আমাদের ক্ষেত্রে ঠিক তেমনটি হলো না। মাত্র একটি জেলার ক্ষেত্রে আমাদের আশাভঙ্গ হলো। কুমিল্লার তাহেরুদ্দীন ঠাকুরকে আমরা কমিউনিস্ট পার্টি ঘেঁষা মনে করতাম। তিনি আমাদের সঙ্গেই চলতেন। কিন্তু দেখা গেল যে ছাত্রলীগ ছাড়বার সময় আমাদের সঙ্গে এলেন না। যদিও পরবর্তীকালে তিনি ছাত্র ইউনিয়নের প্যানেলে ঢাকা হল ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন। এনায়েতুল্লাহ খান হয়েছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট। এ সংসদের অন্যতম সদস্য ছিলেন শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দলের সিদ্দিকুর রহমান, ওয়ার্কার্স পার্টির হায়দার আকবর খান রননা, প্রয়াত নাট্যজন আবদুল্লাহ আল মামুন।
এনায়েতউল্লাহ খান, আহমেদ হুমায়ুন, আব্দুল হালিম, আজিজুর রহমান, জহিরুল ইসলাম এবং কাজী বারীর সিদ্ধান্ত ছিল ছাত্র ইউনিয়নে যাবার। তবে তাদের সকলেরই ইচ্ছা ছিল আমরা সকলে যেন এক সঙ্গেই ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দিই। আমার দলেরও সিদ্ধান্ত ছিল ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেবার। তাই ঠিক হলো ছাত্র ইউনিয়নেই যোগ দিতে হবে।
কিন্তু কীভাবে ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেয়া যাবে? ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পক্ষ থেকে বিষয়টিকে তখন ভিন্নভাবে দেখা হলো। ছাত্র ইউনিয়নের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা নেতা মুকুল সেন তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তিনি তাঁদের কয়েকজন সদস্য নিয়ে আমার কাছে একদিন ঢাকা হলে এলেন–আনুষ্ঠানিকভাবে আমাকে ছাত্র ইউনিয়নে যোগদানে আমন্ত্রণ জানালেন। তাঁর কথা হলো, আপনি ছাত্রলীগের একজন নেতা ছিলেন। আর পাঁচজনের মতো আপনি আমাদের সদস্যপদ গোপনে নেবেন তা হতে পারে না। আর আপনি যদি কোনো পদে যেতে চান তাও বলুন।
সে ছিল আমার পক্ষে এক বিড়ম্বনা। আমি ছাত্রলীগের দপ্তর সম্পাদক ছিলাম। সভাপতি আব্দুল মোমিন তালুকদার এবং সম্পাদক এম এ আওয়ালের সঙ্গে আমার এমন সমঝোতা ছিল যে, এককভাবে আমি কোনো কিছু করলে তাঁরা কিছু বলতেন না। প্রকৃতপক্ষে ছাত্রলীগের সকল খবরই আমার কাছে থাকত। তাই ছাত্র ইউনিয়নে কোন পদে যাবো এ নিয়ে আমার কোনোদিন চিন্তা-ভাবনা ছিল না। এটাও জানা ছিল, কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে পরিচালিত ছাত্র ইউনিয়নে আমার অবাধ বিচরণ সম্ভব হবে না। কারণ এ ধরনের রাজনৈতিক উদারতা ঐ দলটির কোনোদিন পরিলক্ষিত হয়নি প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রশ্নে। এছাড়া সেখানে বামপন্থী রাজনীতিতে আমাদের দল আরএসপির তেমন কোনো প্রভাব না থাকলেও কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা জানতেন আরএসপির একটি বিকল্প বক্তব্য আছে মার্কসবাদ-লেলিনবাদ সম্পর্কে। স্টালিনকে তারা সঠিক বলে মনে করে না এবং এও মনে করে যে ক্রুশ্চেভের সহাবস্থানের নীতি স্টালিনের আমলেই শুরু হয়েছিল।
সুতরাং মুকুল সেনের সকল সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আমাকে ছাত্র ইউনিয়নে নেয়া সহজ হলো না। ব্যাপারটা খুবই বিস্ময়কর নয় কি? একজন ছাত্র, একটি ছাত্র প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করে অন্য একটি ছাত্র প্রতিষ্ঠানে যোগ দেবে, তাকে নিতে হলে প্রতিষ্ঠানের কাউন্সিল ডাকতে হবে।
আমার ক্ষেত্রে তাই-ই হয়েছিল। ছাত্র ইউনিয়নের বিশেষ কাউন্সিল ডাকায় অধিবেশন বসলো বার লাইব্রেরি হলে। আমাকে ছাত্র ইউনিয়নের সদস্যপদ দেয়া নিয়ে একমাত্র বরিশাল জেলা থেকে আপত্তি এল। অবস্থান এমন দাঁড়ালো, তারা নোট অব ডিসেন্ট দেবে। কাউন্সিলে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ছাত্র ইউনিয়নের লেখা। আমার লেখা চিঠি পেশ করা হলো।
বলা হলো নির্মল সেনের জন্যে ঐক্য হয়নি। তাই তাকে ছাত্র ইউনিয়নে নেয়া যাবে না। সম্মেলনের সভাপতি ড, আলমগীর বললেন, এ চিঠি ছাত্রলীগ সম্পাদক এম এ আউয়ালের পক্ষ নিতে নির্মল সেন লিখেছেন, তাই এ আপত্তি গ্রাহ্য নয়।
এ সময় আমার খুব খারাপ লাগছিল। বললাম, আমি কিছু বলব। বাধা দিলেন আজিজুর রহমান খান। তখন তিনি ফজলুল হক হলের ছাত্র সংসদের ভাইস প্রেসিডেন্ট, পরবর্তীকালে অর্থনীতিবিদ এ আর খান নামে পরিচিত। আজিজ আমাদের সঙ্গেই ছাত্রলীগ ছেড়েছিলেন। আজিজ বললেন, আমরা বিবৃতি দেব। আপনি আমাদের সঙ্গে এসেছেন। আমরাই আপনাকে ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য পদ দেব।
ইতোমধ্যে আমাকে নিয়ে বক্তৃতা শুরু হয়েছে কাউন্সিলে। এ সময় কক্ষে ভাষণ দিলেন বগুড়ার সাদেক আলী আহমদ ও দুর্গাদাস মুখার্জী। পুরো এক ঘন্টা বক্তৃতা দিলেন আজিজুর রহমান খান। আমার মনে হয়েছিল লেডি ম্যাকবেথের মৃত্যুর পর ম্যাকবেথের বলা কথা শুনছি। আজিজের বক্তৃতার পর কাউন্সিলে ভোট হলো। আমার বিরুদ্ধে দুটি ভোট পড়ল। এ দুটি ভোটই বরিশালের।
কাউন্সিলে আমাকে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচন করা হলো। পরবর্তী দিন কমিটি নির্বাচিত হবে। তখন ছাত্র ইউনিয়নের গঠনতন্ত্রে এমন বিধি ছিল। কাউন্সিলে পুরো কমিটি নয়। কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হবে। এ সদস্যরাই পরবর্তীকালে সভাপতি, সম্পাদক নির্বাচন করবে।
পরদিন এই সভাপতি সম্পাদক নির্বাচন নিয়ে দুঃখজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো। যারা আমার ছাত্র ইউনিয়নের সদস্যপদ দেয়া ঠেকাতে পারেনি তারা। সারা রাত তৎপর ছিল। মুখে মুখে রটে গিয়েছিল আমাকে নাকি সহসভাপতি করা হবে। খুলনার গাজী শহীদুল্লাহ এবং গাজী লুৎফর রহমান বলল, আমাদের পক্ষে আপনাকে আর সমর্থন করা সম্ভব হবে না। কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে ভিন্ন নির্দেশ এসেছে। কিন্তু জহিরুল ইসলামসহ অনেকে কমিউনিস্ট পার্টির লোক হলেও এ নির্দেশ মানতে রাজি ছিল না। জহির ছিল ঢাকা হলে আমার রুমমেট এবং আমার সঙ্গে ছাত্রলীগ ছেড়েছিল। এ ধরনের আমার অনেক সমর্থক ছিল যারা প্রকৃতপক্ষে কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্রফ্রন্টের লোক ছিল।
