তাই তারা প্রথম থেকেই চেষ্টা করছিল যুক্তফ্রন্টকে ভাঙতে। আর এ সুযোগ দিয়েছিল যুক্তফ্রন্ট নেতারা। বিপুল ভোটে নির্বাচিত হলেও যুক্তফ্রন্ট একটি ঐক্যবদ্ধ মন্ত্রিসভা গঠন করতে পারল না। প্রথমে কেএসপির তিনজন সদস্য নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠিত হলো। এপ্রিলে সকলকে নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠনের পরপরই কর্ণফুলি পেপার মিল ও আদমজী জুট মিলে বাঙালি-বিহারী দাঙ্গার অজুহাতে পূর্ববাংলার মন্ত্রিসভা ভেঙে দিয়ে প্রেসিডেন্ট শাসন জারি করা হলো। শেরেবাংলা ফজলুল হককে দেশদ্রোহী ঘোষণা করা হলো। তাঁকে নজরবন্দি করা হলো। শেখ মুজিবুর রহমানসহ হাজার হাজার রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীকে গ্রেফতার করা হলো।
এ রাজনৈতিক উত্থান-পতনের মাঝখানে ষড়যন্ত্রকারীরা জিতে গেল। যুক্তফ্রন্ট ভেঙে গেল। কখনো আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মন্ত্রিসভা, আবার কখনো কেএসপির নেতৃত্বে মন্ত্রিসভা গঠিত হলো। নিজের দলকে তোয়াক্কা না করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী বগুড়ার মোহাম্মদ আলীর মন্ত্রিসভার আইনমন্ত্রী হলেন। পূর্ববাংলার স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে সংখ্যাসাম্য ও দুইউনিট মেনে পাকিস্তানের সংবিধান রচনার চেষ্টা করলেন। অপরদিকে দেশদ্রোহী নজরবন্দি শেরেবাংলা একে ফজলুল হক–যারা তাঁকে নিগৃহীত করেছিল, সেই মুসলিম লীগ মন্ত্রিসভায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হলেন। পরে একসময় গভর্নর হলেন পূর্ববাংলার।
অর্থাৎ সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অনেক দূরে চলে গেলেন এই নেতারা। মানুষের তখন চরম ঘৃণা এই নেতাদের বিরুদ্ধে। শেষ পর্যন্ত প্রাদেশিক পরিষদে ডেপুটি স্পিকার নিহত হলেন। তারপর এলো সামরিক শাসন। সামরিক শাসক এলেন ত্রাতারূপে। তাই ১৯৫৮ সালে ঢাকা স্টেডিয়ামে জেনারেল আইয়ুবের সংবর্ধনা কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা ছিল না। ছিল রাজনীতিকদের চরম পরাজয়ের স্বাক্ষর।
১৯৫৪ সালে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল। এরপর ছিল সাধারণ নির্বাচন। পড়াশুনা ব্যাহত হলো। আমরা ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ড. আব্দুল হকের কাছে গেলাম। অনুরোধ জানালাম এবার যেন হঠাৎ করে কোনো কঠিন প্রশ্ন করা না হয়। আমরা চাই না ম্যাট্রিক পরীক্ষার্থীরা গোলযোগ করুক। কারণ দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এমন একটা কিছু ঘটতে পারে। তিনি রাজি হলেন। কথা দিলেন তিনি সতর্কতা অবলম্বন করবেন।
কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কাজটি হলো উল্টো। ইংরেজিতে একটি রচনা এলো, রচনার নাম হলো-এ জব। ড. হক স্কাউটের কর্মসূচির অঙ্গ মনে করে তিনি এ কাজটি করেছেন। অথচ গ্রামবাংলার ছাত্র এমন কি অধিকাংশ শিক্ষকও এ ধরনের রচনার খবর রাখেন না। সুতরাং আবার ড. হক সাহেবের কাছে যেতে হলো। তিনি আশ্বাস দিলেন, উত্তরপত্র নিরীক্ষণের সময় বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সে সময় পাক-মার্কিন সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ঠ। তাই আমাদের স্কুলের পাঠ্যবইও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মুদ্রিত হয়ে আসত। আমরা প্রতিবাদ করলাম। আবার ড. হকের কাছে গেলাম। তিনি উচ্চকণ্ঠে হাসলেন। বললেন, বলেন কী এতে অসুবিধা কোথায়? তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মুদ্রিত বইয়ের একটি কপি হাতে নিয়ে বললেন, দেখুন এ বই কত শক্ত। এ বই টানলেও ঘেঁড়ে না। আমরা বললাম, শক্ত বই নয়। পড়ার যোগ্য দেশে মুদ্রিত বই চাই। পরবর্তীকালে এ নিয়ে তুমুল আন্দোলন হওয়ায় বাধ্য হয়ে সরকারি সিদ্ধান্ত পাল্টাতে হয়।
এরপর বোর্ডের চেয়ারম্যান হয়ে এলেন ড. কুদরত-ই খুদা। তিনি আবার বাংলায় কথা বলতে চাইতেন না। তখন চারিদিকে দাবি উঠেছে বাংলা ভাষায় সকল প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করতে হবে। এমনকি গণিতের প্রশ্নও বাংলায় হতে হবে। সেদিন আমি একাই বোর্ড অফিসে গেলাম। ঢুকতেই ড, খুদা বললেন, হোয়াট হ্যাঁজ ব্রট ইউ টু মি? আমি চুপ করে থাকলাম। বললাম, বাংলায় বলুন। তিনি বললেন, কী চাই? আমি বললাম, ছাত্রদের দাবি, গণিতের প্রশ্ন বাংলায় করতে হবে। মনে হলো, উনি আমাকে স্কুলের ছাত্র মনে করেছেন। আবার তিনি ইংরেজিতে বললেন, ডু ইউ নো হোয়াট ইজ এ রাইট অ্যাঙ্গেল? তুমি কি জানো সমকোণ কাকে বলে? গো, রিড অ্যান্ড সিট ফর একজামিনেশন।
আমার ইচ্ছে হচ্ছিল চিৎকার করি। আমি বললাম, আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, স্কুলে পড়ি না। স্কুলের ছাত্র পড়াই। তবে আপনাকে বলে যাই, গণিতের প্রশ্নপত্র বাংলায় হবেই। আর বিড়বিড় করে বললাম, ব্যাটা ইংরেজি ছাড়া কথা বলে না।
ঢাকা হলে ফিরে নবকুমার স্কুলের একজন ছাত্র এবং কামরুন্নেসা স্কুলের এক ছাত্রীকে বললাম, পরদিন মিছিল নিয়ে আসতে। মিছিল আসবে শিক্ষামন্ত্রীর বাসভবনের সামনে। শিক্ষামন্ত্রী আশরাফউদ্দীন চৌধুরী। এককালে ফরোয়ার্ড ব্লক করতেন। নেতাজী সুভাষ বসুর আমলে বাংলা কংগ্রেসের সম্পাদক ছিলেন। পরবর্তীকালে নেজামে ইসলামে যোগ দিয়েছেন। শিক্ষামন্ত্রী হয়েছেন নেজামে ইসলামের কোটায়।
পরদিন মিছিল এল। শিক্ষামন্ত্রী নিজ ভবন থেকে বের হয়ে এলেন। ছাত্রছাত্রীদের আশ্বাস দিলেন, গণিতের প্রশ্নপত্র বাংলায় হবে। বছরখানেক পরের কথা। ১৫৭ নবাবপুর রোডের ছাত্রলীগ অফিসে বসে আছি। একজন ছাত্র এলো। সে ম্যাট্রিক এক বিষয়ে ফেল করেছে। তখন নিয়ম ছিল ম্যাট্রিকে এক বিষয়ে ফেল করলে স্যাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষা দিতে পারবে। তার অভিযোগ হলো-সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষার জন্যে এক বছর বসে থাকতে হলে একটি বছর নষ্ট হয়। তাই তার প্রস্তাব, তিন মাসের মধ্যে এ পরীক্ষা নিতে হবে। আবার ড, খুদার দফতরে গেলাম। তিনি এবার হেসে বাংলায় কথা বললেন। জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার আরজি কী? আমি আমার কথা বললাম। ড, খুদা বললেন–আমরাও একথা ভাবছি। তুমি যেতে পার।
