচেতন হয়ে। তখন সরাসরি কিছু লেখা যেত না। সবই লেখা হতো ইঙ্গিত এবং ইশারায়। এর মধ্যে আবার সামরিক আইনের ৫২ ধারা আছে। এ ধারার জন্যে ইশারায় ইঙ্গিতে কিছু বলা যাবে না। তবুও ইত্তেফাকে উপসম্পাদকীয় কলামে আমরা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে লিখতাম। মানুষ তখন সরকারবিরোধী লেখা চাইত। তবে মনে আছে একদিন আমি বৃষ্টি নিয়ে একটি সম্পাদকীয় লিখছিলাম। লিখেছিলাম, সেই যে শ্রাবণের শেষে মেয়েকে পরের বাড়ি পাঠিয়েছিলাম ভরা বৃষ্টির সময় তখন কি কেউ জানত যে ওই মেয়ে কলকাতার শাড়ি পরে বাড়ি ফিরে আবার একদিন কাঁদতে বসবে। সম্পাদক সাহেব খুব খুশি হলেন জেলখানায়।
মরহুম আহমেদুর রহমান তার মিঠেকড়া কলামে আফ্রিকার কোনো দেশের সামরিক শাসনের তীব্র সমালোচনা করে লিখতেন ল্যাতিন আমেরিকার গণতন্ত্রের ওপর, এমেলার বিরুদ্ধে। মানুষ উৎসাহিত হতো। গোগ্রাসে গিলত। সামরিক আমলে ঢাকায় বস্তি উচ্ছেদ আরম্ভ হলো। আমি লিখলাম পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হচ্ছিল বর্ধমানের মহারাজাদের বসতবাড়িতে। ফলে হাজার হাজার পায়রা বাস্তুচ্যুত হয়। এই পায়রা বাস্তুচ্যুত হওয়া ভিত্তি করেই চলে এলাম ঢাকায় বস্তি উচ্ছেদের ঘটনায়। মনে হয় তখনি আমরা অনেকে খুঁচিয়ে লিখতে শিখেছিলাম বা শুরু করেছিলাম। সে অবরুদ্ধ হাতের লেখা। লেখা যায় না, লেখার নিয়ম নেই। লেখা শাস্তিযোগ্য, তবুও লিখতে হবে। পাঠকের চাহিদা পূরণ করতে হবে। সে অভ্যাস সহজে যায় না। স্পষ্ট না লিখে ইশারায় ইঙ্গিতে লিখেছি। তবে ঘুরিয়ে লিখলেও কিছুদিন ইত্তেফাকে ভালো ছিলাম।
