আমার ওপর বিপদ এল ভিন্ন দিক থেকে। আমাকে প্রভোস্ট বাসায় ডাকলেন। কিছুদিন ধরে শুনছিলাম ভাইস চ্যান্সেলর আমার খোঁজ করছেন এবং আমাকে হল থেকে বের করার কথা বলছেন। তখন ভাইস চ্যান্সেলর ছিলেন বিচারপতি হামিদুর রহমান। প্রভোস্ট বললেন, আপনি এনায়েতুল্লাহ খানকে সমর্থন করতে পারবেন না। আপনি সমর্থন প্রত্যাহার করলে এনায়েতুল্লাহ জিততে পারবে না। আমি বললাম, তা হয় না। আর আপনার কথা আমার শোনারও কোনো প্রয়োজন নেই। প্রভোস্ট বললেন, আপনার ভালোর জন্যে বলছি। আমার কথা না শুনলে আপনার বিপদ হতে পারে।
আমি জানতাম প্রভোস্টের কথা না রাখলে হয়তো হল থেকে আমাকে বের করে দেয়া হবে। আমি বললাম, এনায়েতুল্লাহ আমাদের প্রার্থী। তাকে পাস করাতেই হবে।
প্রভোস্ট-এর বাসা থেকে হলে ফিরলাম। দেখলাম হলের গেট একটি নোটিস টাঙানো আছে। লেখা ২৪ ঘন্টার মধ্যে নির্মল সেনকেহল ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ দেয়া যাচ্ছে।
নোটিস দেখে আমি রুমে চলে গেলাম। কাউকে কোনো কথা বললাম না। চুপচাপ শুয়ে থাকলাম। রাত ১২টার দিকে হাউস টিউটর ড. কামরুজ্জামান আমাকে ডেকে পাঠালেন। বললেন, তুমি নোটিস দেখেছ? আমি বললাম, দেখেছি। হাউস টিউটর বললেন, তোমাকে কাল হল ছেড়ে দিতে হবে। আমি বললাম, আমার পক্ষে হল ছেড়ে যাওয়া সম্ভব নয়। সামনে ডাকসু নির্বাচন। নির্বাচন শেষ হোক-দেখা যাবে। ড. জামান তেমন কিছু বললেন না। তারপর একদিন নির্বাচন এলো। আমরা আমাদের পক্ষের সদস্যদের জগন্নান্ধ হলে থাকবার ব্যবস্থা করলাম। পুরের দিকে জহিরুল ইসলাম (বর্তমানে অনিয়মিত কলামিস্ট) ছুটে এলো আমার কাছে। বলল, সর্বনাশ হয়ে গেছে। আমাদের একজন সদস্যকে কিডন্যাপ করেছে। যিনি কিডন্যাপ হয়েছিলেন তখন তিনি সমাজে একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি। আর যারা কিডন্যাপ করেছিল তারাও আজ অচেনা নয়। ফলে নির্বাচনে আমাদের পক্ষে ৭ ও বিরুদ্ধে ৮ ভোট হলো। আমরা প্রতিবাদ জানালাম। নির্বাচন স্থগিত রাখতে বললাম। বিচারপতি হামিদুর রহমান কোনো কথাই শুনলেন না। পরবর্তীকালে এই কিডন্যাপ নিয়ে আমরা দেন-দরবার করেছিলাম। তখন এককালের পুলিশের ডিআইজি আবদুল্লাহ সাহেব আইনের ছাত্র ছিলেন। তিনি বললেন, বৃথা আপনারা এ নিয়ে হইচই করছেন। কারণ সিদ্ধান্ত নিয়েই আপনাদের হারানো হয়েছে। সকল মহল না জানলে সামরিক শাসন আমলে ডাকসুর একজন সদস্য কিডন্যাপ হওয়া আদৌ সম্ভব কি?
ডাকসু নির্বাচনে হেরে গেলাম। এবার বিপদ ঘনিয়ে এলো। বুঝলাম ঢাকা হলে থাকা আর সম্ভব হবে না। এমন কি ঢাকায় থাকাও আর সম্ভব হবে না। ঢাকা হলের বাইরে গেলে গ্রেফতার অনিবার্য। দেশে রাজনীতি নেই বললেই চলে। সর্বত্রই গ্রেফতারের ভয়।
সামরিক শাসন জারি হবার পর আমি এবং আমার রুমমেট আহম্মদ হোসেন হেঁটে হেঁটে সেগুনবাগিচা গিয়েছিলাম। সেগুনবাগিচায় শেখ মুজিবুর রহমান থাকতেন। জানতাম তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি তখন মন্ত্রিত্ব ছেড়ে চা বোর্ডের সভাপতি। সেগুনবাগিচায় গিয়ে দেখলাম এই বাসা থেকে শেখ সাহেবের পরিবার-পরিজনকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। সকলেরই এক কথা–এ সময় রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামাবেন না। গ্রেফতার হলে কেউ খোঁজ নেবে না।
সত্যি সত্যি সঙ্গে তখন কেউ নেই। মাত্র বছরখানেক আগের কথা। ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দিয়েছিলাম ছাত্রলীগ থেকে। ছাত্র ইউনিয়নের পুরুষ নেতৃত্বের একাংশ প্রবল বিরোধিতা করেছিল। আমাকে কিছুতেই গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদে না দেবার জন্যে জোট বেঁধেছিল। দেশে সামরিক শাসন জারি হবার পর তারা কেউ নেই। ডাকসু নির্বাচনে দাঁড়ালেন এনায়েতুল্লাহ খান। তিনি এসেছিলেন আমাদের সঙ্গে ছাত্রলীগ থেকে। ডাকসু নির্বাচনের জন্যে অক্লান্ত পরিশ্রম করলাম আমি জহিরুল ইসলাম ও আজিজুর রহমান খান। আমরা সকলেই এসেছিলাম ছাত্রলীগ থেকে। এ সময় ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন সালউদ্দিন আহমদ (অধ্যাপক সাদউদ্দিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছিলেন ৯০ দশকে)। অন্যতম নেতা ছিলেন কাজী জাফর আহমদ। কেউই এলেন না এ নির্বাচনের সময় সামনা-সামনি, একমাত্র আমানুল্লাহ ব্যতীত।
নিজের দলে প্রায় এক অবস্থা। নিতাই গাঙ্গুলি আবারো ঢাকেশ্বরী মিলের চাকরি ফিরে পেয়েছেন। রুহুল আমিন কায়সার আবার অসুস্থ হয়ে মিটফোর্ড হাসপাতালে। ১৯৫৭ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে কিছুদিন থাকার পর তিনি
কিছুটা সুস্থ হন। তারপর চলে যান ভাইয়ের কাছে চুয়াডাঙ্গা। ভাই রেলে চাকরি করতেন। থাকতেন চুয়াডাঙ্গা। তখন ঢাকা থেকে সরসারি চুয়াডাঙ্গা যাওয়া যেত না। নারায়ণগঞ্জ থেকে স্টিমারে গোয়ালন্দ। গোয়ালন্দ থেকে ট্রেনে চুয়াডাঙ্গা। আজকের দৌলতদিয়া ঘাটে বা গোয়ালন্দে সেদিনের গোয়ালন্দ খুঁজে পাওয়া যাবে না। দৌলতদিয়া এখন নদী গর্ভে। আজকের গোয়ালন্দ বন্দরেই সেকালে স্টিমার ভিড়ত।
রুহুল আমিন কায়সারকে চুয়াডাঙ্গা পৌঁছে দিয়ে এসে ভাবলাম হয়তো সুস্থ থাকবেন কিছুদিন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় থেকে যক্ষ্মায় ভুগছেন। বারবার হাসপাতালে যাচ্ছেন আর আসছেন। কিন্তু আমার প্রত্যাশা সঠিক হলো না। রুহুল আমিন সাহেব চুয়াডাঙ্গা থাকলেন না। একটু সুস্থ হয়েই প্রধান শিক্ষকের চাকরি নিয়ে চলে গেলেন বরিশালের গৌরনদী। আমি কিছুই জানতাম না।
