কিন্তু হল কর্তৃপক্ষকে এড়ানো গেলো না। ভোরবেলা দেখি প্রভোস্ট এস এন কিউ জুলফিকার আলী সাহেব আমার কক্ষে হাজির। বললেন, কেমন আছেন? খুব স্নেহের কণ্ঠে বললেন, এমনি করে কি দিন চলবে? আপনি আজ দুপুরের দিকে আমার বাসায় যাবেন।
প্রভোস্টের বাসা ১০ ফুলার রোড। আজকে সেখানে সায়েন্স এনেক্স। এককালে নির্মিত হয়েছিল ব্রিটিশ ধাচে। পূর্ববঙ্গ আসাম প্রদেশের সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হবার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে এ ভবনগুলো হস্তান্তরিত করা হয়। ভাবছিলাম প্রভোস্টের বাসায় যাব কিনা। কারণ এর মধ্যে আরো কিছু ঘটনা ঘটে গেছে।
একদিন সকালের দিকে আমাকে হাউস টিউটরের কক্ষে ডাকা হলো। কক্ষে ঢুকে দেখি চারজন হাউস টিউটরই বসে আছেন। এ চারজন হচ্ছেন ড. সিরাজুল ইসলাম, অধ্যাপক মুনীম, মুকলেসুর রহমান এবং মীর ফখরুজ্জামান। ড. ইসলাম বললেন, তুমি কি জবাব দিতে পার তোমাকে হল থেকে বহিষ্কার করার হবে না কেন? তোমার বিরুদ্ধে অভিযোগ হচ্ছে গতকাল রাত বারোটার পর তোমার কক্ষে গান হয়েছে। এটা হলের শৃঙ্খলা বিরোধী।
প্রশ্ন শুনে আমি কিছুটা অবাক হলাম। কারণ ওই গানের কথা আমি জানতাম না। পরে শুনেছি সত্য সত্যই আমার কক্ষে সে রাতে গান হয়েছিল। গান গেয়েছিলেন সুরেশ বাবু। বাড়ি নড়াইল কি মাগুরা। ইতিহাসের ছাত্র। তিনি স্বভাব গায়ক। শেষ বর্ষের পরীক্ষা হয়ে গেছে। হল ছেড়ে যাবেন। তাই মনে হয় সকলকে গান শুনিয়েছিলেন। সকলে তাঁকে ডাকত সুরেশদা। সুরেশদা আমার কক্ষে গান গেয়েছিলেন আমার অনুপস্থিতিতে। বুঝলাম আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ খুঁজে না পেয়ে এ অভিযোগ আনা হয়েছে।
আমি বললাম, রাত বারোটার পর কোনো কক্ষে গান গাওয়া অপরাধ তা আমি জানতাম না। আপনারা আমাদের কোনো নিয়ম জানাননি। আমরা ড, গোবিন্দ দেবের অধীনে ছিলাম। তিনি কোনোদিন এ সম্পর্কে কিছু জানাননি। আপনারা এ হলে নতুন। আপনারাও জানাননি। তাই আমার অপরাধ কোথায়? আমার কথা শুনে সকলে নীরব হলেন। শুধুমাত্র মুনীম সাহেব বিড়বিড় করে বলতে থাকরেন–হি ইজ টু মাচ ইনটেলিজেন্ট-ইউ ক্যান নট ক্যাচ হিম।
মীর ফখরুজ্জামান এবার মুখ খুললেন। তিনি বললেন, তুমি প্রতিদিন গভীর রাতে হলে আস। তুমি জানো না যে, রাত ন’টার পূর্বেই হলে আসতে হবে। এ অপরাধে তোমাকে বহিষ্কার করা যায়, তা কি তুমি জানো?
প্রকৃতপক্ষে আমি রাত এগারোটা, বারোটা, একটা, দু’টায়ও ফিরতাম। তবু আমি প্রশ্ন করলাম–স্যার, এর কি প্রমাণ আছে? কেউ কি সাক্ষ্য দেবে? বা আপনাদের গেটের বইয়ে এ ধরনের কোনো কিছু লেখা আছে কি?
এবারও হাউজ টিউটরেরা চুপ করে গেলেন। একই কথা বিড়বিড় করে বললেন মুনীম সাহেব। আমি চুপ করে বসে থাকলাম।
এবার মোক্ষম অস্ত্রটি ছাড়লেন ড. সিরাজুল ইসলাম। তিনি বললেন, তুমি এখন হলের নিয়মিত ছাত্র নও। তুমি হলে আছ কী করে? আমি বললাম, স্যার যদি পাল্টা প্রশ্ন করি–আমি হলের ছাত্র না হলেও হলে আপনারা রাখছেন কী করে? আমার খাওয়ার টাকা নিচ্ছে কী করে? আমার নামে কক্ষ বরাদ্দ হয়েছে কী করে?
এবারও তারা চুপ করে গেলেন, মুনীম সাহেব এবার জোরে বললেন, ইউ ক্যান নট ক্যাচ হিম। ড. ইসলাম বললেন, তুমি যাও। তবে সকাল থেকে রাত ৯টার মধ্যে হলে ফিরবে এবং গেটে বইয়ে স্বাক্ষর করবে।
এখানে একটি ভিন্ন কাহিনী আছে। আমার রাজনৈতিক কারণে ১৯৫৭ সালে পরীক্ষা দেয়া হয়নি। পরীক্ষা দিতে হবে ১৯৫৮ সালে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতি চেয়ে আবেদন জানিয়েছি। সেই আবেদনপত্র কিছুতেই প্রভোস্ট অফিস রেজিস্ট্রি অফিসে পাঠাচ্ছে না। আর আমাকেও কিছু বলতে পারছে না। থাকতে দিতে হচ্ছে হলে।
আমি কক্ষে চলে গেলাম। পরদিন রাত ৯টায় ফিরলাম হলে। গেটে দারোয়ান প্রমোদ বলল বইয়ে স্বাক্ষর দিন। বইয়ে স্বাক্ষর দিলাম। সময়ের জায়গায় লিখলাম, রাত তিনটা। প্রমোদ বলল, একি করছেন? আমি বললাম, দেখো না কী হয়? পরপর সাতদিন এভাবে স্বাক্ষর করায় একদিন প্রমোদ বলল–স্যার বলেছেন, আপনাকে বইয়ে সই না দিতে।
পরিস্থিতি ভিন্ন মোড় নিল হলের হিন্দু কর্মচারিরা কালীপূজা করায়। ঢাকা হল কসমোপলিটন হল। সকলেরই সকল ধর্ম পালনের অধিকার আছে। তাই হাউস টিউটর ড. সিরাজুল ইসলাম তাদের পূজার অনুমতি দিয়েছিলেন। ফলে তাকে শোকজ করা হয়। ড, ইসলামকে চলে যেতে হয় ঢাকা হল থেকে। যাবার আগে তিনি আমাকে ডাকলেন। বললেন, নির্মল, সতর্ক থেকো। তোমার সম্পর্কে একটি চিঠি আছে আমার কাছে। চিঠিটা লিখেছেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। চিঠিতে লেখা হয়েছে–আউট এ কেস এগেনস্ট হিম অ্যান্ড এক্সপেল হিম ফ্রম দি হল (তার বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ আনো এবং তাকে হল থেকে বহিষ্কার করো)। হল থেকে বহিষ্কার করার অর্থ হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার। ছাত্রজীবন শেষ।
এ পরিস্থিতিতে ঈদুল আজহা আসে। ঢাকা হলে গরু কোরবানি হয়। অমুসলমান ছাত্ররা হল ছেড়ে যায়। আমাকে সাহায্য করার প্রস্তাব দেন হল কর্তৃপক্ষ। প্রভোস্ট হলে এসে আমন্ত্রণ জানান তাঁর কোয়ার্টারে।
হাউস টিউটর ড. সিরাজুল ইসলাম হল থেকে চলে গেলেন। আমাকে বলে গেলেন সতর্ক থাকতে। যেহেতু তার কাছে চিঠি আছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের।
