১৯৫৮ সালের প্রথম দিকে হঠাৎ একদিন এসে হাজির হলেন ঢাকা হলে। রুহুল আমিন কায়সার আবার অসুস্থ। কিন্তু কী করব? কোথায় রাখা যাবে? মিটফোর্ড হাসপাতালে কোনো সিট নেই। চিকিৎসক ড. নূরুল ইসলাম রোগী দেখে বললেন, এ মানুষ বেঁচে আছে কী করে। একটি লাংগস নেই। অপরটির এক-তৃতীয়াংশ চলে গেছে। ইনজেকশন দিলে ৬ ডিগ্রি জ্বর ওঠে। অনেক কষ্টে তাকে ভর্তি করা হলো বেআইনিভাবে, সাধারণ রোগী ওয়ার্ডে চারিদিকে কাপড় ঘিরে দিয়ে। কিছুদিন পরে টিবি ওয়ার্ডে সিট পেয়েছিলেন। সে সিটে ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির কালীদাস চক্রবর্তী। কালীদাস চক্রবর্তী মারা যাওয়ায় সে সিট রুহুল আমিন কায়সারকে বরাদ্দ করা হয়।
কিন্তু যক্ষ্মা রোগীর ওষুধ কে জোগাবে? এতো পয়সা কোথা থেকে আসবে? আমার টিউশনি জুটছে না। জুটছে না, ঠিক নয়। থাকছে না। কারণ কারো সঙ্গে আমার বনছে না। একটি টিউশনি পেলাম পুরানা পল্টনের জামায়াতখানার পেছনে। ইসমাইলিয়া সম্প্রদায়ের ছাত্র-ছাত্রী। সে পরিবারটি বিরাট ব্যবসার মালিক। একদিন অনুপস্থিত হওয়ায় জিজ্ঞাসা করেছিল : Why did you not come yesterday? আমি জবাব দিলাম, I will not come from tomonow. কারণ আমার টিউশনির শর্ত ছিল আমি সপ্তাহে সাতদিন আসতে পারি কিন্তু একদিন না এলে আমাকে জিজ্ঞাসা করা যাবে না, আমি কেন আসিনি। কারণ আমি কারো পিতার কোম্পানিতে চাকরি করি না।
আমার ছাত্র-ছাত্রীরা ভড়কে গেল। তাদের মা এলেন। বললেন, এমন আর হবে না। আমি বললাম, আপনারা ভবিষ্যতে কোনোদিন বিপদে পড়লে আমার কাছে আসবেন। আমি সাহায্য করব। সত্যি সত্যি বছরখানেক বাদে এক মাসের জন্যে তাদের আবার পড়াতে গিয়েছিলাম। তবে ওরা বড় হিসেবি। প্রথমবার ২৭ দিন টিউশনি করার পর ছেড়ে দিলাম ওরা আমাকে ঠিক ২৭ দিনের টাকা হিসাব করে দিয়েছিল। দ্বিতীয়বার পড়িয়েছিলাম ৩৬ দিন। এবার তারা গুণে গুণে ৩৬ দিনের টাকা দিয়েছিল। ঢাকা হলে এসে এবার ৩৬ দিনের টাকা নিয়ে পুরানা পল্টনে ওদের বাসায় গেলাম। ওদের মাকে ডাকলাম। বললাম, দেখুন ব্যবসা করেন ভালো কথা। এমন ব্যবসা করলে ছেলেমেয়েদের মানুষ করতে পারবেন না। ওরা ব্যবসায়ী হবে, মানুষ হবে না। আমি ৩০ দিনের টাকা পেলেই ৩৬ দিন পড়াতাম। মাস শেষ হবার পর ৬ দিনের জন্যে কোনো টাকা নিতাম না। এই বলে ৬ দিনের টাকা দিয়ে চলে এলাম। ওরা ছিল এককালে ঢাকার অভিজাত লাসানি হোটেলের মালিক। বায়তুল মোকাররমের হোভা দোকানের মালিক। দেশ স্বাধীন হবার পর ওদের খোঁজ করতে গিয়েছিলাম। দেখলাম ওদের কর্মচারিরাই ওদের সকল দোকানের মালিক হয়ে বসেছে। কর্মচারিরা অবশ্যই জন্মসূত্রে বাঙালি।
এমনি করেই আর এক টিউশনি ছাড়তে হলো। মতিঝিল কলোনিতে দুজন ছাত্রী পড়াতে হবে। টাকার বড় অভাব। ত্রিশ দিন পড়ালে ত্রিশ টাকা। হলের চার্জ ৩২ টাকা। তারপর অন্যান্য খরচ। প্রথমদিন পড়াতে গিয়ে দেখলাম অনেক খাবার ব্যবস্থা। বললাম, খাবার কম দিয়ে বেশি টাকা দিলে সুবিধা হয়। আর প্রতিদিন এ ধরনের খেতে হলে খাবার পাটটা এখানেই শেষ করতে হয়। টিউশনি বাড়ির লোক রাজি হলো না। এক, দুই, তিনদিন দেখলাম। তারপর বললাম, আমি ৩০ দিনের পর আর পড়াব না। ছাত্রীরা কাঁদল। আমার মনে হচ্ছিল টিউটর বলে যেন সবাই করুণা করে। ত্রিশ দিনের ত্রিশ টাকা নিয়ে চলে এলাম। এরপর একেবারে বেকার।
এবার এগিয়ে এলেন ক্ষিতীশ দা। ক্ষিতীশ চৌধুরী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে সেকালে স্টেডিয়ামের মতো কিছু ছিল না। পশ্চিম দিকে কিছু কক্ষ ছিল। ওই মাঠ দিয়ে হাঁটতে গেলে একটি পরিচিত লোক চিৎকার করে উঠতেন খাঁটি ঢাকার আদি ভাষায়। ক্ষিতীশ দা ডাকছেন। ক্ষিতীশ দা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্পোর্টসের সঙ্গে আছেন। কী তার পদ, কী তার পরিচয় জানি না। এককালে ঢাকা হলের ছাত্র ছিলেন। খেলাধুলার ক্ষেত্রে সকলের দাদা। ক্ষিতীশ দার এলাকায় গেলে চা খেতে হবে। গল্প শুনতে হবে। পাকিস্তানের বাঘা বাঘা সকল সিএসপি আমলারা তাঁর হাতে গড়া। সকল এলাকায় তাঁর যাতায়াত। মনে হতো জন্মসূত্রে ক্ষিতীশ দা হয়তো ঢাকার কোনো সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলে ছিলেন। একদিন ডেকে বললেন, কেমন আছ? বললাম ভালো নেই। টিউশনি প্রয়োজন। ক্ষিতীশ দা চমকে দিয়ে অট্টহাসি করে উঠলেন। বললেন চিঠি দিচ্ছি, এখন যাও। আমি ফোন করে দেব। এক সম্ভ্রান্ত মানুষের বাড়িতে পড়াবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এককালের সেরা ছাত্র। এ কালের সেরা আমলা। ১৯৪৯ সালের ব্যাচের সিএসপি। সত্যি সত্যি বেইলি রোডের বাড়িতে ঢুকে বুঝলাম অন্তত একজন শিক্ষিত লোকের বাড়িতে এসেছি। তার বাড়ির বসবার রুমে ফ্রিজ বা আলমারি ভর্তি কাপ, গ্লাস, প্লেটের ভিড় নেই। শুনেছি, তিনি বলে রেখেছেন ছাত্র জীবনে নিজে টিউশনি করেছি। টিউশনিতে মর্যাদা নেই। তাই টিচার এলে দূরে রবীন্দ্রসঙ্গীতের রেকর্ড বাজাবে। একটি পরিবেশ সৃষ্টি করবে পড়াবার। কোনোদিন যেন অনুভব করতে না পারেন যে তিনি এখানে বহিরাগত এবং শিক্ষক। কথাগুলো বলেছিলেন গৃহকত্রী। ১৯৫৮ সালের ৮ অক্টোবর ভোর বেলা ওই গৃহকত্রী এসে বলেন–স্যার, আজ আপনার পড়াতে হবে না-সাহেব বলেছেন, আপনি হয়তো জানেন না যে কাল রাতে দেশে সামরিক আইন জারি হয়েছে। আপনি হলে চলে যান।
