এ পরিস্থিতিতে ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যদের বৈঠক বসল। যতদূর মনে আছে ড, আলমগীরই সভাপতি হলেন। সাধারণ সম্পাদক হলেন সাইফুদ্দিন আহমদ, দপ্তরবিহীন সম্পাদক হলেন আহমেদ হুমায়ূন। প্রশ্ন দেখা দিল আমার নাম সহসভাপতি হিসেবে উত্থাপিত হওয়ায়। প্রস্তাব উত্থাপন করলেন জহিরুল ইসলাম। উপর থেকে ভিন্ন প্রস্তাব এল। কিন্তু কোনো পক্ষই ভোটে যেতে রাজি নন। এক সময় জহির ক্ষুব্ধ হয়ে ছাত্র ইউনিয়ন থেকে পদত্যাগের কথা বললেন। আমি এ পরিস্থিতির জন্যে প্রস্তুত ছিলাম না। এতদিন বাইরে থেকে ছাত্র ইউনিয়নের কথা শুনে একটি ধারণা জন্মেছিল এ সংগঠনটি ঐক্য চায় না। আমার ঘটনাতেই তা প্রমাণিত। প্রকৃত পরিস্থিতি তেমন নয়। তাই বৈঠকে আমি এক সময় বললাম আমি প্রার্থী হচ্ছি না। কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবেই আমি কাজ করব। গণ্ডগোল মিটে গেল। এবারের জন্যে যবনিকাপাত হলো। পরবর্তীকালে খবর হচ্ছে আমি ছাত্র ইউনিয়নের নেতা হিসেবেই জেলে গিয়েছিলাম। জেল থেকে এসে দেখি ছাত্র ইউনিয়নের সম্মেলন হচ্ছে। কিন্তু সে সম্মেলনে আমাকে ডাকা হলো না। সে ঘটনা আরো পরে।
এদিকে ঢাকা হলে এখন ভিন্ন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ চাইছেন না অমুসলমান ছাত্ররা ঢাকা হলে থাক। তাই প্রতিদিন গণ্ডগোল সৃষ্টি করা হতো ঢাকা হলে। ঢাকা হল কসমোপলিটন হল হলেও মুসলমান ও অমুসলমান ছাত্রদের জন্যে পৃথক রান্নার ব্যবস্থা ছিল। হলের কিছু কর্মকর্তার প্ররোচনায় কতিপয় মুসলিম ছাত্র প্রায় দিনই অমুসলমান ছাত্রদের খাবার খেয়ে ফেলত, হামলা চালাতো এদের রান্নাঘরে। এ ছাত্ররা ছিল মুখ্যত ন্যাশনাল ছাত্র ফেডারেশন এনএসএফ-এর অনুসারী। এ পরিস্থিতিতে অমুসলমান ছাত্ররা জগন্নাথ হলে যাওয়া শুরু করল।
নতুন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো সরস্বতী পূজা নিয়ে। কসমোপলিটন হলে হিন্দু ছাত্ররা সরস্বতী পূজা করতে চায়নি। আমি বললাম, এটা সঠিক নয়। আপনারা সরস্বতী পূজা করলে মুসলিম ছাত্ররা যদি গরু কোরবানি দেয় এ হলে থাকবেন আপনারা। ওদের গরু কোরবানিও আপনাদের পূজার মতো। আমি তাদের, বোঝাতে পারলাম না। সাড়ম্বরে সরস্বতী পূজা হলো ঢাকা হলে এবং পরবর্তীকালে মুসলমান ছাত্ররা ঈদুল আজহায় গরু কোরবানি দিল। কী এক করুণ অবস্থা। হলের একশ্রেণির কর্মকর্তা এ কাজে ইন্ধন যোগালেন। যিনি প্রত্যক্ষ সব কিছু করলেন তিনি হলের অন্যতম হাউস টিউটর মীর ফখরুজ্জামান। মিষ্টভাষী এবং সদালাপী এই মানুষটি যে কি করতে পারেন তা সেদিন হাড়েহাড়ে টের পেয়েছিলাম। আবার দৃঢ়তাও খুঁজে পেয়েছিলাম অন্যান্য কর্মকর্তার মধ্যে।
ঢাকা হলে (আজকের শহীদুল্লাহ হল) আমার কক্ষ নম্বর তখন ১০৬। এ কক্ষে আমি, জহিরুল ইসলাম (এককালের সরকারি কর্মকর্তা এখন অনিয়মিত কলাম লেখক) ও আহমদ হোসেন (যুগ্ম সচিব হিসেবে অবসর নিয়েছেন)। আমাদের সঙ্গে ছিলেন হিমাংশুরঞ্জন দত্ত (অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব)। হিমাংশু দত্ত চলে গেছেন জগন্নাথ হলে। আমাদের কক্ষে এসেছেন প্রয়াত শান্তিরঞ্জন কর্মকার (বাংলাদেশ ব্যাংকের এককালীন কর্মকর্তা)।
সেদিন ঈদুল আজহা। আমাদের মন ভালো না। হলে গরু জবাই হয়েছে। না খেয়ে অমুসলমান ছাত্ররা হল ছেড়ে চলে গেছে। ক্ষুব্ধ জহিরুল চলে গেছে বাইরে। আহমেদ হোসেন বললেন, আমাদেরও হলে খেয়ে কাজ নেই। চলুন হোটেলে খেয়ে আসি। স্টেডিয়ামের সামনে মোটামুটি অভিজাত হোটেল লা সানি। আমরা দু’জন সেখানে খেয়ে হলে ফিরে এলাম।
হলে ফিরে দেখি আমার টেবিলে পরিপাটি করে খাবার সাজানো। এমনিতেই আমি ডাইনিং হলে খেতাম না। আমার হলে ফেরার সময়ের ঠিক ছিল না। তাই আমার খাবার টেবিলেই ঢাকা থাকল। তবে এমনটি করে পরিপাটি করে সাজানো নয়। ঢাকনি খুলে খাবার দেখারও প্রবৃত্তি হলো না। সারাটা দিন হলে শুয়ে থাকলাম। রাত বারোটার দিকে আমাকে জানানো হলো হাউস টিউটর ফখরুজ্জামান সাহেব আমাকে ডেকেছেন। তিনি আমাকে সাধারণত গভীর রাতেই ডাকতেন। হাউস টিউটরের কোয়ার্টারে আমাকে যেতে হলো। ঢুকতেই প্রশ্ন করলেন, দুপুরে খেয়েছি কিনা। বললেন, তোমার খাবারও পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। কোনো অসুবিধা হয়নি তো। আমি বললাম, স্যার আমাকে খাইয়ে কী হবে? ঈদ তো আনন্দের। গরুর পরবর্তে খাসি জবাই করলে সবাই মিলে খাওয়া যেতো। আমার কোনো ব্যাপারে আপত্তি নেই। কিন্তু যাদের আপত্তি তারা তো কেউ হলে খেল না। আমাকে এখন গভীর রাতে ডেকে কোনো লাভ আছে কি?
মীর ফখরুজ্জামান সাহেব একটু সরে বসলেন। মনে হলো তিনি ভয় পেয়েছেন। জানতে চাচ্ছেন আমি কোনো গণ্ডগোল করবো কিনা। তাই হঠাৎ প্রশ্ন করলেন, নির্মল তুমি কী করে চলো। শুনেছি তোমার কেউ নেই। শুধু রাজনীতি করো। আমি বললাম–স্যার, টিউশনি করি। ছাত্র পড়িয়েই চলে যায়। কারো অধীনে কোনো কিছু করা আমার ধাতে সয় না।
নির্মল তোমাকে আমি সাহায্য করতে পারি। ভালো টিউশনি দিতে পারি। তুমি নেবে? গভীর রাতে হাউস টিউটরের এ কথা শুনে মনে হলো কর্তৃপক্ষ এবার আমাকে কিনতে চাচ্ছে। আমি বললাম-স্যার, জেলে যেতে না হলে
আর নিয়মিত পড়ার সুযোগ পেলে আমিও হয়তো এতোদিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে পারতাম। আমাকে আপনার সাহায্য করতে হবে না। আমি নিজেই চলতে পারব। আমাকে যেতে দিন। বিদায় নিয়ে কাউকে কিছু না বলে শুয়ে পড়লাম।
