ড, জামান বললেন, তোমাকে যেতে হবে না। তুমি তোমার কক্ষে অন্যের সঙ্গে শেয়ার করে থাকবে। তুমি হলেই টাকা দিয়ে খাবে। তোমাকে ডিস্টার্ব করা হবে না। জানি না, প্রভোস্টের বাসায় শিক্ষকতা করতাম বলে এ সুবিধা দেয়া হলো কিনা। পরদিন আমি প্রভোস্টের কক্ষে ঢুকে বললাম, আমাকে ভর্তি হওয়ার সুযোগ দিন। তিনি আমতা আমতা করলেন। কোনো জবাব দিলেন না।
আমি বুঝলাম আমার ঢাকা হলে থাকা হবে না। পরীক্ষার অনুমতি পাব। অবশেষে জেলে যেতে হবেই। জেলে গেলে বিজ্ঞান পড়া হবে না। তাই একদিন ঢাকেশ্বরী এলাকায় সিটি নাইট কলেজে গেলাম। অধ্যক্ষকে বললাম, আমি বিএ ক্লাসে ভর্তি হব। আমার বিষয় হবে অর্থনীতি ও দর্শন। এককালে রসায়নেও অনার্স-এর ছাত্র ছিলাম। তারপর ছাত্র হলাম পাস কোর্সে পদার্থ, রসায়ন এবং গণিত নিয়ে। এবার আর বিজ্ঞান নয়। বিজ্ঞান আমাকে জেলখানায় অনেক জ্বালা দিয়েছে। জেলের বাইরে নিয়মিত ক্লাস করতে পারিনি। পরীক্ষা দেয়া হয়নি। এবার বিএ ক্লাসের ছাত্র হলাম, হল কর্তৃপক্ষ জানলেন না। ২/১ জন বাদে কোনো বন্ধু জানল না। জানতে পারল না সরকারি গোয়েন্দা বিভাগ। তবে বিএ ক্লাসে ভর্তি হলেও সিটি নাইট কলেজে আমি কোনোদিন ক্লাস করিনি।
এ পরিস্থিতিতে এগিয়ে এল ১৯৫৯ সাল। সামরিক আইনের কবলে পাকিস্তান। ১৯৫৯ সালের জানুয়ারিতে ডাকসু–ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের নির্বাচন। আমার জন্যে আর এক পরীক্ষা। আর এক বিপদ।
১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি হয়েছে। দেশে সংবিধান, পার্লামেন্ট বাতিল হয়েছে। সামরিক আইন জারি করে ঢাকা স্টেডিয়ামে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল আইয়ুব খান এসেছেন। স্টেডিয়ামে হাজার হাজার মানুষ তাকে স্বাগত জানিয়েছে।
মাত্র ৪ বছর। ১৯৫৪ সালে পূর্ব বাংলায় সাধারণ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করেছিল। সে নির্বাচনে পরাজিত হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী নূরুঙ্গ আমিন, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের সম্পাদক খালেক নেওয়াজ খানের কাছে। সেদিন ঢাকায় হাজার হাজার মানুষের ঢল নেমেছিল। মাত্র চার বছরে সব কিছু উল্টে গেল।
কিন্তু কেন? এর একটি স্বাভাবিক জবাব দেয়া যায়। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে ভোট ছিল নেতিবাচক অর্থাৎ আমরা মুসলিম লীগকে চাই না। এ কথা সত্যি যে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা দাবি ছিল। এ দাবিকে কেন্দ্র করে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে গিয়েছিল। সে দাবি বাস্তবায়ন করা হবে। এ প্রতিশ্রুতি যুজফ্রন্ট নেতারা দিয়েছিলেন। তবুও যুক্তফ্রন্টের নেতাদের আচরণ প্রথম থেকে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে।
যুক্তফ্রন্টের প্রধান তিন নেতা ছিলেন–(১) শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, (২) মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ও (৩) শহীদ সোহরাওয়ার্দী। এই তিন নেতার মধ্যে পার্থক্য ছিল একান্তই স্পষ্ট। নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে এঁরা একমত হতে পারেননি। এমনকি শেষ পর্যন্ত এক আসনে দুই প্রার্থীও থেমে গেছে। এছাড়াও যুফ্রন্টের শরিক দল ছিল নেজামে ইসলামী ও গণতন্ত্রী দল। রাজনীতির ব্যাখ্যায় একটি জগাখিচুড়ি। এ যুক্তফ্রন্ট প্রথম দিকে আওয়ামী মুসলিম লীগ বা কৃষক শ্রমিক পার্টি (কেএসপি)-ও চায়নি। এ যুক্তফ্রন্টের উদ্যোক্তা ছিল পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন। অর্থাৎ দেশের যুব ও ছাত্র সমাজ। বার বার নেতারা দ্বিমত পোষণ করেছেন। মনে হয়েছে যুক্তফ্রন্ট ভেঙে যাচ্ছে। আর বারবার ছাত্ররা মিছিল করেছে। নেতাদের ঘেরাও করেছে। এদের কথা, ঐক্যবদ্ধ না হলে মুসলিম লীগকে হারানো যাবে না। শেষ পর্যন্ত ভাঙা যুক্তফ্রন্ট একসঙ্গে নির্বাচন করেছে। কেএসপি বলেছে গণতন্ত্রী দল কমিউনিস্টদের। কমিউনিস্টদের ভারসাম্য বিধান করে নিতে হয়েছে ইসলামপন্থী মওলানা আতাহার আলীর দল নেজামে ইসলামকে। অর্থাৎ যুক্তফ্রন্ট ছিল একটি অপূর্ব রাজনৈতিক জোড়াতালি। এই যুক্তফ্রন্টের প্রশ্নে আমাদের দল আরএসপি একমত ছিল না। আমরা বলেছিলাম এ ঐক্য টিকবে না। শেষ পর্যন্ত হতাশা সৃষ্টি করবে এবং আরএসপি ওই নির্বাচনে প্রার্থী দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। মওলানা ভাসানী এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অনুরোধে প্রার্থীপদ প্রত্যাহার করা হয়। আমরা একমত না হলেও যুক্তফ্রন্টের পক্ষে কাজ করেছি। সারাদেশে তখন যুক্তফ্রন্টের নামে জোয়ার আর এই নির্বাচনেই প্রথম নৌকা প্রতীক নির্বাচনের রাজনীতিতে আসে। যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী প্রতীক ছিল নৌকা। নৌকা প্রতীক নিয়ে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে ২৩৭ আসনের মধ্যে ২২৭ আসনে জয়লাভ করল। সেদিন ঢাকায় ছিল মিছিল আর মিছিল।
কিন্তু সে যুক্তফ্রন্ট টিকল না। পূর্ব বাংলার মুসলিম লীগের পরাজয় স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয়নি কেন্দ্রীয় পাকিস্তান সরকার এবং বেসামরিক ও সামরিক আমলারা। তাদের ধারণা পূর্ববাংলার সবকিছু হয়েছে কমিউনিস্টদের প্ররোচনায়। পাকিস্তান রাষ্ট্রটি ছিল তখন কমিউনিস্টবিরোধী জোটে। এ জোটের নেতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তাই পূর্ববাংলার নির্বাচনের পর মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেছিলেন–এ নির্বাচনের কোনো প্রভাব পাকিস্তানের রাজনীতিতে পড়বে না।
