আমি তখন সকল দিক থেকে বিপর্যস্ত। প্রভোস্ট জুলফিকার আলী সাহেবের দুকন্যা, এক পুত্র পড়াবার দায়িত্ব নিয়েছি। অথচ তার সঙ্গে আমার বনিবনা হচ্ছে না। তিনি আমাকে হলে রাখছেন। কিন্তু ভর্তি হবার জন্যে আমার ফাইল পাঠাচ্ছেন না কোথাও।
রাজনীতির দিক থেকে তখন প্রায় একাকী। দলের অবস্থানটি আশানুরূপ নয়। কমিউনিস্ট পার্টিকে আগেই অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। তারা কেউ ন্যাপে, কেউ আওয়ামী লীগে ঢুকে কাজ করছে। আমাদের দলের ব্যাপারে ভিন্ন মত। কোনো দলে ঢুকে নিজস্ব রাজনীতি করা যায় না। অন্যের রাজনীতিই করতে হয় অথচ প্রকাশ্যে বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক দল (রিভল্যুশনারি সোসালিস্ট পার্টি অর্থাৎ আরএসপি) করার পরিবেশ তখন ছিল না। এ নিয়ে দলের মধ্যে মতানৈক্য আছে। নিতাই গাঙ্গুলির মতে, প্রকাশ্যে নামা উচিত। দলের অধিকাংশ সদস্যের ভিন্নমত। ১৯৫৩ সালে গঠিত দলের কেন্দ্রীয় কমিটি কাজ করছে না। এবিএম মুসা রাজনীতিতে নেই। রুহুল আমিন কায়সার অসুস্থ। মাত্র কিছুদিন আগে তাঁকে ভর্তি করা হয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। বর্ষিয়ান নেতা অতীন্দ্রমোহন রায় কুমিল্লায় আছেন। এককালে ডাকসাইটে শ্রমিক নেতা নেপাল নাহা নারায়ণগঞ্জ ছেড়ে কুমিল্লায় শিক্ষকতা করছেন। বরিশালের সুধীর সেন কখন জেলে যান আর কখন মুক্তি পান তার হিসাব রাখা কঠিন। জিয়াউল হক রইসউদ্দিন নোয়াখালিতে আছেন। রাজনীতির সঙ্গে তার তেমন সম্পর্ক নেই।
বেশ কিছুদিন আগে রুহুল আমিন কায়সারকে খুঁজতে গিয়ে আবিষ্কার করি যে তিনি অসুস্থ। আমার রুমমেট হিমাংশুরঞ্জন দত্ত। তাঁর বাবা হাজীগঞ্জের নরেন্দ্রনাথ দত্ত ডাক্তার ছিলেন। পরবর্তীকালে একাত্তর সনে তাঁকে খুন করা হয়। আমি যাচ্ছিলাম চাঁদপুরে ছাত্রলীগ সম্মেলনে। হিমাংশু বলেছিল আমাদের বাসা হাজীগঞ্জে, যাবেন? বলেছিলাম যাব। আমি বললাম, দেখুন আমি কথা দিলে কথা রাখি। আমি গেলে বিপদে পড়বেন না তো।
হিমাংশু আশা করেনি। তবুও হাজীগঞ্জে রেল স্টেশনে দাঁড়িয়েছিল। সেখানে ট্রেনেই চাঁদপুর হয়ে মানুষ হাজীগঞ্জ যেত। হাজীগঞ্জ গিয়ে বিপদে পড়ে গেলাম। আমি কোনোদিন প্রকৃতপক্ষে কোনো সংসারে মানুষ হইনি। শৈশবে বাবা মারা গেছেন। বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র পড়েছি। কলেজে পড়তে গিয়ে বাড়ি যাওয়া হয়নি। জেলে চলে গেছি। মা, ভাই-বোন কারো সঙ্গে তেমন কোনো সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। তাঁরা ১৯৪৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে চলে গেছেন। মার সঙ্গে শেষ দেখা ১৯৪৮ সালে। ১৯৫৭ সালে হিমাংশু বাবুর মায়ের সঙ্গে দেখা। তিনি প্রথমে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কী খেতে ভালোবাসো?
আমি বললাম, জানি না। কারণ এ প্রশ্ন আমাকে কোনোদিন কেউ জিজ্ঞাসা করেনি। খানিকটা অবাক হলেন তিনি। বললেন–তোমার মা কোথায়?
– পশ্চিমবঙ্গে।
– কতদিন দেখা হয় না?
– ন’বছর।
এবার তিনি রেগে গেলেন। বললেন, তুমি আমার বাড়ি থেকে চলে যাও। এ কেমন ছেলে তুমি, নিজের মায়ের সঙ্গে দেখা করো না?
আমি বিব্রত বোধ করলাম। বললাম, আপনি আমাকে পাসপোর্ট দেবেন? গত ৮ বছরের সাড়ে চার বছর জেলে ছিলাম। দু’বছর ছিলাম খুনের মামলার আসামী হয়ে আত্মগোপন করে। কার খবর রাখব, বলুন।
এবার তিনি যেন শান্ত হয়ে গেলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কোথায় যাবে? আমি বললাম, বিকালে আপনাদের মসজিদ প্রাঙ্গণে জনসভা আছে যুক্ত নির্বাচনের দাবিতে। আমি এবং মহিউদ্দিন আহমদ বক্তা। বক্তৃতার পর রাতেই রামগঞ্জ থানার পানিওলা যাব। সেখানে আমার বন্ধু রুহুল আমিন কায়সার প্রধান শিক্ষক একটি স্কুলের।
হিমাংশু বাবুর মা বললেন, তুমি এখন বারান্দায় শুয়ে থাকবে। বিকেলে জনসভায় যাবে। সন্ধ্যার আগে ফিরে আসবে। আমরা নৌকা করে দেব। ভোরবেলা পানিওয়ালা যাবে।
বিকালে জনসভা শেষ হতে সন্ধ্যা ছাড়িয়ে গেল। দেখলাম ছোট্ট একটি মেয়ে হারিকেন হাতে আমাকে খুঁজছে। মেয়েটির বয়স সাত-আট বছর হবে। হিমাংশু বাবুর ছোট বোন দীপু। আমার বিলম্ব দেখে তাঁর মা পাঠিয়েছেন আমাকে খুঁজতে।
সকালে নৌকায় হাজীগঞ্জ ছেড়ে গেলাম। হাজীগঞ্জ থেকে নৌকায় পানিওয়ালা। আজ মনে হয় কল্পনা করাও যায় না। বাঁধে বাঁধে এখন জমি আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। কোথাও জল নেই নৌকা চলার মতো।
পানিওয়ালা পৌঁছে আমার আক্কেল গুড়ুম। শুনলাম প্রধান শিক্ষক রুহুল আমিন কায়সার ১২ দিন যাবৎ অসুস্থ। প্রবল জ্বর। আমাকে ঢাকায় খবর দেয়া হয়েছে। তাদের ধারণা, খবর পেয়েই আমি ওখানে গিয়েছি। তাই আমার পানিওয়ালা থাকা হলো না। পানিওয়ালা থেকে নৌকায় মেহের কালীবাড়ি (বর্তমানে মেহের) রেল স্টেশন। মেহের থেকে লাকসাম। লাকসাম থেকে রাতে ঢাকা পৌঁছে রুহুল আমিন সাহেবকে ভর্তি করা হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে।
এ পরিস্থিতিতে আমাকে ঢাকা হল নিয়ে অনশন করতে হয়েছে। দলের নির্দেশে ছাত্রলীগ ছেড়ে ছাত্র ইউনিয়নে আসতে হয়েছে। অপরদিকে সামরিক শাসন জারি হয়েছে। হাজার হাজার নেতা কর্মী গ্রেফতার হয়ে যাচ্ছে। আমিও বা কতদিন বাইরে থাকব তার নিশ্চয়তা নেই। বুঝতে পারলাম আমার ঢাকা হলে থাকাও সম্ভব হবে না।
ড. ইসলাম যাবার পর একদিন হাউস টিউটর আমাকে ডাকলেন। বললেন, তুমি ভর্তি হতে পারছ না। তাই তোমার হলের আসন বাতিল করা হলো। আমি বললাম, স্যার এটা কী করেছেন? আপনারা আমার ভর্তির আবেদনপত্র আদৌ রেজিস্ট্রার অফিসে পাঠালেন না। ফলে আমার ভর্তির কোনো সুরাহা হলো না। দেশে সামরিক আইন। আমি কোথায় যাব? হলের বাইরে গেলে গ্রেফতার হয়ে যাব। আপনারা নির্দেশ দিলেও আমি যাব না।
