তবে ছাত্র আন্দোলন করতে গিয়ে মনে হয়েছে আমাদের আন্দোলনের সবচে’ ন্যক্কারজনক দিক ছিল পরীক্ষার তারিখ পাল্টানোর দাবি।
১৯৫৬ সাল। আওয়ামী লীগ-কংগ্রেস কোয়ালিশন সরকার ক্ষমতায়। প্রধানমন্ত্রী আতাউর রহমান। প্রধানমন্ত্রী একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সভায় এসেছিলেন। ছাত্ররা তাঁর কাছে আবেদন জানালে ডিগ্রি পরীক্ষার তারিখ সরিয়ে দিতে তিনি রাজি হন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিল একমত হয়নি।
ডিসেম্বর মাসে আবারো একটি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী আতাউর রহমান আসলেন। আবারো তাঁর কাছে অনুরোধ জানানো হয় পরীক্ষার তারিখ পিছাতে। কিন্তু এবার তিনি রাজি হলেন না। এক সময় বললেন, প্রয়োজন হলে আমার মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করবে। তবুও পরীক্ষা পিছাবার দাবি মানবে না।
ছাত্রদের বক্তব্য ছিল–বিএ পরীক্ষা মার্চ মাসে অথচ একখানা পাঠ্যপুস্তক তখনও প্রকাশিত হয়নি। আমার যতদূর মনে আছে বইটির নাম ‘সিলভার স্কুল। এছাড়া বিএসসির ছাত্রদেরও অনেক দাবি ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মনোভাব হলো এভাবেও পরীক্ষা হয়।
এবার তা হলো না। প্রধানমন্ত্রী কার্জন হল থেকে চলে গেলেন। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর বিচারপতি ইব্রাহিমের বাসার সামনে অবস্থান ধর্মঘট করলাম।
রাত বাড়তে থাকল। রাত ১২টার দিকে দেখলাম প্রধানমন্ত্রী আতাউর রহমানের ১ নম্বর গাড়িটি ভাইস চ্যান্সেলরের কম্পাউন্ডে ঢুকল। প্রধানমন্ত্রী বৈঠক করলেন ইব্রাহিম সাহেবের সঙ্গে। ইব্রাহিম সাহেব আইন ক্লাসে আতাউর রহমান সাহেবের শিক্ষক ছিলেন। যতদূর শুনেছি প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, স্যার পরীক্ষার তারিখ পিছিয়ে দিলে ভালো হয় না কি? এটা আমার অনুরোধ। ইব্রাহিম সাহেব বলেছিলেন-প্রধানমন্ত্রীর কথা অনুরোধ হয় না; প্রকৃতপক্ষে নির্দেশ। আমি কাল একাডেমিক কাউন্সিলের সভা ডাকব।
এ ঘটনার পর আমরা অবস্থান ধর্মঘট প্রত্যাহার করি। পরদিন একাডেমিক কাউন্সিলের বৈঠক। পরীক্ষার তারিখ পিছিয়ে গেল। বিপক্ষে ভোট দিয়েছিলেন ফজলুল হক হলের প্রভোস্ট অর্থনীতির শিক্ষক ড. মযহারুল হক।
কিন্তু এ আগুন থামল না। পরবর্তী বছর পরীক্ষার তারিখ পেছানোর দাবিতে অনশন ধর্মঘট শুরু করল জগন্নাথ কলেজের ছাত্ররা। নেতৃত্ব ছাত্রলীগের। আমি সম্পাদক আউয়ালকে বললাম-আমি জগন্নাথ কলেজে যাব এবং এই অনশনের বিরুদ্ধে অনশন করব। শেষ পর্যন্ত জগন্নাথ কলেজে গিয়ে সকলের সঙ্গে আলোচনা করে একটি মীমাংসায় পৌঁছাই। সেবার আর পরীক্ষার তারিখ পেছানো হয়নি। আমরা ধারণা পরীক্ষায় তারিখ পেছালে খুব একটা লাভ হয় না। শুধুমাত্র বিপদে পড়ে গরিব পিতামাতার সন্তানেরা। এদের কথা কেউ ভাবে না।
এ সময় আর একটি অবাঞ্ছিত কাজের সঙ্গে আমি জড়িয়ে পড়ি। দীর্ঘদিন ধরে মুসলিম লীগ শাসনকালে ছাত্র আন্দোলন ঠেকাতে অনেক কলেজে আমলাদের অধ্যক্ষ করে পাঠানো হয়েছিল। এসময় কয়েকজন অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে আন্দোলন তুঙ্গে উঠেছিল। তাই বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ, দৌলতপুর ব্রজলাল একাডেমী, রংপুর কারমাইকেল কলেজ, চাঁদপুর কলেজ, যশোর কলেজসহ আরো কয়েকটি কলেজের অধ্যক্ষকে সরানোর আন্দোলনে জড়িয়ে গিয়েছিলাম। তবে ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজের অধ্যক্ষকে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বাধ্যতামূলকভাবে বরখাস্ত করলে ২০ ঘণ্টার মধ্যে তাকে পুনর্বহাল করেছিলাম। সেকালে প্রয়োজনে অনেক সমালোচনা সহ্য করেছি। কিন্তু কেউ বুঝতে চাননি, আমাদের অধ্যক্ষ সাহেবেরা কেমন আমলা মনোভাবাপন্ন হয়ে গিয়েছিলেন।
তখন আন্তর্জাতিক ছাত্র প্রতিষ্ঠান ছিল কমিউনিস্ট প্রভাবিত আন্তর্জাতিক ছাত্র ইউনিয়ন (আইইউএস)। তবুও ছাত্র ইউনিয়ন নয়। পূর্ববাংলায় আমাদের সঙ্গে প্রথম সম্পর্ক স্থাপিত হয় আইইউএস-এর। যক্ষ্মা রোগীদের জন্যে আইইউএস-এর একটি হাসপাতাল ছিল বেইজিংয়ের কাছে বাঙাচু-তে। এ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্যে আমরা গাইবান্ধার নির্মলেন্দু মজুমদারকে পাঠিয়েছিলাম। চেকোশ্লোভাকিয়ায় স্কলারশিপ পেয়েছিল নূরুল হক বাচ্চু (পরবর্তীকালে সিনেমা পরিচালক)। কিন্তু পাকিস্তান সরকার পাসপোর্ট না দেয়ায় তার যাওয়া হয়নি। সেকালে ছাত্রলীগের বন্ধুরা অনেকেই এ খবর রাখতেন না। এ কালের সদস্যরাও জানে না।
১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করে। সরকারি আমলা এবং শিল্পপতিরা এ অভ্যুত্থান মেনে নেয়। কিন্তু কেন?
আমার মনে হয়, ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে সামরিক বাহিনীর নেতৃত্বে একটি বুর্জোয়া বিপ্লব হয়েছিল। অর্থাৎ পুঁজিবাদীরা ক্ষমতা দখল করেছিল।
লক্ষণীয়, মুসলিম লীগকে ইস্পাহানি দাউদ-আদমজীসহ এক শ্রেণির শিল্পপতি সমর্থন করলেও সঠিক অর্থে মুসলিম লীগ একটি প্রকৃত পুঁজিপতিদের রাজনৈতিক দল ছিল না। এ দল খান সাহেব, খান বাহাদুর, উকিল মোক্তারদের সংগঠন ছিল। অর্থাৎ বিক্ষুব্ধ উঠতি মুসলিম মধ্যবিত্তরা ছিল এ দলের নেতৃত্বে। তাও আবার পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে তফাৎ ছিল। মুসলিম লীগের পেছনে কলকাতাভিত্তিক মুসিলম শিল্পপতিরা থাকলেও দেশভাগের সময় কলকাতা ভারতে চলে গেল। বোম্বাই, ভারতভিত্তিক মুসলিম শিল্পপতিরা বরাবরই জানত, পাকিস্তান সৃষ্টি হলে তারা ভারতেই পড়বে। তাই দেশ বিভাগের পর দেখা গেল পূর্ববাংলার মুসলিম লীগের নেতৃত্বে এসেছে উকিল-মোক্তার, ছোট জমিদার-জোতদারসহ এক শ্রেণির নিম্নমধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী। আর পশ্চিম পাকিস্তানের পাঞ্জাব, সিন্ধু, সীমান্ত প্রদেশে ক্ষমতায় এলো যারা এককালে রাজনৈতিকভাবে মুসলিম লীগ বিরোধী এবং মুখ্যত জমিদার-জায়গিরদার। ব্রিটিশ ভারতের সেই অংশ নিয়েই পাকিস্তান গড়ে উঠল–যেখানে কোনো শিল্প-কলকারখানা ছিল না, ছিল না সংগঠিত পুঁজিপতি শ্রেণি। ফলে দেশভাগ হওয়ার পর মুসলিম লীগকে কেন্দ্র করেই একটি পুঁজিপতি শ্রেণি গড়ে উঠবার সম্ভাবনা দেখা দিল।
