কিন্তু মুসলিম লীগ সে ধরনের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ছিল না। উকিল মোক্তার জমিদার-জায়গিরদারদের একমাত্র বাসনা ছিল ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করা। নিজের জন্যে ক্ষমতা দখল করা। রাজনৈতিক নেতা হিসেবে প্রথম দিকে এদের জনপ্রিয়তা ছিল। তাই দেখা গেল নিজের জনপ্রিয়তা এবং দলবাজি সম্বল করে এরা ক্ষমতা দখল করছে এবং মন্ত্রিসভা ভাঙছে আর গড়ছে। দেশে কোনো ধরনের শিল্পায়ন হচ্ছে না। তাই এই শিল্পায়নের জন্যেই পুঁজিপতিদের নিজস্ব রাজনীতি বেছে নিতে হয়।
পাকিস্তানের প্রথম দিকেই প্রথম সারির দু’নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও লিয়াকত আলী মারা যান। ক্ষমতা চলে যায় গোলাম মোহাম্মদের নেতৃত্বে আমলাদের হাতে। কারণ, সমগ্র পাকিস্তানে গ্রহণযোগ্য কোনো নেতা তখন ছিল না। অপরদিকে কমিউনিস্টবিরোধী জোটে পাকিস্তান ছিল বিশ্ব রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বস্ত বন্ধু এবং ঘাটি। পাকিস্তানের সঙ্গে আমেরিকার পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি ছিল। এ সূত্রে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে মার্কিন সরকারের সরাসরি সম্পর্ক ছিল। এ প্রেক্ষিতে সামরিক-বেসামরিক আমলারা সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, তাদেরই একদিন ক্ষমতা দখল করতে হবে। এর প্রেক্ষিতে ১৯৫৪ সালে জেনারেল আইয়ুব একটি সংবিধান রচনা করেন পাকিস্তানের জন্যে। তখন জেনারেল আইয়ুব পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর প্রধান। রাজনীতির ব্যাপারে তাঁর নাক গলাবার কথা নয়।
১৯৫৪ সালে পূর্ববাংলার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পূর্ববাংলার নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটে। এ রাজনীতি মুখ্যত মার্কিনবিরোধী। তবে এদের অন্যতম নেতা মার্কিনপন্থী শহীদ সোহরাওয়ার্দী। কেন্দ্রের পাকিস্তান সরকারকে এ বাস্তবতা মেনে নিতে হয়। পূর্ববাংলার যুজফ্রন্টকে ভেঙে দিতে হয়। পূর্ববাংলার যুক্তফ্রন্টকে ভেঙে দিতে না পারলে সামরিক অভ্যুত্থান পূর্ববাংলার মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। অপরদিকে পূর্ববাংলায় যুক্তফ্রন্ট জিতে যাওয়ায় পাকিস্তান রাজনীতিতে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর একটি নতুন অবস্থান সৃষ্টি হয়। রাজনৈতিক নেতা হিসেবে শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে ব্যর্থ প্রমাণ করতে না পারলে কোনো ষড়যন্ত্রই সফল হবে না। অভ্যুত্থানও সম্ভব নয়।
পাকিস্তান রাজনীতির ব্যাখ্যা এ রকম সাজালে পরবর্তী চিত্র অনুধাবন করা সহজ হবে। এ পটভূমিতে পূর্ববাংলায় ৯২(ক) ধারা জারি করে যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেঙে দেয়া হয়। আওয়ামী লীগ ও কৃষক শ্রমিক পার্টির নেতৃত্ব বদলের প্রতিযোগিতায় যুক্তফ্রন্ট ভেঙে যায়। প্রধানমন্ত্রীত্বের টোপ দিয়ে কেন্দ্রে শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে আইনমন্ত্রী নিয়োগ করা হয়। শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সহযোগিতায় পাকিস্তানের আমলা প্রধানমন্ত্রী চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বে ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের সংখ্যা সাম্যের নামে পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠতা কেড়ে নেয়া হয়। শহীদ সোহরাওয়ার্দী সহযোগিতা না করলে সাংবিধানিকভাবে পূর্ববাংলাকে বঞ্চিত করা সহজ হতো না।
সংবিধান পাস হবার পর পাকিস্তানের সামরিক-বেসামরিক আমলারা শেষ খেলা শুরু করেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে প্রধানমন্ত্রী করা হয়। ৮০ জনের সংসদে ১২ জন সদস্যের নেতা শহীদ সোহরাওয়াদী ছিলেন প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মীর্জার ওপর নির্ভরশীল। শহীদ সোহরাওয়ার্দী চাইলেন ১৯৫৯ সালে পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচন দিয়ে একটি রাজনৈতিক সরকার গঠন করতে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রাজি হলো না। কারণ পূর্ব পাকিস্তানে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সংগঠন থাকলেও পশ্চিম পাকিস্তানে তার তেমন সংগঠন বা সমর্থক ছিল না। তাদের আশঙ্কা ছিল সারা পাকিস্তানের নির্বাচন হলে মার্কিন বিরোধী শক্তি জয়লাভ করবে। তাই মার্কিন অর্থনৈতিক সাহায্যে আমলাদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা পাকিস্তানের নতুন পুঁজিপতি শ্রেণি এবং মার্কিন সাহায্য নির্ভর পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর আমলা যৌথভাবে শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করে। তারপর একের পর এক প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত এবং বরখাস্ত হন। ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর সামরিক শাসন জারি হয়। আর সামরিক শাসনকালেই পাকিস্তানে প্রথম ভূমি সংস্কারের কর্মসূচি নেয়া হয়। অর্থনৈতিক উন্নয়নে বুর্জোয়া ধারার কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা হয়। মৌলিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। গমের বিনিময়ে কাজ কর্মসূচি শুরু হয়। সারাদেশে যোগাযোগ নেটওয়ার্ক সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ বাজার অর্থনীতির কাঠামোর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় এবং আইয়ুব খানই প্রথম পরিবার আইন প্রণয়নের সাহস করেন। এ প্রেক্ষিতে আমার মূল্যায়ন হচ্ছে ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে সামরিক অভ্যুত্থান ছিল এক ধরনের আমলা পুঁজিপতিদের ক্ষমতা দখল।
১৯৫৮ সালে দেশে সামরিক শাসন জারি হয়। ১৯৫৯ সালে ডাকসু নির্বাচন এগিয়ে আসে। একদিকে ছাত্র ইউনিয়ন অপরদিকে ছাত্রলীগ, ছাত্রশক্তি এবং এনএসএফ। সেবার ভিপি হওয়ার কথা ঢাকা হল থেকে জিএস অর্থাৎ সাধারণ সম্পাদক এসএম হল থেকে। আমাদের ভিপি প্রার্থী এনায়েতুল্লাহ খান। ছাত্রলীগের ভিপি আবুল হোসেন (তিনি সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করে বিএনপিতে যোগ দিয়ে এমপি হয়েছিলেন)।
ডাকসুর সদস্য সংখ্যা ১৬। হিসেব করে দেখা গেল আমরা ছাত্র ইউনিয়ন-৮ প্রতিপক্ষও ৮। প্রতিপক্ষের আটজনের মধ্যে ছিল নোয়াখালীর আবদুল মালেক। তিনি এককালে নোয়াখালী জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। আমার সঙ্গে তাঁর ভালো সম্পর্ক ছিল। মালেক সাহেব পাকিস্তান স্টেট ব্যাংকে চাকরি করতেন। আমি আর অজিত তাঁর সঙ্গে আলাপ করলাম। সিদ্ধান্ত হলো আমাদের পক্ষে আট ভোট পড়লে তিনি আমাদের ভোট দেবেন। সুতরাং বিজয় সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলাম।
