কোনো কথা না বলে সেদিন চলে এসেছিলাম। ভোর বেলা কাগজে দেখেছি। হলেও রেডিও ছিল না বা রেডিও শুনবার তেমন অভ্যাসও ছিল না। কিন্তু সে বাসায়ও আমার পড়ানো হলো না। তবে ছাত্রটি ভালো ছিল যাকে ইরেজিতে বলে Exeptionally Brilliant. আমিই একমাত্র তাকে পড়তে বসাতে পেরেছিলাম। আমি বললাম, ঠিক সাতটায় আমি আসব। সে বলত ঠিক ঠিক সাতটায় এসে পড়ব আমি। সেন্ট গ্রেগরি স্কুলের ফোর্থ স্ট্যান্ডার্ডের ছাত্র। প্রতিদিন ঠিক সাতটায় য়ার খুলে দেখত আমি দাঁড়িয়ে।
এভাবে একদিন পড়াতে গিয়ে দেখলাম আমার ছাত্র ও তার ছোট ভাই কাঁদছে। কাঁদার কারণ বাবা-মা তাদের বাসায় রেখে সিনেমায় গিয়েছেন। আমি আর সেদিন পড়ালাম না। পরদিন পড়াতে গিয়ে ছাত্রদের মাকে ডেকে বললাম–আমি আর পড়াব না। তিনি অবাক হলেন। বললেন, কেন? আমি বললাম, দেখুন আমার ছাত্র ২৪ ঘন্টার মধ্যে দু’ঘন্টা আমার কাছে থাকে। বাকি ২২ ঘন্টা আপনাদের কাছে। দুঘন্টা করে আমার কাছে রেখে ২২ ঘণ্টার ক্ষতি আমি পুষিয়ে দিতে পারব না। ছেলে দু’টি কাল কাঁদছিল। আমার করার কিছু ছিল না। আপনারা সিনেমায় গিয়েছেন। ওরা পড়েনি। ভদ্রমহিলা এক অদ্ভুত বিষয় নিয়ে থাকিয়ে থাকলেন। আমি বুঝতে পারছিলাম, আমি আমার সীমানা লজ্জন করছি। এসব ব্যাপারে নাক গলানো আমার কথা নয়। তাই তিনি অত্যন্ত ভদ্র এবং তার সঙ্গে আমার কথা মেনে নিলেন। আমি চলে এলাম। দীর্ঘদিন জেল থেকে আসার পর একটি ফোন এসেছিল আর এক বন্ধুর মারফত। অনুরোধ জানানো হয়েছিল, আপনার ছাত্র ম্যাট্রিক দিচ্ছে, একবার আসবেন। আমি জবাব দিয়েছিলামনা।
অর্থাৎ শেষ টিউশনি চলে গেল। বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক নেই। সারাজনম কাকাদের ওপর জুলুম করেছি। তারা কোনোক্রমে গ্রামে আছেন। মা-ভাইবোন সকলে কলকাতা। মাঝে মাঝে চিঠি আসে। আমার চিঠি লেখা হয় না। মা অনেকটা নিশ্চিত হন আমি জেলে গেলে। কারণ অন্তত একটি ঠিকানা তাদের তখন জানা থাকে।
আবার ক্ষিতীশ দা’র শরণাপন্ন হলাম। এবার টিউশনি জুটল অ্যাডভোকেট জেনারেল বিএ সিদ্দিকীর বাসায়। মাহুতটুলীতে বাসা। সপ্তাহে ৬ দিন ঢাকা হল থেকে হেঁটে যেতে হয়। আর এ সময় রুহুল আমিন সাহেব এসে ঢাকায় উপস্থিত হলেন। নিজে বাঁচতে হবে, তাকে বাঁচাতে হবে। আত্মীয়-স্বজন বারবার এসেছেন। আমি তাদের ফিরিয়ে দিয়েছি। কারণ যে মানুষটি দলের জন্যে জীবন দিতে বসেছে, সারা জীবন নিজের পরিবার থেকে নিয়েছেন অথচ কিছু দিতে পারেননি। তাঁর বিপদে তাঁকে আবার সংসারে ঠেলে দেবার মতো অরাজনৈতিক, কিছু হতে পারে আমি কোনোদিন তা মনে করিনি।
রহুল আমিন কায়সারকে মিটফোর্ডে ভর্তি করলাম। আবার নিজের কক্ষে উঠলাম ঢাকা হলে। দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিরাতে হাউজ টিউটর ডেকে পাঠাতেন। বলতেন, তুমি না গেলে আমাদের চাকরি নিয়ে টানাটানি হবে। প্রতিদিন ভাইস চ্যান্সেলর হামিদুর রহমান তোমার খোঁজ নিচ্ছেন। আমি বললাম, কোথায় যাব বলুন। কোথাও বাসা পাওয়া যায় না। আর বাইরে গেলেই গ্রেফতার। এবার শেষ প্রস্তাব দিলেন হল কর্তৃপক্ষ। ঢাকা হলের দক্ষিণের রেললাইন পার হয়ে নিমতলা। নিমতলাতে একটি হোটেল ডি-লাক্স। ওই হোটেলে তুমি থাকলে তোমার খাবার আমরা ঢাকা হল থেকে পাঠাব। হোটেল ডি-লাক্স-এ তখন আমার ঢাকা হলের বন্ধু অজয় রায় থাকতেন। তিনি পদার্থবিদ্যায় এমএসসি পাস করে থিসিস করছেন। তার কক্ষেই একটি সিট পেলাম। মাসিক ভাড়া ৩০টাকা। আমার ভাড়া পাঠাবেন হল কর্তৃপক্ষ।
শেষ পর্যন্ত ঢাকা হল ছাড়তে হলো। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আমাকে ছাড়লেন না। একদিন সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে ঢুকতেই প্রয়াগ ছুটে এল। দূরে দাঁড়ানো ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক এটিএম মেহেদী। মেহেদী এনএসএফ নেতা মহসিনের সঙ্গে কথা বলছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমতলার কাছে দাঁড়িয়ে আছে এনএসএফের আক্তার আহাদ এবং ছাত্র ইউনিয়নের আমানউল্লাহ। প্রয়াগ ডাকসুর কর্মচারী। প্রয়াগ বলল, আপনি এখুনি এখান থেকে চলে যান। আপনাকে নিয়ে কথা হচ্ছে। আপনার পক্ষে কথা বলছেন মেহেদী সাহেব ও আমানউল্লাহ সাহেব। যে কোনো সময় বিপদ ঘটে যেতে পারে। আমি ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম। পালিয়ে গিয়ে লাভ নেই। সব কিছু সামনাসামনি মোকাবেলা করা ভালো।
এর মধ্যে আমানউল্লাহ সাহেব আমার দিকে এগিয়ে এলেন। বললেন, চলুন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে যাই। গুলিস্তান গিয়ে চা খাব। বুঝলাম, আমানউল্লাহ সাহেব আমাকে নিরাপদ এলাকায় নিয়ে যেতে চাইছেন। তার সঙ্গে গুলিস্তান গেলাম। চা খাওয়া হলো না। নিমতলা হোটেলে ফিরে এলাম।
পরদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে এলাম। মধুর ক্যান্টিনে আহমেদুরের সঙ্গে দেখা হলো। আহমেদুর রহমান দৈনিক ইত্তেফাকের সহকারি সম্পাদক। ভিমরুল ছদ্মনামে উপসম্পাদকীয় লেখেন। আমাকে বললেন, বাঁচবেন কী করে। এভাবে তো বাঁচা যাবে না। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ক্ষেপে গেছে। পুলিশ অপ্রসন্ন। একটি মাত্র টিউশনি। কেউই প্রকাশ্যে রাজনীতি করছে না। এভাবে চললে গ্রেফতার হয়ে যাবেন। কোথাও একটা চাকরি নিন। আহমেদুর রহমানকে আমরা অনেকেই ‘মামু’ বলে ডাকতাম। বললাম, মামু, আমি কারো অধীনে চাকরি করব না। আমার টিউশনি করাই ভালো। যেদিন খুশি যাব। যখন খুশি ছেড়ে দেব। মামু বললেন, আমি ইত্তেফাকে কথা বলেছি। ইত্তেফাকের সহকারি সম্পাদক আপনার বন্ধু এমএ আউয়াল। সে আপনাকে ইত্তেফাকে চাকরি দিতে রাজি। আপনি সহকারি সম্পাদক হিসেবেই ইত্তেফাকে যোগ দেবেন। আমি রাজি হলাম না। আহমেদুর রহমান ক্ষুণ্ণ হলেন।
